পরিবারে বড়রা বই পড়লে ছোটরাও পড়ে
যেসব পরিবারে অভিভাবক বা বড়রা নিয়মিত বই পড়েন, সেখানে ৪৭.১% শিশু-কিশোর নিয়মিত বই পড়ে।
অন্যদিকে যেসব পরিবারে বড়রা বই পড়েন না, সেখানে এই হার ৩১.৮%
৯২.২% অভিভাবক বলেছেন, স্মার্টফোন ও ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি আসক্তি শিশুদের বইবিমুখতার প্রধান কারণ।
পরিবারে বড়রা বই পড়লে শিশুদের মধ্যেও পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে। যেসব পরিবারে অভিভাবক বা বড়রা নিয়মিত বই পড়েন, সেখানে ৪৭ দশমিক ১ শতাংশ শিশু-কিশোর নিয়মিত বই পড়ে। অন্যদিকে যেসব পরিবারে বড়রা বই পড়েন না, সেখানে এই হার নেমে আসে ৩১ দশমিক ৮ শতাংশে। শিশুদের পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ছাপা বই এখনো পাঠকদের প্রধান পছন্দ। জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ৮৭ শতাংশই মুদ্রিত বই পড়েন। ই-বুক বা পিডিএফের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে তরুণদের মধ্যে বেশি হলেও সামগ্রিকভাবে কাগুজে বইয়ের চাহিদা এখনো রয়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে এমন চিত্র। ‘বাংলাদেশে কমিউনিটি পাঠাগারের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এই জরিপ করেছে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের পল্লীমা সংসদের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান শহীদ বাকী স্মৃতি পাঠাগার। এটি পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন পাঠাগারের সম্পাদক আনিসুল হোসেন।
গত বছরের (২০২৫) আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত এ জরিপে এক হাজার পাঁচজনের মতামত নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৯৩৫ জন সরাসরি এবং ৭০ জন অনলাইনে অংশ নেন। জরিপের লক্ষ্য ছিল খিলগাঁও এলাকার মানুষের পাঠাভ্যাস, পাঠবিমুখতার কারণ, পাঠাগার সম্পর্কে ধারণা এবং একটি আধুনিক কমিউনিটি লাইব্রেরির প্রতি প্রত্যাশা নিরূপণ করা।
গবেষকদের মতে, মানুষ বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি; বরং পাঠাগার ও পাঠকের মধ্যে সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়েছে। সেই সংযোগ পুনর্গঠন করতে পারলেই কমিউনিটি পাঠাগারগুলো আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
শহীদ বাকী স্মৃতি পাঠাগারের চেয়ারম্যান মো. শফিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘জরিপের ফলাফল আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। এটি আমাদের শক্তি, দুর্বলতা ও সম্ভাবনার একটি সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে। আমরা জানতে পেরেছি, বই পড়ার আগ্রহ মানুষের মধ্যে ফুরিয়ে যায়নি; বরং নতুন রূপে প্রকাশিত হয়েছে।’
আগ্রহ আছে, নিয়মিত পড়া কম
জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তির ৮৪ শতাংশের বেশি জানিয়েছেন, তাঁরা পাঠ্যবইয়ের বাইরে নিয়মিত বই পড়েন। তবে নিয়মিত পাঠকের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মাসে একটি বা দুটি বই পড়েন। আনিসুল হোসেন বলেন, জরিপে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তির ৮৫ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। ছাত্রছাত্রী ও তরুণ পেশাজীবীরাই জরিপে বেশি সাড়া দিয়েছেন। ফলে জরিপের ফলাফলে তরুণ প্রজন্মের অভিজ্ঞতাই বেশি প্রতিফলিত হয়েছে।
বই না পড়ার কারণ বিশ্লেষণে বয়সভেদে পার্থক্য দেখা গেছে। ২৬ থেকে ৪০ বছর বয়সী কর্মজীবীর মধ্যে ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ বলেছেন, সময়ের অভাবে তাঁরা বই পড়তে পারেন না। অফিসের কাজ, যানজট ও পারিবারিক ব্যস্ততা তাঁদের পড়ার সময় কমিয়ে দিয়েছে।
এই গবেষণার ফলাফল ও সুপারিশমালা নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজকে একটি জ্ঞানভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ গঠনের প্রশ্নে নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে
অন্যদিকে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে বই না পড়ার প্রধান অন্তরায় হিসেবে উঠে এসেছে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার। এই বয়সী উত্তরদাতার ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ বলেছেন, ডিজিটাল মাধ্যম তাঁদের পড়ার মনোযোগ নষ্ট করছে। ১৮ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। এই বয়সী ৫৩ শতাংশ উত্তরদাতা বই না পড়ার জন্য স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটকে দায়ী করেছে।
শিশুদের পাঠাভ্যাসে পরিবারের প্রভাব
শিশু-কিশোরদের পাঠাভ্যাস নিয়েও জরিপে আলাদা প্রশ্ন ছিল। পরিবারে স্কুলগামী সদস্য আছে, এমন উত্তরদাতাদের মতে, অধিকাংশ শিশু-কিশোর পাঠ্যবইয়ের বাইরে কমবেশি বই পড়ে।
তবে শিশুদের বইবিমুখতার কারণ সম্পর্কে অভিভাবকদের মতামত বেশ স্পষ্ট। জরিপে অংশ নেওয়া ৯২ দশমিক ২ শতাংশ অভিভাবক বলেছেন, স্মার্টফোন ও ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি আসক্তি শিশুদের বইবিমুখতার প্রধান কারণ। ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ একাডেমিক পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপকে দায়ী করেছেন।
এ ছাড়া ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ মনে করেন, শিশুতোষ বইয়ের অভাব একটি বড় কারণ। ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ বলেছেন, খেলার মাঠ বা সৃজনশীল কাজের সুযোগ কমে যাওয়াও শিশুদের বই থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ পারিবারিক অনুপ্রেরণার অভাবের কথা বলেছেন; আর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ মনে করেন, বইয়ের উচ্চমূল্যও শিশুদের পড়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
জরিপের ফলাফল আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। এটি আমাদের শক্তি, দুর্বলতা ও সম্ভাবনার একটি সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে। আমরা জানতে পেরেছি, বই পড়ার আগ্রহ মানুষের মধ্যে ফুরিয়ে যায়নি; বরং নতুন রূপে প্রকাশিত হয়েছে।শহীদ বাকী স্মৃতি পাঠাগারের চেয়ারম্যান মো. শফিকুর রহমান
৬২ শতাংশ জানেন না পাঠাগারের কথা
জরিপের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য এসেছে পাঠাগার-সংক্রান্ত প্রশ্নে। অংশগ্রহণকারীদের ৬২ শতাংশের বেশি জানিয়েছেন, তাঁরা শহীদ বাকী স্মৃতি পাঠাগারের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানেন না। অর্থাৎ এলাকার একটি বড় অংশের কাছে পাঠাগারটি অচেনা। অথচ পাঠাগারটির বয়স ৫৪ বছর। স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল্লা হেল বাকী বীর প্রতীকের নামে ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে শহীদ বাকী স্মৃতি পাঠাগার। তিন হাজার বর্গফুটের পাঠাগারে বইয়ের সংখ্যা ১৮ হাজারের বেশি।
গবেষকদের মতে, মানুষ বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি; বরং পাঠাগার ও পাঠকের মধ্যে সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়েছে। সেই সংযোগ পুনর্গঠন করতে পারলেই কমিউনিটি পাঠাগারগুলো আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
পল্লীমা সংসদ এবং শহীদ বাকী স্মৃতি পাঠাগারের সঙ্গে যুক্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, এই গবেষণা শুধু একটি পাঠাগারের জন্য নয়; বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ধুঁকতে থাকা কমিউনিটি পাঠাগারগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। এই গবেষণার ফলাফল ও সুপারিশমালা নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজকে একটি জ্ঞানভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ গঠনের প্রশ্নে নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
