জুলাইয়ে হত্যাচেষ্টার এক মামলায় শেখ হাসিনাসহ সব আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ

শেখ হাসিনাফাইল ছবি

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় মো. সাহেদ আলী নামের এক ব্যক্তি এবং ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের ৯ শিক্ষার্থীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে করা এক মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১৫ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

মামলায় বর্ণিত আহত ব্যক্তিদের খোঁজ না পেয়ে ‘তথ্যগত ভুল’ থাকার কথা উল্লেখ করে গত বছরের ৫ নভেম্বর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক মো. শাহজাহান ভূঁইয়া। ২২ ডিসেম্বর চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণের বিষয়ে শুনানির জন্য বাদীকে নোটিশ ইস্যু করার আদেশ দেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রাজু আহমেদ। আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ রাখা হয়েছে। তবে মামলার প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বিষয়টি আজ সোমবার প্রকাশ পায়।

২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর শরিফ নামের এক ব্যক্তি সাহেদ আলী ও ৯ শিক্ষার্থীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ ১১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। সেখানে সাহেদকে নিজের ছোট ভাই বলে উল্লেখ করেন তিনি।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরুর পর দমন–পীড়ন শুরু করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। আন্দোলন বেগবান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দমন–পীড়নও বাড়ে, রক্তাক্ত এক অধ্যায় পেরিয়ে সেই আন্দোলন অভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল। তাতে ওই বছরের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ থেকে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জুলাইয়ের নানা হামলা, নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হতে থাকে। তার মধ্যেই ধানমন্ডি থানায় শরিফ নামের ওই ব্যক্তি মামলাটি করেন। এজাহারে অভিযোগ করা হয়, ওই বছরের ৪ আগস্ট জিগাতলার সীমান্ত স্কয়ার থেকে বাসায় ফেরার পথে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কের মীনা বাজারের সামনে বিবাদীদের ইন্ধনে নিরপরাধ মানুষের ওপর শত শত গুলিবর্ষণ হয়। তখন আহত হন সাহেদ আলীসহ নয়জন।

এজাহারে শেখ হাসিনার পাশাপাশি তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদ, মোহাম্মদ এ আরাফাত, জুনাইদ আহ্‌মেদ পলক, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আওয়ামী লীগ নেতা মাহাবুব উল আলম হানিফ, শামীম ওসমান, শেখ ফজলে নূর তাপস, তৎকালীন সংসদ সদস্য ফেরদৌস আহমেদ, ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, ডা. দ্বীন মোহাম্মদ নুরুল হকসহ ১১৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, এজাহারনামীয় ১১৩ জনের পাশাপাশি আরও দুজনকে সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁদেরসহ মোট ১১৫ জনের সবাইকে অব্যাহতি দিতে সুপারিশ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলার জখমি সাহেদ আলীর সন্ধান করার জন্য ধানমন্ডির সীমান্ত স্কয়ার বিপণিবিতানসহ ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজে সরেজমিনে হাজির হয়ে প্রকাশ্য ও গোপনে খোঁজ করেন তদন্ত কর্মকর্তা। মামলার ঘটনাস্থলে এবং ঘটনার তারিখ ও সময়ে আহত হওয়াদের কারও সন্ধান পাওয়া যায়নি। ভুক্তভোগীর সন্ধানে তদন্ত কর্মকর্তা সীমান্ত স্কয়ারে দোকান মালিক সমিতির সভাপতির কাছে চিঠি পাঠান। চিঠির জবাবে বলা হয়েছে, ‘মো. সাহেদ আলী নামে সীমান্ত স্কয়ার মার্কেটে কোনো দোকানমালিক পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া সীমান্ত স্কয়ার মার্কেট ও সীমান্ত সম্ভারে মো. সাহেদ আলী নামে কোনো দোকানমালিক বা কর্মচারী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহত হয়েছেন, এমন কোনো সংবাদ তাঁদের জানা নাই।’

বাদী শরিফ মামলায় ঢাকা কলেজের ছাত্র রাশেদ, ঢাকা সিটি কলেজের ছাত্র জুয়েল, মাহমুদ, নাহিদ, রাসেল, মীরাজ, জান্নাতুল ফেরদৌস নাইমা, আইশ আক্তার, সাম্মি আক্তার আহত হওয়ার কথা মামলায় উল্লেখ করেছেন। সে জন্য তাঁদের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের অধ্যক্ষ বরাবর চিঠিও পাঠান তদন্ত কর্মকর্তা শাহজাহান ভূঞা। তবে পূর্ণাঙ্গ নাম, ক্লাস রোল, বিষয় বা বিভাগ, বাবা–মায়ের নাম না থাকায় কলেজ দুটোর কর্তৃপক্ষগুলোও কোনো তথ্য দিতে পারেনি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অনুসন্ধানে ঘটনাস্থলের আশপাশে কোনো হাসপাতালে ভুক্তভোগীদের চিকিৎসা গ্রহণ করার তথ্যও তদন্ত কর্মকর্তা পাননি। বাদীকে নোটিশ দিয়ে অনুরোধ করেন তাঁর ভাইকে থানায় হাজির করতে। তবে তাতেও সাড়া মেলেনি।

মামলাসংক্রান্ত তথ্যের জন্য বাদীর হাজারীবাগের ভাড়া বাসায় নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। তবে বাড়িওয়ালা জানান, শরিফ নামের কাউকে চেনেন না এবং সেখানে থাকেন না। পরে জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করে বের করেন, বাদীর নাম শরিফুল ইসলাম। লক্ষ্মীপুর সদরের মান্দারী এলাকার সিরাজুল ইসলামের ছেলে তিনি। তবে সেখানে খবর নিয়েও তাঁর বিষয়ে কোনো খোঁজ স্থানীয়দের কাছে পাননি বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাদীর মোবাইল নম্বর বন্ধ থাকে। তবে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করেন তদন্ত কর্মকর্তা। বেশ কয়েক দিন অপেক্ষার পর শরিফ ধানমন্ডি লেকের পাশে তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করেন। তদন্ত কর্মকর্তা তাঁকে ভুক্তভোগীকে হাজির করতে এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র সরবরাহের অনুরোধ জানান। তবে দীর্ঘদিন পার হলেও তিনি ভুক্তভোগীকে হাজির বা চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র সরবরাহ করেননি। চিকিৎসাসংক্রান্ত কোনো তথ্য এজাহারেও উল্লেখ করেননি।

তদন্ত কর্মকর্তা শাহজাহান ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘তখন অনেক অনুসন্ধান করেছি। সম্পূর্ণ বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছি।’

জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলছে। একটি মামলায় শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়ও হয়েছে। এই মামলায় অব্যাহতি পাওয়া জুনাইদ আহ্‌মেদ পলক অন্য বেশ কয়েকটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে রয়েছেন।