রাজনৈতিক সহনশীলতার ঘাটতি থাকলে সংবাদমাধ্যমও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না: কামাল আহমেদ

‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এর শেষ দিনের সকালের সেশনের উদ্বোধনী বক্তব্য দেন ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ। আজ শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলেছবি: প্রথম আলো

দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সহনশীলতার ঘাটতি থাকলে সংবাদমাধ্যমও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ। তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং গণতান্ত্রিক চর্চা অনুপস্থিত থাকায় সংবাদমাধ্যমেও তার নেতিবাচক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

আজ শনিবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এর শেষ দিনের সকালের সেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে এ কথা বলেন কামাল আহমেদ। এই সেশনে আলোচনার বিষয় ছিল ‘পলিটিকো-গভর্ন্যান্স ইকোসিস্টেম অ্যান্ড ফ্রি মিডিয়া’। সেশনটির সঞ্চালক ছিলেন বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটন। দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক এই কনফারেন্সের আয়োজক মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)।

কামাল আহমেদ বলেন, দীর্ঘ শাসনব্যবস্থার অবসানের পর পরিবর্তনের একটি সুযোগ তৈরি হলেও সেটিকে কাজে লাগানোর বিষয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। সংবাদমাধ্যমকে চতুর্থ স্তম্ভ বলা হলেও এটি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। সমাজে গণতন্ত্র, সহনশীলতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকলে সংবাদমাধ্যমও স্বাধীন থাকতে পারে না।

আরও পড়ুন

কামাল আহমেদ বলেন, দেশে এখনো এমন পরিস্থিতি নেই, যেখানে মানুষ নিশ্চিন্তে সব ধরনের মত প্রকাশ করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ৭ মার্চের ভাষণ প্রচারের ঘটনায় একজনের কারাভোগ এবং খাগড়াছড়িতে এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে একই দিনে একাধিক মামলা হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি আরও বলেন, ‘সারা দেশে যা চলছে, সংবাদমাধ্যমেও সেটাই প্রতিফলিত হবে।’

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিরোধী মতকে উপেক্ষা করার প্রবণতা গভীরভাবে প্রোথিত বলে উল্লেখ করেন কামাল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমরা গণতন্ত্রের নামে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন দেখছি, কিন্তু ভিন্নমতকে যথেষ্ট জায়গা দেওয়া হচ্ছে না।’ এর প্রভাব সংবাদমাধ্যমেও পড়ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চার অভাবকেও বড় সংকট হিসেবে দেখেন কামাল আহমেদ। তিনি বলেন, যেসব রাজনৈতিক দলে নিজস্ব গণতান্ত্রিক কাঠামো নেই, তারা রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমও প্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গণমাধ্যমের মালিকানা কাঠামো, সম্পাদকীয় নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাগুলোয়ও রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে বলে উল্লেখ করেন এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং সাহসের অভাবের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এর দ্বিতীয় সেশনে আলোচকেরা। দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক এই কনফারেন্সের আয়োজক মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)। আজ শনিবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে
ছবি: খালেদ সরকার

বাংলাদেশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রভাবের শিকার হয়েছে উল্লেখ করে কামাল আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব পেলেও বাস্তবে সে ভূমিকা পালন করতে পারেনি। এমনকি সংবাদপত্রের ওপর আঘাতের ঘটনাতেও প্রতিষ্ঠানটির কার্যকর অবস্থান দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আর্থিক স্বনির্ভরতার ওপরও জোর দেন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে থাকা কামাল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যম যত দিন অর্থনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থানে দাঁড়াতে না পারবে, তত দিন প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে না।’ কামাল আহমেদ আরও বলেন, ‘রাজনীতি ও গণমাধ্যম—উভয় ক্ষেত্রেই কালোটাকার প্রভাব স্পষ্ট।’

আরও পড়ুন

বক্তব্যে সমাধানের কথা উল্লেখ করে কামাল আহমেদ বলেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ ও জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। তবে এ ক্ষেত্রেও আন্তরিকতার অভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আসলে সবাই একমত হতে পারছি না।’

আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন পাকিস্তানের ডন পত্রিকার সম্পাদক জাফর আব্বাস, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, বিবিসির সাবেক সাংবাদিক আনোয়ার শাকিল, সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী।