প্রাথমিকে সংগীতশিক্ষকের সংকট, আপাতত যেভাবে এগোতে চায় সরকার
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ রেখে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিধিমালা করা হয়েছিল। তবে বিরোধিতার মুখে দুই মাসের মাথায় বিধিমালা সংশোধন করে সেই সুযোগ বাতিল করেছিল তৎকালীন সরকার। ফলে সংগীত বিষয়ে আলাদা শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ থেমে যায়।
এখন নতুন সরকার আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে ‘কালচার’ ও ‘স্পোর্টস’ নামে দুটি নতুন বিষয় যুক্ত করতে যাচ্ছে। পাশাপাশি ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ (আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা) ও ‘টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল এডুকেশন’ (কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা) নামে আরও দুটি বিষয় বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সংগীতশিক্ষকের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। সরকারের বর্তমান পরিকল্পনা হলো, আপাতত যেহেতু এ বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, তাই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তাদের (মন্ত্রণালয়) সংগীতশিক্ষকদের গুচ্ছ (ক্লাস্টার) আকারে কাজে লাগানো হবে। পাশাপাশি কেরাত প্রতিযোগিতা, নৈতিকতা ও পারিবারিক মূল্যবোধবিষয়ক কার্যক্রম নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।
এ বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, তাঁরা কেরাত প্রতিযোগিতার আয়োজন করছেন। সংগীত প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নৈতিকতা, পারিবারিক মূল্যবোধের মতো বিষয়গুলো নিয়ে একসঙ্গে কাজ চলছে।
এহছানুল হক বলেন, আসলে শিক্ষক নেই। এ জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথ সহযোগিতায় তাদের যে সংগীতশিক্ষক রয়েছেন, তাঁরা ক্লাস্টার করে উপজেলাপর্যায়ে সহযোগিতা করবেন। ভবিষ্যতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান শিল্পকলা একাডেমি এ ব্যাপারে সহযোগিতা করবে। আপাতত তাঁরা সেভাবেই এগোচ্ছেন। ক্রমান্বয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সংস্কৃতি ও সংগীত বিভাগ চালু হচ্ছে। সেখান থেকে শিক্ষক পাওয়া যাবে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীতশিক্ষক নিয়োগে মন্ত্রিপরিষদ ‘অসম্মতি’ দিয়েছে বলে যা বলা হচ্ছে, সেই তথ্য সঠিক নয় বলে জানান প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, মন্ত্রিসভায় এ ধরনের কোনো আলোচনা হয়নি।
প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য সংগীত বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কোনো আলাদা পাঠ্যপুস্তক নেই। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের কোনো পরীক্ষা দিতে হয় না। তবে বছর শেষে শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করেন। এ জন্য শিক্ষক নির্দেশিকা রয়েছে।
নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত সংগীতগুলো তারা আত্মস্থ করতে পারলে তাদের মধ্যে দেশের ইতিহাস–ঐতিহ্যের চেতনা, মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, শ্রমের প্রতি মর্যাদা ও বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীভর্তি হার বাড়বে, ঝরে পড়া কমবে।
প্রাথমিক স্তরে মোট ১৩টি গান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গানগুলো হলো—‘আমার সোনার বাংলা’ (জাতীয় সংগীত), ‘এই সুন্দর ফুল, সুন্দর ফল, মিঠা নদীর পানি’, ‘রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি বাংলাদেশের নাম’, ‘আমরা করব জয়’, ‘আল্লা মেঘ দে পানি দে’, ‘প্রজাপতি, প্রজাপতি! কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা’, ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’, ‘নিজের হাতে কাজ কর’, ‘চল চল চল’, ‘প্রিয় ফুল শাপলা ফুল’, ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’, ‘আমরা সবাই রাজা’ ও ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’।
শিক্ষকদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, যেসব শিক্ষক আগে কখনো সংগীত শেখেননি, তাঁদের জন্য স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ খুব বেশি কার্যকর হয় না।
এ পরিস্থিতিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২০ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব তৈরি করেছিল। এর ভিত্তিতে ২০২৪ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই দুই বিষয়ে মোট ৫ হাজার ১৬৬ জন শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্মতি দেয়। এর মধ্যে সংগীত বিষয়ে ২ হাজার ৫৮৩ জন ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে ২ হাজার ৫৮৩ জন শিক্ষক নিয়োগের কথা ছিল।
গত বছর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেয়। এ জন্য গত বছরের ২৮ আগস্ট ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৫’-এর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছিল।
কিন্তু তখন ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দল–সংগঠনের নেতারা সভা–সেমিনার–বিক্ষোভ সমাবেশে সংগীতশিক্ষকের পরিবর্তে ধর্মশিক্ষক নিয়োগের দাবি জানান। সংগীতশিক্ষক নিয়োগ বাতিল না করলে আন্দোলনের হুমকি দেওয়া হয়। এ অবস্থায় বিধিমালা জারির দুই মাসের মধ্যে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা’ সংশোধন করেছিল। সংশোধিত বিধিমালায় সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ বাদ দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে তখন বিক্ষোভ–সমাবেশ হয়েছিল।
প্রথমে জারি করা বিধিমালায় চার ধরনের শিক্ষকের কথা বলা হয়েছিল। ধরনগুলো হলো—প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক (সংগীত) ও সহকারী শিক্ষক (শারীরিক শিক্ষা)। কিন্তু সংশোধিত বিধিমালায় কেবল প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের পদ রাখা হয়।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ৬৫ হাজারের বেশি। এগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ। শিক্ষকের সংখ্যা পৌনে চার লাখের মতো।
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। প্রথম শ্রেণি ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে পড়ানো হয়। আর তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ছয়টি বিষয় পড়ানো হয়। বিষয়গুলো হলো—বাংলা, ইংরেজি, গণিত, প্রাথমিক বিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং নিজ নিজ ধর্ম শিক্ষা। প্রাথমিকে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ হয় না। প্রত্যেক শিক্ষকই সব বিষয় পড়ান। তবে কয়েক বছর ধরে ২০ শতাংশ পদ বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের দিয়ে পূরণ করা হচ্ছে।