রঙে রঙে নিঃশব্দ তপস্যা

মনিরুল ইসলামছবি: মীর হোসেন

শিল্পী মনিরুল ইসলামের ধানমন্ডির ফ্ল্যাট বাড়িটাই তাঁর স্টুডিও আর ছবির ভাঁড়ার। হাজারও ছবি এঁকেছেন তিনি, ক্রমাগত এঁকে চলেছেন। ছবি আঁকার জন্য তিনি এখন পছন্দ করেন কাগজ, আর সেই কাগজের জন্য সামনে যা পান, তা-ই তুলে নেন—পত্রপত্রিকার পাতা, ফ্রিজের প্যাকেট, ক্যাটালগ। এত এত ছবি, এসব কোথায় যাবে, এসবের পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে চিন্তিত নন তিনি। শিল্পের মগ্ন তাপস সাধনার মতো করে এঁকে চলেছেন, চেষ্টা করছেন নিজের বৃত্ত ক্রমাগতভাবে ভাঙার।

ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো সিরিজের অংশ হিসেবে তাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫।

শিল্পী মনিরুল ইসলামের জন্ম জামালপুরে, ১৯৪৩ সালের ১৭ আগস্ট। শৈশব কিশোরগঞ্জে, কৈশোরে পরীক্ষার জন্য চাঁদপুর, তারপর ঢাকার চারুকলা, আর সেখান থেকে স্পেন—দেশ থেকে দেশান্তরে নদীর মতো বয়ে চলা এক জীবন।

কিশোরগঞ্জের রামানন্দ হাইস্কুলে এক শিক্ষক তাঁকে প্রথম বলেছিলেন, ‘তুই আর্টিস্ট।’ ওই একটি শব্দই যেন তাঁর জীবনের দিক বদলে দেয়। পরে ঢাকায় চারুকলায় ভর্তি হওয়া—তখনকার গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্টস—ছিল প্রায় অনিবার্য। অন্য কোনো রাস্তা তাঁর সামনে খোলা ছিল না।

অনলাইনে কোথাও লেখা আছে, তাঁর জন্ম চাঁদপুরে। কোথাও জামালপুর। তিনি নিজেই হেসে বলেন, ‘আমার জন্ম জামালপুরে। তিন মাস বয়সে কিশোরগঞ্জে চলে যাই। মানুষ তো জন্মায় এক জায়গায়, কিন্তু গড়ে ওঠে আরেক জায়গায়।’ কথাটা তাঁর জীবনের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি খাটে।

শৈশব ও কৈশোরের কিশোরগঞ্জই তাঁর ভিত তৈরি করেছে। দেয়ালপত্রিকার জন্য ছবি আঁকা, রিকশার পেছনের সিনেমার বিলবোর্ড দেখা, স্বাস্থ্য বিভাগের পোস্টারের রং ও গন্ধ—এসবই ছিল তাঁর প্রথম ভিজ্যুয়াল শিক্ষা। বাবা ছিলেন স্যানিটারি ইন্সপেক্টর। কলেরা, বসন্তের পোস্টার, কাচের স্লাইডে আঁকা সতর্কবার্তা—এই সব দৃশ্য, এই সব রং তাঁর ভেতরে কোথাও গোপনে একটি বীজ বুনে দিয়েছিল।

পড়াশোনায় তিনি ভালো ছিলেন না। ম্যাট্রিক পাস করতে হয়েছে তিনবারে। তাঁকে বলি, ‘একাডেমিক রেজাল্ট ভালো হলে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বা মনিরুল ইসলাম হওয়া যায় না।’

কিশোরগঞ্জের রামানন্দ হাইস্কুলে এক শিক্ষক তাঁকে প্রথম বলেছিলেন, ‘তুই আর্টিস্ট।’ ওই একটি শব্দই যেন তাঁর জীবনের দিক বদলে দেয়। পরে ঢাকায় চারুকলায় ভর্তি হওয়া—তখনকার গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্টস—ছিল প্রায় অনিবার্য। অন্য কোনো রাস্তা তাঁর সামনে খোলা ছিল না।

আবদুল বাসেত, মুস্তাফা মনোয়ার, মোহাম্মদ কিবরিয়া—এই সব শিক্ষক ও সহপাঠীর মধ্যেই তৈরি হলো তাঁর শিল্পচেতনা। ছাত্রাবস্থায় তিনি দিনে চারটি করে জলরং করতেন। সাইকেলে করে রায়েরবাজারে যাওয়া, রাতে কুপি জ্বালিয়ে আঁকা—এ যেন নেশার মতো ছিল। শিল্প তাঁর কাছে কখনো পেশা নয়; বরং জীবনযাপনের একটি স্বাভাবিক রীতি।

চারুকলায় এসে তিনি দেখলেন জয়নুল আবেদিনকে। ক্লাস নিতেন না, কিন্তু উপস্থিতিতেই শিক্ষা দিতেন। অলিভ রঙের হাওয়াই শার্ট, সাদা প্যান্ট, জার্মান ক্যামেরা, আর চোখে পৃথিবী দেখার এক অন্য রকম দৃষ্টি।

আবদুল বাসেত, মুস্তাফা মনোয়ার, মোহাম্মদ কিবরিয়া—এই সব শিক্ষক ও সহপাঠীর মধ্যেই তৈরি হলো তাঁর শিল্পচেতনা। ছাত্রাবস্থায় তিনি দিনে চারটি করে জলরং করতেন। সাইকেলে করে রায়েরবাজারে যাওয়া, রাতে কুপি জ্বালিয়ে আঁকা—এ যেন নেশার মতো ছিল। শিল্প তাঁর কাছে কখনো পেশা নয়; বরং জীবনযাপনের একটি স্বাভাবিক রীতি।

১৯৬৯ সালে তিনি যান স্পেনে, মাত্র ৯ মাসের স্কলারশিপে। কিন্তু সেই ৯ মাসই হয়ে যায় জীবনের মোড় ঘোরানো সময়। যুদ্ধ, রাজনীতি, পাকিস্তানি প্রোপাগান্ডা—সবকিছুর মধ্যেই তিনি নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। স্কলারশিপ বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু থেমে যান না। শুরু করেন প্রিন্টমেকার হিসেবে কাজ। অন্য শিল্পীদের ছবি ছাপাতে ছাপাতে নিজেই হয়ে ওঠেন একজন বড় গ্রাফিক শিল্পী।

স্পেন তাঁকে দিয়েছে নাগরিকত্ব, দিয়েছে জাতীয় সম্মান। ২০১০ সালে তিনি পান ‘ক্রস অব অফিসার অব দ্য অর্ডার অব কুইন ইসাবেলা’। ২০১৮ সালে ‘কমান্ডার, স্প্যানিশ অর্ডার অব মেরিট’। কিন্তু এসব নিয়ে তাঁর কোনো গর্ব নেই। তিনি বলেন, ‘পুরস্কার স্বীকৃতিমাত্র। কাজটাই আসল।’

এখন ধানমন্ডির একটি বাসায় তিনি একা থাকেন। নিজেই রান্না করেন, ঘর পরিষ্কার করেন, ধ্যানের মতো করে ছবি আঁকেন। নিঃসঙ্গতা তাঁকে ভয় দেখায় না। তিনি বলেন, ‘আমি শিখে গেছি একা থাকতে।’

মনিরুল ইসলামের শিল্পে নদী আছে—খুব স্পষ্টভাবে। মেঘনা, নরসুন্দা—জল, আলো, শূন্যতা। তাঁর ছবিতে অনেক সময় সাদা রঙের আধিক্য দেখা যায়। কেউ একে মিনিমালিজম বলেন। তিনি বলেন, ‘একটা লাইন কোথায় দেব, একটা ড্রপ কোথায় ফেলব, এটা বুঝতে আমার ৮০ বছর লেগেছে।’

তিনি বিশ্বাস করেন, ছবি কখনো শেষ হয় না। অভ্যাসকে তিনি বলেন ‘একধরনের মৃত্যু’। নতুনত্বের জন্য কখনো নিজের ছবিও ধ্বংস করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘নো ডেস্ট্রাকশন, নো ক্রিয়েশন।’

এখন ধানমন্ডির একটি বাসায় তিনি একা থাকেন। নিজেই রান্না করেন, ঘর পরিষ্কার করেন, ধ্যানের মতো করে ছবি আঁকেন। নিঃসঙ্গতা তাঁকে ভয় দেখায় না। তিনি বলেন, ‘আমি শিখে গেছি একা থাকতে।’

বাংলাদেশকে তিনি ভালোবাসেন, আবার কষ্টও পান। নোংরামি, রুচিহীনতা, আচরণের ভাঙন তাঁকে ব্যথিত করে। তাঁর মতে, এই দেশের সবচেয়ে বড় অভাব ‘এথিকস অ্যান্ড অ্যাস্থেটিকস’।

তবু তিনি আশাবাদী। বিরামহীনভাবে এঁকে চলেছেন। ফলের আশা না করে কাজ করে যাওয়ার এই উদ্যম ৮২ বছরে তিনি কোথায় পান, কে জানে! শিল্প ও শিল্পীর একধরনের রহস্যময়তা তো থাকেই।

  • আনিসুল হক, সাহিত্যিক সাংবাদিক