গণসংহতি নেতা অভিযোগ করেন, এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং দেওয়ার কথা বললেও ঢাকা শহরে দুই-তিন ঘণ্টা আর জেলা-থানা শহর ও গ্রামাঞ্চলে ১৩ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। দেশে ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকট চলছে। সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ। সরকার বলছে, এই সংকটের জন্য নাকি কেবল ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ দায়ী। যুদ্ধের কারণে তেলের দাম, ফার্নেস তেলের দাম বেড়ে যাচ্ছে, খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ডলার নেই। কাজেই রিজার্ভ যেহেতু কমে যাচ্ছে, ফলে এ রকম বেশি দাম দিয়ে আমরা আমদানি আর করতে পারব না। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রাখতে হবে এবং আমাদের লোডশেডিংয়ে যেতে হবে। কয়েকদিন আগে বর্তমান সরকার বিরাট জমকালো আয়োজন করে বলল, তারা নাকি দেশে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছেন। শতভাগ বিদ্যুৎ পৌঁছার সাফল্য! এখন সরকার নিজেই হারিকেন-মোমবাতি-কুপি জ্বালাতে বলছে। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী লোডশেডিং দিতে বললেন। তাঁর ঘোষণার আগেই লোডশেডিং শুরু হলো।

জোনায়েদ সাকি বলেন, ২০১০ সালে এই সরকারের সময়েই পেট্রোবাংলার হাইড্রোকার্বন বিভাগ নরওয়ে ও যুক্তরাষ্ট্রের দুটি কোম্পানির সঙ্গে দেশব্যাপী একটি সমীক্ষা করেছিল। তাতে বলা হয়েছিল, দেশে নিদেনপক্ষে ৩২-৩৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এখনো অনাবিষ্কৃত। অর্থাৎ, বাপেক্সকে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও যন্ত্রপাতি যথাযথভাবে দেওয়া হলে ওই গ্যাস তুলে দিতে পারে। তখন দেশে গ্যাসের চাহিদা ছিল বছরে ১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। তার মানে প্রায় ৩০ বছরের গ্যাসের মজুদ আমাদের স্থলভাগেই আছে। ২০১২ সালে এই সরকার জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে সমুদ্রবিজয় করল। কিন্তু সমুদ্রের ব্লকগুলো থেকেও কোনো গ্যাস তারা তোলেনি। তারা নিজেদের জ্বালানির ওপর নির্ভর করে বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করেননি। করা হলো আমদানিকৃত তেল ও ফার্নেস তেলভিত্তিক কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। এটি করা হয় সরকারের ভাই-বেরাদর, আত্মীয়-স্বজন এবং তাদের ক্ষমতায় রাখা ভারতকে ব্যবসা দিতে। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বসিয়ে বসিয়ে তাদের পকেটে টাকা ঢোকানো হচ্ছে।

বর্তমান সরকারের নীতি দেশকে দেউলিয়া হওয়ার পথে নিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন জোনায়েদ সাকি। তিনি বলেন, নিজের দেশের গ্যাস না তুলে এবং কতগুলো কোম্পানিকে ব্যবসা দেওয়ার জন্য সরকার আমদানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদননীতি গ্রহণ করে যে ভয়াবহ ও অবাধ লুটপাটের আয়োজন করেছে, তার ফলে দেশের মানুষের কষ্টার্জিত টাকা গ্যাস উত্তোলন বা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করা হয়নি। এই লুটপাট ও ভয়াবহ গণবিরোধী নীতির ফলাফলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধপরিস্থিতিতে আমরা আমাদের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের সক্ষমতায় থাকলাম না। তার মানে, পুরো বিদ্যুৎব্যবস্থা একটা ঠুনকো জায়গার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বে একটা চাপ সৃষ্টি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো বিদ্যুৎব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। শুধু বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাই নয়, ভেতর থেকে সব ফাঁপা করে ফেলা হয়েছে। বড় বড় প্রকল্পের নামে লুটপাট করে দেশ থেকে টাকা পাচার করা হয়েছে। তার পরিণতি আজকে দেখা যাচ্ছে। ভবিষ্যতে অবস্থা আরও খারাপ হবে ৷

ভয়াবহ দুর্নীতি-লুটপাটের পরও সরকার ‘গলাবাজি’ করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন গণসংহতি আন্দোলনের এই শীর্ষ নেতা। তিনি বলেন, জনগণকে তোয়াক্কা করে না বলেই এই সরকার এটা পারে। দেশে কোনো ভোট নেই। ভোটব্যবস্থা তুলে দিয়ে দেশে একটা ভয়াবহ স্বৈরতন্ত্র কায়েম করে জনগণের পকেট কেটে তারা নিজেদের ভাই-বেরাদরদের পকেটে টাকা ঢোকাচ্ছে। সেই টাকা বিদেশে পাচার করে তারা নিজেদের ভবিষ্যত গড়ে তুলছে। কাজেই তাদের হাতে আমাদের জীবন ও ভবিষ্যত নিরাপদ নয়। দেশের ভবিষ্যত নিরাপদ করতে হলে সমস্ত লুটপাটের বিচার করতে হবে। এই লুটপাটের বিচার ঠেকাতে যে দায়মুক্তি আইন করা হয়েছে, এটি বাতিল করতে হবে। স্বাধীন জাতীয় কমিশন গঠন করে সব লুটপাট-দুর্নীতির বিচার করতে হবে। তারা এটা করবে না। কারণ বিচার হলে তো নিজেরাই ধরা খাবে। কাজেই আমাদের কর্তব্য হচ্ছে তাদের ক্ষমতা থেকে নামানো।

গণসংহতি আন্দোলনের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার আহ্বায়ক আলিফ দেওয়ানের সভাপতিত্বে ও ছাত্র ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি গোলাম মোস্তফার সঞ্চালনায় সমাবেশে অন্যদের মধ্যে দলের কেন্দ্রীয় নেতা বাচ্চু ভূঁইয়া, মনিরউদ্দিন, ঢাকা জেলার নেতা মনিরুল হুদা, মিজানুর রহমান মোল্লা প্রমুখ বক্তব্য দেন ৷ সমাবেশ শেষে দেশব্যাপী লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে শাহবাগ থেকে হাতিরপুলে গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় পর্যন্ত হারিকেন হাতে মিছিল করেন দলটির নেতা-কর্মীরা।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন