সাগর-রুনি হত্যা মামলা
জিয়াউল আহসান ও রোকেয়া প্রাচীর ‘সংশ্লিষ্টতা’, তদন্তে আরও ছয় মাস সময় পেল টাস্কফোর্স
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতার কথা এসেছে বিভিন্ন সংস্থার অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরের বরাতে এমন তথ্যসংবলিত তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন আজ মঙ্গলবার আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত শেষ করতে আরও ছয় মাস সময় পেয়েছে টাস্কফোর্স। এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো সময় পেল টাস্কফোর্স।
পরবর্তী আদেশের জন্য ২৯ এপ্রিল তারিখ ধার্য করেছেন আদালত। টাস্কফোর্স ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিষয়টির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সেদিন উপস্থিত হতে বলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী জানিয়েছেন।
এর আগে তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়। অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়, টাস্কফোর্সের সদস্যসহ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার সঙ্গে আলোচনাকালে তাঁরা প্রাথমিকভাবে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতা পেয়ে তদন্ত করে যাচাই বাছাই করছেন মর্মে জানান। তাঁদের প্রাথমিক তদন্ত শেষ হলে প্রাপ্ত তথ্যাদি পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তাকে হস্তান্তর করবেন বলে জানান।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর ও রুনি। সাগর সে সময় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মাছরাঙা টেলিভিশনে আর রুনি এটিএন বাংলায় কর্মরত ছিলেন। সাগর-রুনি হত্যার ঘটনায় রুনির ভাই নওশের আলম বাদী হয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন।
আজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল প্রতিবেদনের অংশবিশেষ তুলে ধরে শুনানি করেন, সঙ্গে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মোহাম্মদ আজমী। বাদীপক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। রিট আবেদনকারী পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।
প্রতিবেদনে যেভাবে জিয়াউল আহসান ও রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতা
পরে নিজ কার্যালয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, এই মামলার নতুন তদন্তভার গ্রহণ করে টাস্কফোর্স ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মোট ৯০ জন সাক্ষীকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং ২৪ জনের জবানবন্দী রেকর্ড করেন।
এই মামলার তদন্তে আদালতের নির্দেশে গঠিত টাস্কফোর্সের কার্যক্রমে ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অগ্রগতি সাধিত হয়েছে উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘অক্টোবর মাসে, সেটা হচ্ছে সাগর-রুনি হত্যা মামলা নিয়ে গত ৩০ আগস্ট বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা এ মর্মে বক্তব্য প্রদান করেন যে দুদক এনটিএমসির সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসায় অভিযান চালায়। সেখানে বেশ কিছু ডিজিটাল আলামত পেয়ে দুদক সেগুলো জব্দ করে। সেগুলোর মধ্যে বিভিন্ন রকম জিও লোকেশন, এসএমএস, সিডিআরের প্রিন্টেড ভার্সন পাওয়া যায়।’
অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, ‘এ–সংক্রান্তে জিয়াউল আহসানের সহকারী একজন র্যাব সদস্য জিজ্ঞাসাবাদে উল্লিখিত প্রসিকিউটর প্রাথমিক তদন্তে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্বের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় বর্ণনা দেন। জোহার বক্তব্য সমর্থন করে পরবর্তী সময়ে আইসিটি ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই ধরনের বক্তব্য প্রদান করেন। তাঁরা বলেন, মিডিয়াতে তাঁদের তদন্তকাজ শেষ হলে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত তথ্য তাঁরা পিবিআইয়ের তদন্তকারী দলের কাছে হস্তান্তর করবেন।’
এর মধ্যে পিবিআই তদন্ত দল কিন্তু দুজন ব্যক্তি আইনজীবী ও প্রসিকিউটরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেন, ‘তাঁদের কাছে কী আলামত আছে তা চেয়েছেন এবং তাঁরা একটা চিঠিও দিয়েছেন। এই চিঠিটা আমি আপনাকে বলি যে আমরা আজকে যে হাইকোর্টের আদেশের ভিত্তিতে যে অগ্রগতি প্রতিবেদন দেওয়ার কথা ছিল সেই অগ্রগতি প্রতিবেদনে এ কথাটি তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. আজিজুল হক লিখেছেন। আদালতের কাছে এই তদন্ত প্রতিবেদনের এই অংশটুকু পড়ে শুনিয়েছি।’
যে কারণে সময় চাওয়া
সময় চাওয়ার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘আদালতের কাছে বলেছিলাম একটু লম্বা সময় দরকার। কারণ, যেসব সিডি আইসিটি তদন্তকারী প্রসিকিউশন টিম উদ্ধার করেছে, প্রায় ৩০০। তারা সমস্তটা দেখতে পারেনি। সুতরাং তাদের তদন্ত সম্পন্ন করে কিংবা প্রাথমিক সন্তুষ্টি শেষে আমাদের তদন্তকারী কর্মকর্তার (পিবিআই) কাছে দেওয়াটা সময়সাপেক্ষ হতে পারে। আদালতের কাছে সে জন্য সময় চেয়েছিলাম। আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনেছেন এবং এটির পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেছেন ২৯ এপ্রিল। এখানে উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হচ্ছে, এই মামলায় যাঁরা তদন্তকারী ব্যক্তি, যাঁরা আইসিটিতে আছেন, যিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি থাকবেন, ওই সময় তাঁকে আদালত বলেছেন যে তিনি যেন আদালতে এসে তদন্ত বিষয়ে আদালতকে অবহিত করেন।’
বাদীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সময় চাওয়া হয়েছে, এ কথা বলেই যে তাঁদের কাছে আপডেট আছে। তাঁরা আজকে আদালতে যে আপডেটের কথা বলেছেন, সেটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সংশ্লিষ্ট এবং সেখানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একজন প্রসিকিউটরের বরাত দিয়ে তাঁরা বলেছেন যে তাঁরা কিছু ডেভেলপমেন্ট পেয়েছেন, কিছু সিডি পেয়েছেন এবং দুজন ব্যক্তির নাম বলেছেন। সে আলোকে এগুলো অ্যাসেস করতে তাঁদের ৩০০টা সিডি, যার ৯০টা অ্যাসেস হয়েছে, আরও ২১০টা অ্যাসেসমেন্টের বাকি আছে, সেগুলো করতে তাঁরা সময় চেয়েছেন। তাঁরা এক বছর সময় চেয়েছিলেন। আর আমরা বলেছিলাম যে এই সিডিগুলো অ্যাসেস করতে এত সময় লাগার কথা নয়। যেহেতু এটি জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সবচাইতে বেশি ইম্পর্টেন্স এখানেই থাকা উচিত। এ জন্য অল্প সময় দেওয়া দরকার।’
শিশির মনির বলেন, আদালত বিবেচনা করে তাঁদের ছয় মাস সময় দিয়েছেন এবং ২০২৭ সালের এপ্রিল মাসের ২৯ তারিখে পরবর্তী আদেশের জন্য আসবে। একটি সিগনিফিকেন্ট ডেভেলপমেন্ট আছে, সেটি বলেছেন যে টাস্কফোর্সের যাঁরা প্রধান আছেন তিনি এবং এই সিডিগুলো যাঁর সিডিতে আছে, অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটর এবং তদন্ত সংস্থার সদস্য, তাঁরা সবাই সেদিন আদালতের সামনে আসবেন। আদালতের সামনে এসে এই সিডি পর্যালোচনায় কী ডেভেলপমেন্ট পেলেন, তা আদালতকে অবহিত করবেন প্রোগ্রেস রিপোর্ট আকারে। ফলশ্রুতিতে এখন যে ক্লুর কথা বলছেন রাষ্ট্রপক্ষ, তা যদি সিডি পর্যালোচনায় সঠিক বিবেচিত হয়, তাহলে আদালতের সামনে তাঁরা ২৯ এপ্রিল উপস্থাপন করবেন।’
প্রশ্নের জবাবে শিশির মনির বলেন, তাঁরা রিপোর্টে দুজনের নাম বলেছেন। রিপোর্ট যেহেতু পাবলিক হয়েছে, বলা যায় একজনের নাম বলেছেন মেজর জিয়াউল আহসান আরেকজনের নাম বলেছেন রোকেয়া প্রাচী। বললেই তো আর হবে না, এভিডেন্স সংগ্রহ করতে হবে। ওই এভিডেন্সটা সংগ্রহ করার জন্য তাঁরা সিডিগুলো পর্যালোচনা করতে চেয়েছেন। সেই সিডির সংখ্যা তাঁদের ভাষায় ৩০০টি। এই ৩০০টির ভেতরে তাঁরা ৯০টি অ্যাসেস করেছেন। বাকি ২১০টা অ্যাসেস করতে পারেননি। নির্ধারিত সময়ের ভেতরে অ্যাসেস করবেন এবং উপযুক্তভাবে, উপযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে উপযুক্ত যে এভিডেন্স পাবেন, এটা আদালতের সামনে উপস্থাপন করবেন—এটাই হবে তাঁদের প্রত্যাশা।