বিতর্কিত কর্মকর্তাকে নিজের দপ্তরে চান টেলিযোগাযোগমন্ত্রী, আপত্তি জনপ্রশাসনের

মাহমুদ হাসানছবি: কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট

যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার বিতর্কিত এক কর্মকর্তাকে নিজ মন্ত্রণালয়ে চাইছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এ জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আধা সরকারিপত্র (ডিও) দিয়েছেন তিনি। তবে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত চলছে বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাতে সাড়া দিচ্ছে না।

জনপ্রশাসন–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রীর পছন্দের ওই কর্মকর্তা বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি দপ্তরে দায়িত্ব পালন করছেন। অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের তদন্ত চলছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকায় তাকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হচ্ছে না।

দুর্নীতির অভিযোগের মুখে থাকা ওই কর্মকর্তার নাম মো. মাহমুদ হাসান। তিনি বর্তমানে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনুবিভাগ) পরিচালক পদে কর্মরত।

নতুন সরকার গঠনের এক সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম তাঁর মন্ত্রণালয়ে মাহমুদ হাসানকে পদায়নের জন্য গত ২২ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব এহছানুল হককে চিঠি পাঠান।

সেই আধা সরকারিপত্রে বলা হয়, বিসিএস ২২ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা মাহমুদ হাসান একজন পেশাদার, সৎ ও সাহসী কর্মকর্তা। বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি রাজনৈতিক বিবেচনায় দুবার দুই ধাপে পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছিলেন। বিগত সরকারের সময়েও বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। একই সঙ্গে পেশাগত ঈর্ষারও শিকার হন তিনি।

এই চিঠির পরই সচিবালয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দুর্নীতির অভিযোগ থাকার পর একজন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনার চেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, মন্ত্রীর দপ্তরের মতো সংবেদনশীল জায়গায় এমন একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তা অস্বস্তিকর বার্তা দিতে পারে।

নতুন সরকার গঠনের এক সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম তাঁর মন্ত্রণালয়ে মাহমুদ হাসানকে পদায়নের জন্য গত ২২ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। সেখানে মাহমুদ হাসানকে একজন পেশাদার, সৎ ও সাহসী কর্মকর্তা হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও তার সার্বিক রেকর্ড বিবেচনায় নেওয়া হয়। এ প্রেক্ষাপটে মন্ত্রীর সুপারিশটি গ্রহণ করা হচ্ছে না।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও তার সার্বিক রেকর্ড বিবেচনায় নেওয়া হয়। এ প্রেক্ষাপটে মন্ত্রীর সুপারিশটি গ্রহণ করা হচ্ছে না। এ জন্য আধা সরকারিপত্র দেওয়ার পর দেড় মাস হতে চললেও ওই কর্মকর্তাকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনপ্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, মাহমুদ হাসানের অনিয়মের পুরো বিষয়টি ইতিমধ্যে ডাক ও টেলিযোগাযোমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে এই প্রতিবেদক মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়েও তাঁর বক্তব্য পাননি। প্রতিবেদকের ফোন মন্ত্রী ধরেননি। বিষয়টি তুলে ধরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও মন্ত্রী সাড়া দেননি।

সরিয়ে দিয়েছিলেন শারমিন মুরশিদ

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, মাহমুদ হাসানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। তিনি তখন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমিন মুরশিদের একান্ত সচিব (পিএস) ছিলেন। শারমিন মুরশিদ পিএস পদ থেকে মাহমুদ হাসানকে সরিয়ে দিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আধা সরকারিপত্র (ডিও) দেন। সেখানে তিনি মাহমুদ হাসানের বিভিন্ন অনিয়মের কথা তুলে ধরেন।

আমার তৎকালীন পিএস মাহমুদ হাসানের কর্মকাণ্ড ছিল বিব্রতকর। তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন জায়গা থেকে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসতে থাকে। আমার এপিএসকেও অনিয়মের প্রস্তাব দেয়। আমি চাইনি এমন একজন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা আমার পিএস থাকুক।
শারমিন মুরশিদ, সাবেক উপদেষ্টা

শারমিন মুরশিদ গত ৩০ মার্চ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার তৎকালীন পিএস মাহমুদ হাসানের কর্মকাণ্ড ছিল বিব্রতকর। তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন জায়গা থেকে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসতে থাকে। আমার এপিএসকেও অনিয়মের প্রস্তাব দেয়। আমি চাইনি এমন একজন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা আমার পিএস থাকুক।’

শারমিন মুরশিদ আরও বলেন, ‘পিএসের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আমাকে দিয়ে সন্দেহজনক নথি সই করানোর চেষ্টা করতে থাকে। নথির পুরো চিত্র আমাকে বোঝানো হয়নি।’

মাহমুদ হাসানকে ‘পুরোপুরি দুর্নীতিগ্রস্ত’ আখ্যায়িত করে শারমিন মুরশিদ বলেন, ‘তিনটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও তাঁর অনিয়মের বিষয়টি উঠে আসে। পরে আমি সতর্ক হয়ে যাই। তাঁকে বিদায় করা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না।’

নিতে চাননি রিজওয়ানা হাসানও

মাহমুদ হাসান সমাজকল্যাণ উপদেষ্টার একান্ত সচিবের দায়িত্ব পেয়েছিলেন ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট। পদায়নের দুই মাসের মধ্যে তাঁকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, তবে মাহমুদ হাসানকে নিজ মন্ত্রণালয়ে নিতে রাজি হননি তৎকালীন পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তখন বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে। পরে সে বদলির আদেশ বাতিল করে তাঁকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনে (পিডিবিএফ) ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে বদলি করা হয়।

মাহমুদ হাসানকে অন্তর্বর্তী সরকার আমলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো হয়েছিল পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু তৎকালীন পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান তাতে আপত্তি তুললে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনে (পিডিবিএফ)। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে বহুমাত্রিক অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। তার তদন্ত চলার মধ্যে তাঁকে বদলি করা হয় কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পিডিবিএফে যাওয়ার পর সেখানেও মাহমুদ হাসানের বিরুদ্ধে বহুমাত্রিক অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে রয়েছে অবৈধ পদায়ন ও বদলি, নিয়োগ-বাণিজ্য, গাড়ি ও ভবন কেনায় দুর্নীতি। অভিযোগ তদন্তে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির প্রধান, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের অতিরিক্ত সচিব প্রদীপ কুমার মহোত্তম প্রথম আলোকে বলেন, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মাহমুদ হাসানের বিরুদ্ধে অনিয়মের তদন্ত চলছে। এরই মধ্যে শুনানি হয়েছে।

এসব অভিযোগের মুখে মাহমুদ হাসানকে পিডিবিএফ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে।

অভিযোগ অস্বীকার মাহমুদ হাসানের

শারমিন মুরশিদের তোলা অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করছেন মাহমুদ হাসান। তিনি দাবি করেছেন, অভিযোগের মুখে নয়, তিনি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ছেড়ে এসেছিলেন স্বেচ্ছায়।

আমি দুই মাসের মতো তৎকালীন উপদেষ্টার পিএস ছিলাম। এ দুই মাসে কী করতে পারি? তিনি যে আমার অনিয়ম নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আধা সরকারিপত্র দিয়েছেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি নিজ দায়িত্বে পিএসের পদ থেকে সরে গেছি। অনিয়মের কোনো প্রশ্নই আসে না।
মাহমুদ হাসান, পরিচালক, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর

মাহমুদ হাসান ৫ এপ্রিল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি দুই মাসের মতো তৎকালীন উপদেষ্টার পিএস ছিলাম। এ দুই মাসে কী করতে পারি? তিনি যে আমার অনিয়ম নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আধা সরকারিপত্র দিয়েছেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি নিজ দায়িত্বে পিএসের পদ থেকে সরে গেছি। অনিয়মের কোনো প্রশ্নই আসে না।’

পিডিবিএফে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে মাহমুদ হাসান পাল্টা দাবি করেন, অনিয়মে বাধা দেওয়ায় তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন।

‘সেখানে একটি সিন্ডিকেট নিয়োগে বাণিজ্য করতে চেয়েছিল। আমার কারণে তাঁরা নিয়োগ বাণিজ্য করতে পারেনি,’ বলেন মাহমুদ হাসান।