১৩ টাকা সিক্কায় ছয় বছরের মেয়েকে বিক্রি করেছিলেন বাবা
জাতীয় জাদুঘরের তৃতীয় তলায় ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগের ৩৩ নম্বর গ্যালারি। কাচের বাক্সে সাজানো পুরোনো পাণ্ডুলিপি, মুদ্রা আর নানা সময়ের দলিল। এর মধ্যেই পাশাপাশি রাখা দুটি বাংলা দলিল। একটির শিরোনাম ‘মানুষ বিক্রির দলিল’, আরেকটি ‘আত্মবিক্রয় দলিল’।
মানুষ বিক্রির দলিলের বয়স ২১৯ বছর। তাতে লেখা—ছয় বছর বয়সী মেয়েকে ১৩ টাকা সিক্কায় বিক্রি করেছিলেন তার বাবা সদারাম দাস। আত্মবিক্রয় দলিলটি তার ঠিক এক বছর পরের। সেখানে স্ত্রী, দুই সন্তানসহ নিজেকে মাত্র সাড়ে তিন টাকা সিক্কায় অন্যের কাছে বিক্রি করেছিলেন সেখ মামুদা। দুটি দলিলের ক্রেতা একই ব্যক্তি-কৃষ্ণকিঙ্কর বাচস্পতি।
একজন বাবা কেন তাঁর ছয় বছরের মেয়েকে বিক্রি করেছিলেন? একজন মানুষই–বা কেন স্ত্রী, দুই সন্তানসহ নিজেকে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলেন? দলিলের অক্ষরে এ প্রশ্নের পুরো উত্তর নেই।
কিন্তু ইতিহাসের অন্য নথি, গবেষণা ও সেই সময়ের বাংলার জীবনযাত্রার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে আসে—ক্ষুধা, দারিদ্র্য, ঋণ ও বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষ কখনো কখনো নিজের স্বাধীনতাটুকুও বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিল।
দলিল দুটি তাই শুধু মানুষ কেনাবেচার পুরোনো কাগজ নয়। এগুলো বাংলার দরিদ্র মানুষের জীবন, দাসপ্রথা এবং বেঁচে থাকার জন্য মানুষের অসহায় হয়ে পড়ার এক বিরল সাক্ষ্য।
দলিলটির একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত। এ কারণে পুরো লেখা পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে যতটুকু পড়া গেছে, তাতে শুধু মেয়েটিকে বিক্রির কথাই নেই। মেয়েটির ওপর ক্রেতা কৃষ্ণকিঙ্কর বাচস্পতি, তাঁর ছেলে এবং বংশধরদের অধিকার থাকবে—এ কথাও লেখা হয়েছে। এমনকি মেয়েটির ভবিষ্যৎ সন্তানদেরও সেই অধিকারের আওতায় রাখা হয়েছিল।
১৩ টাকা সিক্কায় বিক্রি হয়েছিল ৬ বছরের মেয়ে
১৮০৭ সাল। তৎকালীন ময়মনসিংহ পরগনার হাসানপুর চাকলার বাসিন্দা সদারাম দাস নিজের ৬ বছরের মেয়েকে বিক্রি করেন কৃষ্ণকিঙ্কর বাচস্পতির কাছে। বিনিময়ে পান ১৩ টাকা সিক্কা।
দলিলটির একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত। এ কারণে পুরো লেখা পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে যতটুকু পড়া গেছে, তাতে শুধু মেয়েটিকে বিক্রির কথাই নেই। মেয়েটির ওপর ক্রেতা কৃষ্ণকিঙ্কর বাচস্পতি, তাঁর ছেলে এবং বংশধরদের অধিকার থাকবে—এ কথাও লেখা হয়েছে। এমনকি মেয়েটির ভবিষ্যৎ সন্তানদেরও সেই অধিকারের আওতায় রাখা হয়েছিল।
অর্থাৎ দলিলটি শুধু একজন শিশুকে বিক্রির কাগজ নয়; এটি তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও মালিকানার দাবি প্রতিষ্ঠার নথি। মেয়েটিকে কেন বিক্রি করা হয়েছিল, দলিলে তার স্পষ্ট উল্লেখ নেই।
জাতীয় জাদুঘরের দলিল দুটি পাঠোদ্ধারে সহযোগিতা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও পুরোনো বাংলা দলিলপত্র-পাণ্ডুলিপির গবেষক নাজমুল হোসেন। তাঁর ধারণা, সদারামের এ ঘটনার পেছনে দারিদ্র্য ও ঋণের মতো অর্থনৈতিক কারণ থাকতে পারে।
দলিলে লেখা স্ত্রী-সন্তানসহ নিজের দাম
১৮০৮ সাল। আগের দলিলের ঠিক এক বছর পরের ঘটনা। ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের মরিচালি গ্রামের সেখ মামুদা নিজের সঙ্গে স্ত্রী, দুই সন্তান সেখ দুতিয়া ও সেখ কাঙ্গালিয়াকেও বিক্রি করেছিলেন। ক্রেতা একই ব্যক্তি, কৃষ্ণকিঙ্কর বাচস্পতি। চারজনের বিনিময়ে মামুদা পেয়েছিলেন সাড়ে তিন টাকা সিক্কা।
দলিলে বিক্রির কারণ হিসেবে খাবার ও কাপড়ের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ আছে। অর্থাৎ অভাবের চাপে নিজের স্বাধীনতার পাশাপাশি স্ত্রী, দুই সন্তানকেও অন্যের হাতে তুলে দিতে হয়েছিল সেখ মামুদাকে।
দলিলের ভাষায়, শুধু মামুদা বা তাঁর পরিবারের সদস্যরাই নন, তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মও এই বিক্রির আওতায় ছিল। ক্রেতা কৃষ্ণকিঙ্কর বাচস্পতি চাইলে তাঁদের বিক্রি বা দানও করতে পারতেন।
অভাবের কাছে স্বাধীনতার হার
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত এই দুটি দলিল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাপত্রটির নাম ‘এক্সপ্লোরিং স্লেভারি প্র্যাকটিসেস ইন নাইনটিথ সেঞ্চুরি বেঙ্গল: ইনসাইটস ফ্রম টু আনপাবলিশড হিউম্যান সেল ডিডস অ্যাট দ্য বাংলাদেশ ন্যাশনাল মিউজিয়াম’।
গবেষণায় বলা হয়েছে, সেখ মামুদা দলিলে পরিবারের অন্ন-বস্ত্রের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে এ সিদ্ধান্ত নেন। বিনিময়ে পাওয়া যায় সাড়ে তিন সিক্কা। চুক্তিতে তাঁদের ভবিষ্যৎ বংশধরদেরও এর আওতায় রাখা হয়।
দলিল দুটি তুলট কাগজে বাংলা ভাষায় লেখা। প্রথমটি দলিলটি ১২১৪ বঙ্গাব্দের ৩ শ্রাবণ, অর্থাৎ ১৮০৭ সালের। সময়ের ব্যবধানে প্রথম দলিলের কিছু অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। তাই বিক্রি হওয়া মেয়েটির নাম জানা যায়নি। পরে তার কী হয়েছিল—তা–ও জানা যায়নি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও গবেষক মুহাম্মদ শাহজাহান মিয়া তাঁর ‘পুরোনো বাংলা দলিলপত্র ১৬৩৮-১৮৮২’ বইয়ে বাংলায় মানুষ বিক্রির এমন দলিলের কথা উল্লেখ করেছেন।
শাহজাহান মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, যখনই দেশে দুর্ভিক্ষ, বন্যা বা প্লাবনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিত, তখন গরিব মানুষের কোনো উপায় থাকত না। অনাহার থেকে বাঁচার শেষ চেষ্টা হিসেবে দরিদ্র মানুষ কখনো নিজেকে অথবা স্ত্রী-সন্তানকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দিত। এসব ঐতিহাসিক দলিল তৎকালীন দরিদ্র মানুষের জীবন ও ক্রীতদাস প্রথার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
বাংলায় দাসপ্রথা ও মানুষ কেনাবেচা
দাসপ্রথার ইতিহাস বললে সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে আফ্রিকা থেকে জাহাজে করে মানুষকে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়ার ভয়াবহ ইতিহাস। আবার ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায় হলো ট্রান্স-আটলান্টিক দাস বাণিজ্য। এর মাধ্যমে আফ্রিকা থেকে লাখো মানুষকে জোর করে আমেরিকা ও ইউরোপের উপনিবেশগুলোয় নিয়ে দাস হিসেবে বিক্রি করা হতো।
দাসপ্রথা ও দাস ব্যবসা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চললেও ১৮ শতক থেকে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরালো হয় এবং ধীরে ধীরে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বজুড়ে তা বিলুপ্ত হয়।
তবে দাস কেনাবেচা শুধু আটলান্টিকের ওপারের ঘটনা ছিল না। বাংলায়ও স্থানীয় মানুষকে দাস হিসেবে কেনাবেচার প্রমাণ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ের নথি, পর্যটকদের বিবরণ ও গবেষণায় স্থানীয় মানুষকেও দাস হিসেবে বিক্রির তথ্য উঠে এসেছে।
প্রয়াত অর্থনীতিবিদ আকবর আলি খান তাঁর ‘দারিদ্র্যের অর্থনীতি: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ বইয়ে বাংলার দাসপ্রথা প্রবন্ধে লিখেছেন, কোনো কোনো ঐতিহাসিকের ধারণা ছিল, বাংলায় শুধু বিদেশ থেকে আনা দাসদেরই কেনাবেচা হতো; স্থানীয় মানুষকে দাস হিসেবে বিক্রি করা হতো না।
আকবর আলি খান এ ধারণার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে লিখেছেন, ‘বাংলায় ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক কম দামে দাস বিক্রি হতো।’
১৮০৮ সাল। আগের দলিলের ঠিক এক বছর পরের ঘটনা। ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের মরিচালি গ্রামের সেখ মামুদা নিজের সঙ্গে স্ত্রী ও দুই সন্তান-সেখ দুতিয়া ও সেখ কাঙ্গালিয়াকেও বিক্রি করেছিলেন। ক্রেতা একই ব্যক্তি, কৃষ্ণকিঙ্কর বাচস্পতি। চারজনের বিনিময়ে মামুদা পেয়েছিলেন সাড়ে তিন টাকা সিক্কা।
প্রাচীন আইন, পর্যটকদের বিবরণ ও বিদেশি ব্যবসায়ীদের বিবরণের ভিত্তিতে তিনি বাংলায় স্থানীয় মানুষ কেনাবেচার প্রমাণ তুলে ধরেছেন।
চতুর্দশ শতকে বাংলায় আসা মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতার সফরনামায়ও এর উল্লেখ আছে। তিনি বাংলায় এক স্বর্ণ দিনারে দাসী কেনাবেচা দেখেছেন। নিজেও ‘আশুরা’ নামে এক দাসী কিনেছিলেন। তাঁর এক সঙ্গী ‘লুলু’ নামে এক অল্পবয়সী দাস কিনেছিলেন।
পর্তুগিজ ব্যবসায়ী দুয়ার্তে বারবোসার বিবরণেও বাংলায় স্থানীয় মানুষকে দাস হিসেবে কেনাবেচার তথ্য পাওয়া যায় বলে ‘দারিদ্র্যের অর্থনীতি: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন আকবর আলি খান। বারবোসার বর্ণনা অনুযায়ী, কিছু বণিক বাংলার হিন্দু পরিবারের কাছ থেকে শিশু কিনে পরে তাদের দাস হিসেবে বিক্রি করতেন।
মোগল আমলের নথিতেও দাস কেনাবেচার উল্লেখ আছে। ‘দারিদ্র্যের অর্থনীতি: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ বইয়ে বলা হয়েছে, আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরী’তে ঘোড়াঘাট ও সিলেট সরকারের অধীন এলাকায় খোজা দাসের বেচাকেনার উল্লেখ আছে।
এ ছাড়া সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্মৃতিকথায়ও সিলেটের কিছু পরিবারের সন্তানদের খোজা করে রাজস্বের পরিবর্তে শাসকদের দেওয়ার প্রথার উল্লেখ আছে। পরে তিনি এ প্রথা নিষিদ্ধ করে খোজা কেনাবেচার জন্য কঠোর শাস্তির নির্দেশ দেন।
দলিলে ধরা পড়েছে চার ধরনের মানুষ
১২টি দাস বিক্রির দলিল বিশ্লেষণ করে আকবর আলি খান বলেছেন, এসব দলিলে বিক্রি হওয়া ব্যক্তিরা সবাই বাংলার স্থানীয় বাসিন্দা। তাঁরা বাইরে থেকে আনা মানুষ ছিলেন না।
তাঁর বিশ্লেষণে চার ধরনের মানুষের দাস হিসেবে বিক্রির তথ্য পাওয়া যায়—নিঃস্ব স্বাধীন ব্যক্তি, স্বাধীন ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল শিশু, আগে কেনা দাস এবং দাসদের সন্তান।
অর্থাৎ দাসপ্রথা শুধু যুদ্ধবন্দী বা বিদেশ থেকে ধরে আনা মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। দারিদ্র্য ও নির্ভরশীলতার কারণে স্বাধীন মানুষও এই ব্যবস্থার মধ্যে ঢুকে পড়তেন।
ইতিহাসবিদ ইন্দ্রাণী চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘স্লেভারি অ্যান্ড দ্য হাউসহোল্ড ইন বেঙ্গল, ১৭৭০-১৮৮০’-তে তৎকালীন নথি ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ময়মনসিংহ, ঢাকা ও সিলেট থেকে ছেলে ও মেয়েশিশুদের কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। ইউরোপীয়দের অনেকেই তখন কম দামে এসব শিশু কিনে গৃহস্থালির নানা কাজে নিয়োজিত করতেন।
মানুষ ও আত্মবিক্রির দলিল দুটি কোথা থেকে এল?
জাতীয় জাদুঘরের এই দুটি দলিল সব সময় মানুষের চোখের সামনে ছিল না। এই দুই দলিল ১৯৮০ সালে ময়মনসিংহের গৌরীপুরের দৌহাখোলা গ্রামের সুরেন্দ্র চন্দ্র লস্করের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। এরপর থেকে সেগুলো জাদুঘরের ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগে সংরক্ষিত ও প্রদর্শিত হচ্ছে।
১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাণ্ডুলিপি শাখায় বসে দলিল দুটি পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাজমুল হোসেন।
পাঠোদ্ধারে নাজমুল হোসেন বলেন, দলিল দুটি তুলট কাগজে বাংলা ভাষায় লেখা। প্রথমটি দলিলটি ১২১৪ বঙ্গাব্দের ৩ শ্রাবণ, অর্থাৎ ১৮০৭ সালের। সময়ের ব্যবধানে প্রথম দলিলের কিছু অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। তাই বিক্রি হওয়া মেয়েটির নাম জানা যায়নি। পরে তার কী হয়েছিল—তা–ও জানা যায়নি।
দ্বিতীয় দলিলটি প্রথমটার থেকে কিছুটা স্পষ্ট।
এই দুই দলিল ১৯৮০ সালে ময়মনসিংহের গৌরীপুরের দৌহাখোলা গ্রামের সুরেন্দ্র চন্দ্র লস্করের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। এরপর থেকে সেগুলো জাদুঘরের ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগে সংরক্ষিত ও প্রদর্শিত হচ্ছে।
আরও অনেক দলিল আছে
জাতীয় জাদুঘরের এই দুটি দলিল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ২০২২ সালের ১ ডিসেম্বর প্রথম আলোয় প্রকাশিত ‘২৮ মণ ধানের দামে বিক্রি মা-ছেলে’ প্রতিবেদনে সিলেট সদর সাবরেজিস্ট্রি অফিসের মহাফেজখানা থেকে পাওয়া ১৮০৬ ও ১৮০৭ সালের কয়েকটি দলিলের তথ্য প্রকাশিত হয়।
সেখানে শেখ বিআনিয়া ১০ রুপিতে নিজেকে বিক্রি করেছিলেন। ১৭ বছরের গনাই ভান্ডারির দাম ছিল ২৫ টাকা। ভূবিদাসী ও তাঁর ছেলে সনাইকে বিক্রি করা হয়েছিল ২৮ টাকায়।
কোনো দলিলে ঋণ শোধের কথা ছিল। কোনো দলিলে বলা হয়েছিল, বিক্রি হওয়া ব্যক্তির পরবর্তী প্রজন্মও একই মালিকের অধীনে থাকবে।
আরেকটি ১৭৯০ সালের নথিতে দেখা গেছে, অভাবের কারণে চার বছরের শিশু জমিয়তকে ৫ কাহন কড়িতে বিক্রি করা হয়েছিল।
সিলেটের ভাষাসৈনিক মতিন উদ্দিন আহমদ জাদুঘরেও রয়েছে মানুষ বিক্রির আরেকটি দলিল। ১৮৩৬ সালের সেই নথিতে জকিগঞ্জের ১২ বছরের এক কন্যাশিশুকে ১১ টাকায় বিক্রির তথ্য রয়েছে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাফেজখানায় ১৬৪৯ থেকে ১৭৫৪ সালের মধ্যে বিক্রি হওয়া ১৯ জনের একটি তালিকার উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁদের মধ্যে ১২ জনের ক্ষেত্রে অনাহারকে বিক্রির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও সংরক্ষিত আছে মানুষ বিক্রির একটি দলিল। গাছের বাকলে লেখা সেই দলিলের বয়স প্রায় ৩৮৮ বছর। এর পাঠোদ্ধার করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মুহাম্মদ শাহজাহান মিয়া।
মানুষ বিক্রির দলিল দুটি ছাড়াও জাতীয় জাদুঘরে আছে আরও বেশ কিছু দুর্লভ নিদর্শন। জাতীয় জাদুঘরের জনশিক্ষা বিভাগের কিপার আসমা ফেরদৌসী প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে জাদুঘরে এক লাখের বেশি নিদর্শন সংগৃহীত ও সংরক্ষিত আছে। দর্শকদের জন্য প্রদর্শন করা হচ্ছে মাত্র পাঁচ হাজার নিদর্শন।