যে বাজেটে ১৫০ আসনের জন্য ইভিএম কেনা হবে, তার থেকে ভালো হবে যতখানি সম্ভব সিসিটিভি ব্যবহার করা।
এম সাখাওয়াত হোসেন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার

এ ছাড়া সাবেকদের সবাই জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সেবা ইসির হাতে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁরা বলেন, এই সেবা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চলে গেলে ভোটার তালিকা ও ইভিএমে ভোট করতে গিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। মানুষ ভোটার হওয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।

ইসি সূত্র জানায়, সিসিটিভি ক্যামেরায় ভোট পরিস্থিতি দেখে অনিয়মের কারণে গাইবান্ধা-৫ আসনে ভোট গ্রহণ বন্ধ করে দিয়ে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনার মুখে পড়ে ইসি। মূলত এই বিষয় নিয়ে সাবেকদের মতামত জানার উদ্দেশ্যে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। এতে ২৮ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও সাবেক তিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার, চারজন নির্বাচন কমিশনার এবং ইসি সচিবালয়ের সাবেক পাঁচ সচিব ও দুজন অতিরিক্ত সচিব অংশ নেন। তাঁদের প্রায় সবাই গাইবান্ধা–৫ আসনের ভোট বন্ধে ইসির পদক্ষেপ সঠিক ছিল বলে মত দেন। শুধু সাবেক সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, একটি ভোটকেন্দ্রেও যদি সুষ্ঠু ভোট হয়ে থাকে, তবে সেটি বন্ধ করা ঠিক হয়নি।

সভা সূত্র জানায়, শুরুতেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হাবিবুল আউয়াল বলেন, সাবেকদের কাছ থেকে গাইবান্ধা–৫ আসনের ভোট বন্ধ করে দেওয়া, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবহার এবং এসব বিষয়ে আইনের কোনো সংস্কার প্রয়োজন আছে কি না, সে বিষয়ে মতামত জানতে চায় ইসি।

সভা সূত্র জানায়, সাবেক সিইসি আব্দুর রউফ সভায় বলেন, রাজনৈতিক সরকারের অধীনে ভোট হলে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারদের কাছে হাতজোড় করলেও তারা ইসির কথা শুনবে না।

তারা সরকারের কথাই শুনবে। নির্বাচনে কোনো ধরনের গন্ডগোল হলে নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বৈঠকে বলেন, নির্বাচনী অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে ইসি যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সাবেক সিইসি কে এম নূরুল হুদা বলেন, মাঠ পর্যায়ে ডিসি ও এসপিদের সঙ্গে দূরত্ব দূর করতে হবে। তারা ইসির কথা

শুনবেন না, এটা ঠিক নয়। সাবেক নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম বলেন, মাঠের সমন্বয় না থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বলেন, সম্প্রতি ইসির সঙ্গে একটি বৈঠকে ডিসিরা যে আচরণ করেছেন, তা কাম্য নয়।

ইভিএম নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে

বৈঠক সূত্র জানায়, সভায় এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ইভিএম নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদ আছে। তিনি ইভিএমের বদলে সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেন। সাবেক সচিব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, ইভিএমের পেছনে যাঁরা থাকেন, তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করা ইসির পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এই যন্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। অবশ্য মতবিনিময়ে সাবেক কমিশনারদের বেশির ভাগ ইভিএমের পক্ষে কথা বলেন।

বৈঠক শেষে এম সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভালো হোক, মন্দ হোক ইভিএম নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। যে বাজেটে ১৫০ আসনের জন্য ইভিএম কেনা হবে, তার থেকে ভালো হবে যতখানি সম্ভব সিসিটিভি ব্যবহার করা।’

ব্যালটে ভোটের পক্ষে মত দিয়ে সাবেক এই কমিশনার বলেন, ‘পেপার ব্যালটে ভোট চুরি করলেও সেটি খুঁজে বের করা সহজ। আপনাদের কাছে ভোটার লিস্ট (ছবিসহ) আছে। স্বাক্ষর আছে। সূক্ষ্ম কারচুপি, আপনারা যেটা দেখলেন ইভিএমে, বাইরের পরিবেশ ফার্স্ট ক্লাস! ঝামেলা নেই। হইচই নেই। কিন্তু ভেতরে কী হচ্ছে? অন্য সিস্টেমে (ব্যালটে) যখন এটা হবে, বাইরেও হইচই হবে। কারণ, একা তো পারবেন না। ভোট কাটতে হলেও পাঁচ–ছয়জন লাগবে। এতে প্রতিপক্ষ তো হইচই করবে। এটা আপনারা ভালো করে দেখতে পারবেন। ভোটকক্ষের সিসিটিভি তো কষ্ট করে দেখতে হয়।’

গাইবান্ধায় নির্বাচন বন্ধ করা সঠিক

মতবিনিময় শেষে সিইসি হাবিবুল আউয়াল বলেন, সাবেকরা মতবিনিময়ে বলেছেন, গাইবান্ধায় ইসি যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা আইনগত ও সাংবিধানিকভাবে ঠিক হয়েছে। গাইবান্ধায় নির্বাচন বন্ধ করা নিয়ে সব মহলে ‘যথেষ্ট সেনসেশন (চাঞ্চল্য)’ তৈরি হয়েছে। এটা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য হয়েছে। এ বিষয়টি সাবেকরা কীভাবে মূল্যায়ন করেছেন, তা ইসি জেনেছে।

সিইসি হাবিবুল আউয়াল সাংবাদিকদের বলেন, ইভিএম নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে কথা হয়েছে। পক্ষেই বেশি বলেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, ইভিএম নিয়ে মানুষের নেতিবাচক মনোভাব আছে। তিনি বলেন, এনআইডি সেবা ইসির হাতে থাকা প্রয়োজন, এক বাক্যে সবাই এ কথা বলেছেন গাইবান্ধা-৫ আসনের ভোট বন্ধের সিদ্ধান্তের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আব্দুর রউফ সাংবাদিকদের বলেন, ইসির চোখের সামনে ধরা পড়ছে, মানুষ ভোট দিতে পারছে না। কারচুপি হচ্ছে। তারা নির্বাচন বন্ধ করে দিয়েছে। এই অধিকার ইসির আছে।

তখন আব্দুর রউফকে প্রশ্ন করা হয়, আপনি সিইসি থাকার সময় অনুষ্ঠিত মাগুরা উপনির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম হলেও এ ধরনের ঘটনায় কেন ব্যবস্থা নিতে পারেননি? জবাবে তিনি বলেন, ‘পেছনেরটা টেনে এনে জাতিকে আর আন্ধার মধ্যে ফেলবেন না।’ এ সময় সাবেক সিইসি নূরুল হুদা বলেন, ‘পেছনের কথা টানেন কেন?’

কাজী হাবিবুল আউয়ালের সভাপতিত্বে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে অনুষ্ঠিত এ মতবিনিময় সভায় আরও অংশ নেন সাবেক সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ, সাবেক নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম, সাবেক ইসি সচিব এম এ রেজা, সচিব মুহম্মদ সাদিক, সিরাজুল ইসলাম, ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী ও মোখলেসুর রহমান।