শৈশবে তার স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। ছোটবেলা থেকেই মেডিকেল স্টেম কার্যক্রমে অংশ নেওয়া, চিকিৎসা পেশা ঘিরে নানা কৌতূহল—সব মিলিয়ে পরিবারও ধরে নিয়েছিল, মেয়েটি একদিন সাদা অ্যাপ্রন গায়ে জড়িয়ে হাসপাতালের করিডরে হাঁটবে। রোগীর সেবা করবে। কিন্তু জীবন সব সময় এক রেখায় এগোয় না। কখন, কোথায়, কীভাবে স্বপ্নের পথ বদলে যায়, তা হয়তো আগে থেকে বোঝাই যায় না।
বাংলাদেশি মা–বাবার সন্তান এভা ছোয়ার জীবনের মোড়ও ঘুরে যায় একদিন ইউটিউব স্ক্রল করতে করতে। বয়স তখন মাত্র ১০ বছর। ফিডে ভেসে আসে একটি বিমান দুর্ঘটনার ভিডিও। সেটি ছিল ইউএস এয়ারওয়েজ ফ্লাইট–১৫৪৯, যেটি ২০০৯ সালে ইঞ্জিন বিকল হয়ে নিউইয়র্কের হাডসন নদীতে জরুরি অবতরণ করেছিল।
৪৫ মিনিটের সেই ভিডিওটি সে দেখেছিল টান টান উত্তেজনায়। শব্দ বাড়িয়ে, চোখ না সরিয়ে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছিল, ক্যাপ্টেন চেসলি সুলেনবার্গার কীভাবে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন এবং পানিতে বিমান নামিয়ে ১৫৫ জন যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করেন। তবে এভাকে সবচেয়ে বেশি টেনেছিল ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ডের তদন্ত কার্যক্রম! ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড কীভাবে দুর্ঘটনার রহস্য উন্মোচন করল, তা দেখার পর এভা বুঝতে পারে, তার ভেতরেও আকাশ ছোঁয়ার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে আছে।
স্বপ্নের প্রথম দ্বন্দ্ব
উচ্চমাধ্যমিকের শুরুর দিকে সে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট হওয়ার সিদ্ধান্তটি নিয়ে ভাবতে শুরু করে। এর পেছনে মূলত দুটি কারণ ছিল—রক্ত দেখা তার পছন্দ নয় এবং পেশাটি আর্থিকভাবে বেশ লাভজনক। কিন্তু অবসর সময়ে বিমান দুর্ঘটনার তদন্তের ভিডিও দেখার শখ তত দিনে তার নেশায় পরিণত হয়েছে। প্রতিটি ভিডিও তার কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিত। সে ভাবত, এমন পরিস্থিতি যদি নিজের জীবনে ঘটে, তাহলে মানুষকে বাঁচাতে কী করতে হবে?
প্রথম বর্ষ শেষ হওয়ার পর সে নিজেকে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে আবিষ্কার করে। অ্যানেসথেসিওলজিস্ট হওয়া আর্থিকভাবে লাভজনক হলেও সে নিজেকে প্রশ্ন করে, ‘আমি কি সত্যিই এটা করতে চাই?’ গ্রীষ্মকাল শেষ হওয়ার পর সে নিশ্চিত হয়, চিকিৎসাক্ষেত্রে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা তার নেই। এই উপলব্ধি তাকে হতাশ করেনি, বরং নতুন পথের সন্ধানে আরও দৃঢ় করেছে।
প্রশিক্ষকের সঙ্গে পরিচয়
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এভা মা–বাবাকে জানায়, সে পাইলট হতে চায়। প্রথমে কিছুটা ভীত হলেও মেয়ের আগ্রহ ও উদ্যম দেখে তাঁরা সমর্থন জোগান। পরিচিত এক পাইলটের মাধ্যমে লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাসরত অভিজ্ঞ বাংলাদেশি সার্টিফায়েড ফ্লাইট ইনস্ট্রাক্টর অ্যালেন ইলিয়াস খানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।
ইলিয়াস খান এভা ও তার ছোট বোনকে বিমানে করে নিয়ে যান সিক্স ফ্ল্যাগসের চারপাশে। পুরোটা সময়জুড়ে প্রশিক্ষককে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকে এভা। বিমান–সম্পর্কিত যেকোনো কিছুতেই তার প্রবল কৌতূহল। আকাশের সেই অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারণ। প্রথমবারের মতো বিমানের ককপিটে বসে সে বুঝতে পারে, এই জায়গাতেই তার থাকা উচিত।
প্রথম উড্ডয়নের পর প্রশিক্ষক তাকে একটি বাড়ির কাজ দেন—প্রাইভেট পাইলটের মৌখিক পরীক্ষার দেড় ঘণ্টার একটি ভিডিও দশবার দেখতে হবে। কঠিন হলেও এটি ছিল বেশ শিক্ষণীয়। মা–বাবা তাকে অ্যাভিয়েশনের বড় বড় বই কিনে দেন, বাবা উপহার দেন আধুনিক একটি হেডফোন।
নিবিড় প্রশিক্ষণ ও ল্যান্ডিংয়ের কৌশল
এরপর শুরু হয় কঠোর প্রশিক্ষণ। সপ্তাহে এক দিন স্থানীয় বিমানবন্দরে গিয়ে এক থেকে দুই ঘণ্টার ফ্লাইট চলত। প্রশিক্ষকের সঙ্গে এভা অনেকগুলো বিমানবন্দর ঘুরে প্রতিটি ধাপ শিখতে থাকে। সবচেয়ে কঠিন ছিল বিমান ল্যান্ডিং বা অবতরণ করানো। এটি শিখতেই তার দুই মাস সময় লেগে যায়। যেদিন প্রথম সুন্দরভাবে ল্যান্ডিং সম্পন্ন করল, সেদিন প্রশিক্ষক বলে উঠলেন, ‘বাটার স্মুথ’ (মাখনের মতো মসৃণ)।
২০২৬ সালের জানুয়ারি নাগাদ তার ল্যান্ডিং আরও নিখুঁত হয়। প্রতিবার ল্যান্ডিং হতে থাকে সঠিক ও ধারাবাহিক। দ্রুত শিখতে পারায় এভা নিজেও গর্বিত। তবে শুধু ওড়া নয়, গ্রাউন্ড স্কুলেও প্রতিদিন শিখতে হতো বিমানবন্দরের নিয়মনীতি, ফ্লাইট পরিকল্পনা, নেভিগেশন, আবহাওয়া বিশ্লেষণ, বিমানের যন্ত্রপাতি এবং ফ্লাইট নিরাপত্তাবিষয়ক নানা জ্ঞান। প্রতিটি ফ্লাইটের আগে-পরে প্রশিক্ষক বিশ্লেষণ করতেন কী ভুল হয়েছে, কীভাবে তা এড়ানো যায় এবং কোন কৌশল ব্যবহার করলে ভালো হয়।
প্রথম একাকী উড়ান
অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। গত ২৯ মার্চ নিজের ১৬তম জন্মদিনে এভা ছোয়া তার প্রথম ‘সোলো ফ্লাইট’ সম্পন্ন করে। প্রশিক্ষক ছাড়া একাই বিমান নিয়ে আকাশে ওড়ে সে। তিনটি সফল টেকঅফ ও অবতরণের মাধ্যমে সে অর্জন করে প্রথম সোলো ফ্লাইটের মর্যাদা।
এভা ছোয়া প্রথম আলোকে বলে, ‘সকলের জন্য আমার বার্তা—স্বপ্ন দেখো, ওড়ো এবং তা বাস্তব করো। বিশেষ করে আমাদের দেশের মেয়েরা। আমি আশা করি, আমি তাদের প্রেরণা দিতে পারব।’
ফ্লাইট শেষের অনুভূতি জানাতে গিয়ে সে বলে, শুরুর কয়েক মিনিট রক্তচাপ বেড়ে গিয়েছিল, কিন্তু মনোযোগ ধরে রাখার কারণে সব নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা তাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করেছে।
প্রশিক্ষক ও প্রবাসীদের গর্ব
এভার এই অর্জনে উচ্ছ্বসিত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও। তার প্রশিক্ষক অ্যালেন ইলিয়াস খানের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে এর আগে ১৭ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাইভেট পাইলট সার্টিফিকেট অর্জন করেছিলেন লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাসরত আরেক বাংলাদেশি আহনাফ আবিদ। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) থেকে ওই সনদ পান তিনি। এবার ১৬তম জন্মদিনে এভা একা উড়াল দিল। এফএএর নিয়ম অনুযায়ী, ১৬ বছর বয়সে সে এখন প্রশিক্ষক ছাড়াই নিজে বিমান চালাতে পারবে।
ইলিয়াস খান প্রথম আলোকে বলেন, লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাসরত আহনাফ ও এভা ছোয়ার এই অর্জন শুধু তাদের ব্যক্তিগত স্বপ্নপূরণ নয়, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও গর্বের বিষয়। এ কারণেই এভাকে উৎসাহ দিতে সেদিন বিমানবন্দরে জড়ো হয়েছিলেন সবাই। এমনকি তরুণ পাইলট আহনাফও ছুটে এসেছিলেন উৎসাহ দিতে।
১৭ বছর বয়সী পাইলট আহনাফ আবিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এভা ছোয়ার আজকের অর্জন আমাদের উভয়ের জন্যই অনুপ্রেরণাদায়ক। প্রবাসী বাংলাদেশিরা আমাদের এই গল্প থেকে অনুপ্রাণিত হবেন।’
মেয়ের এমন সাফল্যে গর্বিত বাবা বিপ্লব শিকদার বলেন, ‘আমরা সব সময়ই চেয়েছি মেয়ে তার স্বপ্ন পূরণ করুক। এভা যেভাবে সাহসের সঙ্গে এত যত্নসহকারে প্রস্তুতি নিয়েছে, তাতে আমরা সত্যিই গর্বিত।’ মা তানিয়া শিকদারের কণ্ঠেও একই সুর, ‘এভা ছোটবেলা থেকেই এ স্বপ্ন দেখেছে, আমরা শুধু সমর্থন জুগিয়েছি। ওর এই উড্ডয়ন ও আত্মবিশ্বাস আমাদের অনেক আনন্দ দিয়েছে।’
উচ্চমাধ্যমিক শেষে এভিয়েশনে ডিগ্রি নেওয়ার পাশাপাশি পাইলট রেটিং বাড়ানোর লক্ষ্য এভা ছোয়ার। তার চূড়ান্ত স্বপ্ন, একজন দক্ষ এয়ারলাইনস পাইলট হওয়া।