গত বছরের ৬ আগস্ট সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে সাভারের আশুলিয়া থানার সামনে পুলিশের একটি পিকআপ গাড়িতে ছয়-সাতটি পোড়া লাশ দেখতে পান মোছা. শাহিনা বেগম। এর মধ্যে একটি লাশের পায়ের মোটা হাড় উঁচু হয়ে আছে, যার সঙ্গে একটি জুতা পোড়া অবস্থায় ঝুলছিল। সেই জুতা দেখেই শাহিনা বুঝতে পারেন, এটিই তাঁর ছেলে সাজ্জাদ হোসেনের (সজল) লাশ।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এভাবে আজ রোববার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ সাজ্জাত হোসেনের মরদেহ শনাক্তের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর মা শাহিনা বেগম। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে ট্রাইব্যুনাল-১ তাঁর জবানবন্দি গ্রহণ করেন।
গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন আসামি। এর মধ্যে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি এ মামলায় ‘অ্যাপ্রুভার’ (রাজসাক্ষী হিসেবে পরিচিত) হয়েছেন।
এ মামলার নবম সাক্ষী হিসেবে শাহিনা বেগম আজ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেন। তাঁর ছেলেসহ গণ-অভ্যুত্থানের সময় হত্যাকাণ্ডের জন্য শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান, চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশের বিচার দাবি করেন শাহিনা বেগম।
এ মামলায় শাহিনা বেগমসহ আজ চার সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেন। বাকি তিনজন হলেন সবজি বিক্রেতা আবদুস সামাদ, ব্যবসায়ী মো. মিজান মিয়া ও শিক্ষার্থী নাইম শিকদার।
আবদুস সামাদ এ মামলায় ষষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, গত বছরের ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে তিনি উত্তরার আজমপুরে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। পুলিশ গুলি ছুড়তে থাকলে তাঁরা পালাতে থাকেন। একটি গুলি তাঁর মাথার পেছনে লাগে। তিনি মাটিতে পড়ে গেলে আন্দোলনকারীরা তাঁকে হাসপাতালে নেন। তবে তাঁর ঠিকমতো চিকিৎসা হয়নি। গত বছরের ৫ আগস্টের পর ইবনে সিনা হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করে তাঁর মাথার পেছন থেকে লম্বা একটি গুলি বের করা হয়। ট্রাইব্যুনালে সেই গুলি উপস্থাপন করা হয়।
সাক্ষী মিজান মিয়া জবানবন্দিতে বলেন, আবদুস সামাদের মাথার পেছন থেকে যে গুলি উদ্ধার করা হয়েছে, তদন্তকারী কর্মকর্তা তাঁর সামনে সেটি চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি জব্দ করেন। ট্রাইব্যুনালে যে গুলি উপস্থাপন করা হয়, সেটি সেই গুলি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ মামলায় অষ্টম সাক্ষী হিসেবে নাইম শিকদার জবানবন্দিতে বলেন, গত বছরের ৪ আগস্ট বিকেলে তিনি খুলনা মহানগরের শিববাড়ী মোড় এলাকায় আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। সেখান থেকে তিনিসহ আন্দোলনকারীদের একটি অংশ খুলনা শহরের নগর ভবন এলাকায় পৌঁছালে পুলিশের সঙ্গে তাদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়। ওই দিন সন্ধ্যা ছয়টার দিকে মেয়রের বাসার সামনে তাদের ওপর অতর্কিত গুলিবর্ষণ করে পুলিশ।
নাইম শিকদার বলেন, একজন পুলিশ সদস্য পাঁচ মিটার দূর থেকে তাঁকে গুলি করেন। তাঁর পিঠে প্রায় ৫০০ গুলি বিদ্ধ হয়। তাঁর শরীরের অন্যান্য স্থানেও গুলি লাগে। তখন তিনি রাস্তায় পড়ে যান। তাঁর সহযোদ্ধারা তাঁকে কাছের তিনটি হাসপাতালে নিয়ে যান। কোনো হাসপাতাল তাঁকে ভর্তি করেনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছে, ভর্তি করা যাবে না, শেখ হাসিনার নির্দেশ।
পরে অটোরিকশায় করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁকে নেওয়া হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন নাইম শিকদার। তিনি বলেন, এই হাসপাতালে পাঁচ ঘণ্টা তাঁকে কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। একপর্যায়ে তাঁর অনুরোধে একজন চিকিৎসক অজ্ঞান না করেই হাত দিয়ে তাঁর পিঠ থেকে একটি বড় গুলি বের করেন। বর্তমানে তিনি পিজি (বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এই চার সাক্ষীকে জেরায় পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন বলেন, তাঁরা মিথ্যা জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে সাক্ষীরা বলেন, তাঁরা সত্য বলেছেন।
এর আগে তিন দিনে এ মামলায় পাঁচ সাক্ষী জবানবন্দি দেন। তাঁরা হলেন মাইক্রোবাসচালক খোকন চন্দ্র বর্মণ, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল ইমরান, দিনমজুর পারভীন, শিক্ষার্থী রিনা মুর্মু ও সাংবাদিক এ কে এম মঈনুল হক।
তিন মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় বাড়ল
গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও মোহাম্মদপুর এবং গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের পৃথক তিনটি মামলায় আজ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় বাড়ানো হয়েছে। এ তিন মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় বাড়িয়ে আগামী ১৫ অক্টোবর নির্ধারণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল-১।
যাত্রাবাড়ীর মামলায় আট সপ্তাহ সময় আবেদন করেন প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ। ট্রাইব্যুনাল এ আবেদন মঞ্জুর করেন।
সুলতান মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, যাত্রাবাড়ীতে নিহত ইমাম হাসান তাইম ভুঁইয়ার মামলার সুরতহাল রিপোর্ট বিকৃত করে প্রস্তুত করেন শাহবাগ থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) শাহদাত আলী। আজ তাঁকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। ট্রাইব্যুনাল শাহদাতকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। একই সঙ্গে তাঁকে এক দিন জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
এ ছাড়া গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি মামলায় আসামিদের গ্রেপ্তারের অগ্রগতি বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২৫ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়েছে।