চলমান হাম পরিস্থিতিতে টিকাদান কর্মসূচি, টিকা সরবরাহ, রোগ নজরদারি ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় কোথায় ব্যর্থতা হয়েছে, সেটার স্বাধীন তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে বস্তির, প্রান্তিক ও টিকাবঞ্চিত শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান জোরদার এবং ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় জাতীয় শিশুস্বাস্থ্যে জরুরি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
আজ শনিবার ‘চিলড্রেনস লাইভস ম্যাটার’ শীর্ষক এক জরুরি মতবিনিময় সভায় জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ও নাগরিক প্রতিনিধিরা এ আহ্বান জানিয়েছেন। রাজধানীর কারওরান বাজারে দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ চাইল্ড প্রটেকশন ইনিশিয়েটিভ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম।
মতবিনিময় সভায় দেশে হামে শিশুমৃত্যু পরিস্থিতি ‘মহামারি আকার’ ধারণ করায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী। এমন পরিস্থিতির জন্য বিচারহীনতা ও জবাবদিহির অভাবকে দায়ী করে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে দায়িত্বকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার অসংখ্য উদাহরণ আছে। এই যে অবহেলাজনিত মৃত্যু, সেখানেও আমরা দোষারোপের সংস্কৃতিটা নিয়ে আসছি।’
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের গবেষণার অপ্রতুলতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন রাশেদা কে চৌধূরী। মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার সংকট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের কিন্তু কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিকগুলা ছিল। তবে সেগুলো এখন মৃতপ্রায়। সেগুলার দিকে আমরা কেউ দৃষ্টি দিই না।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জেবুন্নেসা জেবা বলেন, হামের প্রকোপে শিশুমৃত্যুর পরিস্থিতি দেশের স্বাস্থ্য খাতের ভগ্নদশার প্রতিচ্ছবি। হামে আক্রান্ত হয়ে যারা বেঁচে আছে, তারা ভবিষ্যতে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে।
হাম সংকটের পেছনে অপর্যাপ্ত চিকিৎসক ও দায়িত্বশীলদের গাফিলতিকে দায়ী করেন সাংবাদিক মাসুদ কামাল। তিনি বলেন, হামের মতো রোগ যেখানে সঠিক ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ সম্ভব, সেখানে অবহেলায় মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। কর্তৃপক্ষের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ফেলেছে।
কার গাফিলতিতে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব এতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, সেটা নিয়ে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা দায়িত্বশীল কোনো পক্ষ কথা বলছে না কেন, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাংবাদিক আনিস আলমগীর। তিনি বলেন, এই সংকটের পেছনে মূল কারণ কী, তা নিয়ে যথাযথ তদন্ত বা প্রশ্ন তোলা হচ্ছে না। কারা এই সংকটের জন্য দায়ী, তিনি তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি তোলেন।
অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন বলেন, হামে মৃত্যুর পেছনে বিগত সরকারের ভয়াবহ দায় রয়েছে। তিনি একজন মা হিসেবে প্রতিটি শিশুর মায়ের কাছে তাঁদের সন্তানের মৃত্যুর জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। এই সংকটের কারণ উদ্ঘাটনে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রতিরোধযোগ্য রোগে যাতে আর কোনো শিশুর মৃত্যু না হয়, সেটা নিশ্চিতে রাষ্ট্র যেন আগে থেকেই প্রস্তুত থাকে। অবহেলায় জড়িত ব্যক্তিদের যাতে আইনের আওতায় এনে জবাবদিহির সংস্কৃতি তৈরি করে সরকারের প্রতি সেই আহ্বান জানান ঔপন্যাসিক তামান্না সেতু।
মতবিনিময় সভায় আয়োজকেরা সরকারের কাছে ১০টি নাগরিক ভাবনা তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে হাম-সংক্রান্ত শিশুমৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নিয়মিত প্রদান, কার কার ব্যর্থতা রয়েছে, তা নিরূপণে স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত, প্রান্তিক পর্যায়ের শিশুদের ‘আউটরিচ ভ্যাকসিনেশন’ জোরদার, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ‘মেডিক্যাল সাপোর্টের’ ব্যবস্থা গ্রহণ।
বাংলাদেশ চাইল্ড প্রটেকশন ইনিশিয়েটিভের আহ্বায়ক আনন্দ কুটুম ও সংগঠক হো চি মিন ইসলামের সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আহসান ইমাম, প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিবেদক শিশির মোড়ল, সাংবাদিক জ ই মামুন, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. জুলকারনাইন, যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরাল ফেলো আসিফ বিন আলী প্রমুখ।