গবেষণাটিতে নমুনা কীভাবে সংগ্রহ করা হলো?

মাহবুবুর রহমান: শিশুদের চারপাশের পরিবেশে সিসার উপস্থিতি যাচাই করার জন্য, শিশুরা যে জায়গায় বসবাস করে এবং যেখানে শিশু খেলা করে, সেখানকার মাটি নেওয়া হয়েছে। ঘরের ভেতরে শিশু যেখানে থাকে, সেখানে ঝাড়ু দিয়ে এর ধুলা নেওয়া হয়েছে। রান্নার জন্য বাড়িতে যে হলুদ ব্যবহার করে, সেই হলুদ এবং খাবার পানিও পরীক্ষার উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে। এরপর শিশুর শরীর থেকে দেড় মিলিলিটার রক্ত সিসামুক্ত টিউবের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং নমুনা সংগ্রহের প্রতিটি সামগ্রী সিসা মুক্ত ছিল।  রক্তের নমুনা সংগ্রহের পর, আইসিডিডিআরবির ল্যাবে গ্রাফাইট ফার্নেস অ্যাটোমিক অ্যাবজর্বশন স্পেকট্রোস্কোপি (GFAAS) পদ্ধতিতে শিশুর রক্তের নমুনায় সিসার পরিমাপ করা হয়েছে। এরপর মাত্রার পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

নমুনা বিশ্লেষণ করে কী পেলেন?

মাহবুবুর রহমান: নমুনা বিশ্লেষণ করে গবেষণার আওতাধীন প্রত্যেকটি শিশুর রক্তে সিসার উপস্থিতি পেয়েছি। এখানে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হলো, প্রাথমিক বিশ্লেষণে ৮০ শতাংশ শিশুর রক্তের নমুনায় সিসার পরিমাণ প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি পাওয়া গেছে। যার মধ্যে সবচেয়ে কম পাওয়া গেছে, তার রক্তেও সিসার উপস্থিতির হার প্রতি ডেসিলিটারে ২ দশমকি ৯ মাইক্রোগ্রাম।

প্রথম আলো: কোন কোন দ্রব্যে সিসা ছিল বলে আপনারা দেখেছেন? মানে কোন কোন উৎস থেকে শিশুর শরীরে সিসার অনুপ্রেবশ ঘটছে?

মাহবুবুর রহমান: আপনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছেন। আবার এটার উত্তরটাও খুব জটিল। কেননা ধরা যাক কোনো শিশুর রক্তে হয়তো সিসা পেলাম ৭ মাইক্রোগ্রাম/ডেসিলিটার। আমি হয়তো তার বাড়ি থেকে পাওয়া মাটিতে সিসা পেলাম। আবার যে খেলনা দিয়ে সে খেলে, সেখানেও হয়তো সিসা আছে। সেখানে এটা বোঝা মুশকিল যে ঠিক কোন উৎস থেকে শিশুটির শরীরে সিসা এসেছে। এটা বুঝতে গেলে একটি পরীক্ষার প্রয়োজন হয়, এর নাম হলো আইসোটোপিক টেস্ট। ১০ বছর ধরে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সিসা–বিষয়ক গবেষণার কাজ করছি। আরও উন্নত গবেষণার জন্য সেখানে এসব নমুনা পাঠানো হচ্ছে। সেসব উন্নত গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে আমরা বলতে পারব কোন উৎস থেকে শিশুরা কী হারে আক্রান্ত হচ্ছে। তবে সম্ভাব্য যেসব উৎসের কথা বলতে পারি, তার মধ্যে আছে লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলার অনিয়ন্ত্রিত কার্যকলাপ, ইলেকট্রনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, সিসাযুক্ত রং, সিসার ভেজালযুক্ত খাবার হলুদ, অ্যালুমিনিয়ামের তৈজসপত্র, তাবিজ, প্লাস্টিকে ব্যবহৃত রং, ধাতব জুয়েলারি, প্রসাধনসামগ্রী ইত্যাদি। উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে এ রকম আইসোটোপিক টেস্টের মাধ্যমে আমরা গর্ভবতী মায়েদের রক্তে সিসার উপস্থিতির কারণ হিসেবে রান্নায় ব্যবহার করা হলুদের গুঁড়ায় সিসার উপস্থিতি ও পরিমাণ শনাক্ত করি। এই গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে হলুদ প্রক্রিয়াজাতকরণে সিসার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং আইসিডিডিআরবি একযোগে কাজ করেছে। ফলে হলুদে সিসার ভেজাল নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে।

সিসার কি কোনো সহনীয় মাত্রা রয়েছে—এ ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) কোনো মানদণ্ড আছে কি না।

মাহবুবুর রহমান: সিসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সিসার যেকোনো মাত্রাই শিশুর জন্য ক্ষতি করতে পারে।

শিশুর শরীরে সিসার উপস্থিতি তার জন্য কী কী ক্ষতি বয়ে আনতে পারে?

মাহবুবুর রহমান: সিসা শিশুর মানসিক ও বুদ্ধির বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে। তাদের আচরণগত সমস্যা হতে পারে। সিসার মাত্রা বেশি থাকলে শিশুর মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। সাতটি গবেষণার সম্মিলিত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেসব শিশুর শরীরে সিসার মাত্রা বেশি, তাদের বুদ্ধিমত্তা অন্যদের তুলনায় কম। সিসার উপস্থিতি শিশুদের পড়াশোনার আগ্রহ, উদ্ভাবনী শক্তি এবং অন্য কাজে আগ্রহ কমিয়ে দিয়ে থাকে। এ ছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে, সিসা হৃদ্‌রোগজনিত অসুস্থতা (যেমন উচ্চ রক্তচাপ), হরমোনজনিত সমস্যা তৈরি করাসহ গর্ভবকালীন মা ও শিশুর ক্ষতি করতে পারে। গর্ভবতী মায়ের শরীরে সিসার উপস্থিতি থাকলে তাঁর অনাগত শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সিসার কারণে শিশুর বুদ্ধিমত্তার বিকাশের অপরিবর্তনীয় ক্ষতি হয়। এর অর্থ হলো যেসব শিশুর সিসার কারণে বুদ্ধি বিকাশ ব্যাহত হয়েছে, পরবর্তী সময়ে তাদের মধ্যে সিসার সংক্রমণ যদি কমিয়েও দেওয়া হয়, তাহলেও তাদের বুদ্ধির বিকাশের কোনো উন্নতি হবে না।

সিসা শরীরে প্রবেশ করলে তা থেকে মুক্ত হওয়ার উপায় কী? এর নিয়ন্ত্রণে কী কী উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে?

মাহবুবুর রহমান: মানুষের শরীরে সিসা প্রবেশ করলে তা সহজে অবমুক্ত হয় না। সাধারণত সিসা মানুষের হাড়ে এবং দাঁতে সংরক্ষিত থাকে এবং এটি এসব জায়গায় বছরের পর বছর থেকে যেতে পারে।   ২০২১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সিসার বিষক্রিয়া নিরাময়ে একটি ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন। এই গাইডলাইনে কিছু ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট এবং কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, যেমন পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিনযুক্ত খাবার খাওয়া। বাংলাদেশেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই ক্লিনিক্যাল গাইডলাইনটি অ্যাডাপটেশনের কাজ চলছে। এখন সুরক্ষা ও প্রতিকারের দিকে আসি। সঠিক সুরক্ষা হলো সিসার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশ এখন যে অবস্থানে আছে, সেখানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের সিসা সমস্যা এবং শিশুর ক্ষেত্রে এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে বিতর্কের আর কোনো সুযোগ নেই। আর এ জন্য জাতীয় পর্যায়ের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রচার চালানো উচিত। সিসা পরিস্থিতি যে কত ভয়ানক, এই কথাটি সংশ্লিষ্ট সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে। তবে আশার কথা, সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে সিসার ক্ষতিকর দিক নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে এবং কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। তবে তা হয়তোবা অপ্রতুল। আমাদের অবশ্যই সাধারণ মানুষকে এই বিষয়টি নিয়ে সঠিক তথ্য দিতে হবে।

সরকারি উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে কী হতে পারে?

মাহবুবুর রহমান: সিসা পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হতে গেলে ধারাবাহিক নজরদারি দরকার। সিসা পরীক্ষার ক্ষেত্র বাড়ানো দরকার। সারা দেশে হয়তো ল্যাব তৈরি করা সম্ভব না, কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত পরীক্ষার সুযোগ থাকা দরকার। আর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এর বাস্তবায়ন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইতিমধ্যে সরকার সব ধরনের রঙে ও জ্বালানি তেলে সিসার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগ ও নজরদারির মাধ্যমে সিসার অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। এর কোনো ব্যত্যয় নেই। বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে, স্বাস্থ্যকর্মীসহ সব উন্নয়নকর্মী এবং সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাঠকর্মীদের সিসাবিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। দেশের সব জনগণকে সিসার উৎস, ক্ষতিকর প্রভাব, সিসা সংক্রমণের প্রতিকার এবং প্রতিরোধের ব্যাপারে সচেতন করতে দেশব্যাপী প্রচারণার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া সিসাদূষণের সমগ্র দেশের চিত্র তুলে ধরতে জাতীয় পর্যায়ে সিসার সার্ভিলেন্স এবং উৎস নিরূপণ করার সুযোগ রয়েছে।