ভারতে ফয়সাল করিমের গ্রেপ্তারের ছবি-ভিডিও এআই দিয়ে তৈরি

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ভারতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর যে ছবি ও ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় এসেছে, যাচাই করে দেখা গেছে তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি।

গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপরই সন্দেহভাজন হামলাকারী ফয়সাল করিম এবং তাঁর সহযোগী আলমগীর হোসেন ভারতে পালিয়ে যান বলে পুলিশ জানিয়েছিল। গত রোববার ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশ সে দেশে ফয়সাল ও আলমগীরের গ্রেপ্তার হওয়ার তথ্য জানায়।

এরপর ফয়সাল ও আলমগীরকে গ্রেপ্তারের দৃশ্য দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুটি ছবি ও একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে দেখা যায়, ফয়সাল ও আলমগীরকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

লিংক: এখানে, এখানে, এখানে, এখানে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাধিক প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি দেশের মূলধারার কয়েকটি সংবাদপত্র, অনলাইন নিউজ পোর্টালেও এই ছবি প্রকাশিত হয়েছে।

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে ভারতের বার্তা সংস্থা এএনআইয়ের এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্টে ৮ মার্চ সন্ধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্সের (এসটিএফ) একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তির ছবি পাওয়া যায়। ওই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি উল্লেখ করা হলেও গ্রেপ্তারের সময়ের কোনো ছবি বা ভিডিও ছিল না।

লিংক: এখানে

ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এই খবর এলেও কোনো ছবি বা ভিডিও পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে প্রথম আলোর কলকাতা প্রতিনিধি অমর সাহা জানান, ৮ মার্চ পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ) একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। তবে ওই বিজ্ঞপ্তি ছাড়া পুলিশের পক্ষ থেকে গ্রেপ্তারের কোনো ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করা হয়নি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো দুটি ছবি সিন্থআইডি টুলের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হলে দেখা যায়, ছবিগুলো গুগলের এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি বা সম্পাদিত।

অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে অনেকে এই ছবিগুলো সত্য বলেই ধরে নিয়েছিল। বিভ্রান্ত হয় কিছু সংবাদমাধ্যমও।

গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৩ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে।

লিংক: এখানে

ভিডিওটির উৎস অনুসন্ধান করে দেখা যায়, ৮ মার্চ রাতে ‘Sesh TV’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে এটি প্রথম পোস্ট করা হয়। ভিডিওটির ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ওসমান হাদির হত্যাকারী ফয়সালসহ দুইজন গ্রেপ্তার হওয়া সম্পর্কে নিচের ভিডিওটা এআই দিয়ে তৈরি।’

পেজটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এর বায়োতে লেখা আছে, ‘এই পেজের সব ভিডিও এআই নির্মিত। কোনো পোস্ট সিরিয়াসভাবে নেবেন না। সমসাময়িক ঘটনাগুলো এআইয়ের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।’

বিষয়টি নিয়ে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার বাংলাদেশের সিনিয়র ফ্যাক্ট চেকার তানভীর মাহতাব আবীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘এআই প্রযুক্তি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বাস্তব ঘটনার মতো দেখিয়ে ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি করা খুব সহজ। সাম্প্রতিক বিভিন্ন ইস্যুতেই এমনটি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন সেগুলো মূলধারার গণমাধ্যমে চলে আসে এবং কোনো ধরনের ডিসক্লেইমার ছাড়াই পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা হয়।’

এমন ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের বার্তাকক্ষের ব্যবস্থাপকদের সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, নইলে বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে, তেমনি এসব অবাস্তব ছবি অনলাইনে স্থায়ী হয়ে থেকে ভবিষ্যতের গবেষণা ও তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

জুমার সঙ্গে আসামির ছবিটিও সম্পাদিত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দাবি করা হয়, ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদের সঙ্গে ডাকসু নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমার ছবি এটি। শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে সরব রয়েছেন তাসনিম জুমা।

লিংক: এখানে, এখানে, এখানে

ছবিটি যাচাই করতে গিয়ে আরেকটি ছবি পাওয়া যায়, যা সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর পোস্ট করেছিলেন। সেখানে ফয়সাল করিম মাসুদের পাশে তাঁর সহযোগী আলমগীর হোসেনকে দেখা যায়।

লিংক: এখানে

অন্যদিকে ফাতিমা তাসনিম জুমার ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চে একটি টেলিভিশন প্রতিবেদনে পাওয়া যায়, যেখানে তাঁর পরা পোশাক ও ব্যাগের সঙ্গে নতুন ছবির মিল রয়েছে।

লিংক: এখানে

এসব তথ্য থেকে ধারণা পাওয়া যায়, দুটি আলাদা ছবি প্রযুক্তির সাহায্যে সম্পাদনা করে ভাইরাল ছবিটি তৈরি করা হয়েছে। পরে সিন্থআইডি টুল দিয়ে পরীক্ষা করলে দেখা যায়, ছবিটির কিছু অংশ গুগলের এআই মডেল ব্যবহার করে তৈরি বা সম্পাদিত।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি ছবিও ঘুরছে, যেখানে দাবি করা হয়, হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ও কথিত ‘মূল শুটার’ ফয়সাল করিম মাসুদের দেওয়া তথ্যে ইনকিলাব মঞ্চের কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রচারিত ছবিতে সংগঠনটির সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের, ডাকসু নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমা, রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার ও ফাহিম আবদুল্লাহকে দেখা যায়।

লিংক: এখানে

তবে যাচাইয়ে দেখা গেছে, ইনকিলাব মঞ্চের এসব সদস্যকে গ্রেপ্তারের মতো কোনো ঘটনাই ঘটেনি। ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।

পরে প্রচারিত ছবিটি নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে হাদি হত্যার বিচার দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচি ঘিরে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে পুলিশের সঙ্গে সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। ওই ঘটনার একটি ভিডিও পাওয়া গেছে, যার সঙ্গে ভাইরাল ছবির আংশিক মিল রয়েছে। সংঘর্ষের ঘটনার পর সেদিন রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সংবাদ সম্মেলনও করে ইনকিলাব মঞ্চ।

লিংক: এখানে

ছবিটির সত্যতা যাচাই করতে গুগলের এআই-নির্ভর কনটেন্ট শনাক্তকারী টুল সিন্থআইডি দিয়ে পরীক্ষা করা হলে দেখা যায়, ছবিটির কিছু অংশ গুগলের এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি বা সম্পাদিত।