হামে কেন এত শিশুমৃত্যু
হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এক দিনে দেশে সর্বোচ্চ ১৭ জনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র। এ নিয়ে এই বছর হামে মৃত্যু ৩০০ ছাড়াল। হামে মৃত্যু কমানো যেত কি না, স্বাস্থ্য বিভাগ মৃত্যু ঠেকাতে সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (রোববার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) নিশ্চিত হামে দুজনের এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ১৫ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে। ১৫ জনের মধ্যে ২ জনের মৃত্যু হয়েছিল আগের দিন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, এ পর্যন্ত হামের উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ২৫৯ জনের; আর হামে মৃত্যু ৫২ জনের। মোট মৃত্যু ৩১১ জনের।
গত ১২ এপ্রিল নাইট্যাগের সভায় বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছিলেন যে হামের প্রাদুর্ভাবের সময় হামের উপসর্গ নিয়ে যেকোনো রোগীর মৃত্যুকে হামের মৃত্যু বলে বিবেচনা করতে হবে। ৩১১ জনের মৃত্যু হামে হয়েছে।
এ বছর জানুয়ারিতে কক্সবাজার জেলার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে প্রথম হাম শনাক্ত হয়। এ নিয়ে খুব জানাজানি হয়নি। তবে হাম ছড়াতে থাকে। মার্চ মাসের মাঝামাঝি প্রথমে রাজশাহী এবং পরে আরও কয়েকটি জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়ার খবর গণমাধ্যমে আসে। ২৪ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রোগের প্রাদুর্ভাববিষয়ক এক খবরে বাংলাদেশে হাম ছড়িয়ে পড়ার কথা জানায়। ওই খবরে বলা হয়, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় (৯১ শতাংশ জেলা) হাম ছড়িয়ে পড়েছে। সংস্থাটি আরও বলে যে আক্রান্তদের ৭৯ শতাংশের বয়স ৫ বছরের নিচে।
সরকার ৫ এপ্রিল ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় বিশেষ টিকা কার্যক্রম শুরু করে। ১২ এপ্রিল ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশনে টিকা দেওয়া শুরু হয়। এরপর ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে টিকা দেওয়া হচ্ছে। ৬ মাস বয়স থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের এই টিকা দেওয়া চলবে এ মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত।
৩ মে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮ মাস বয়সী হাসানের মৃত্যু হয়। হাসানের বাড়ি লালমনিরহাট সদরের সাপ্টিবাড়ী। লালমনিরহাটে হামের উন্নত চিকিৎসা না থাকায় শিশুটিকে রংপুরে আনা হয়েছিল। এর আগের দিন অর্থাৎ ২ মে বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলার কুরুকপাতা ইউনিয়নে হামের উপসর্গ নিয়ে তাংতুই ম্রো নামে ৮ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। তাংতুই ম্রো পাশের লামা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিল। মৃত্যুর দুই দিন আগে ওই হাসপাতাল থেকে তাকে ছুটি দেওয়া হয়েছিল। এভাবে প্রতিদিন হামে বা হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেই চলেছে।
শিশুমৃত্যু থামছে না
শিশুমৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার আইসিইউ সেবা বাড়িয়ে দেওয়ার পদক্ষেপের কথা বলছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে ভেন্টিলেটর নিয়ে হাসপাতালে দিয়েছেন, এমন খবরও গণমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু হামে মৃত্যুসংশ্লিষ্ট তথ্য সরকার প্রকাশ করছে না। এর মধ্যে আছে—মৃত শিশুদের বয়স বিভাজন, হাম হওয়ার কত দিন পর হাসপাতালে এসেছে, কোন শিশু কোন ধরনের জটিলতা নিয়ে ভর্তি ছিল, মৃত শিশুদের সবার নিউমোনিয়া ছিল কি না, নিউমোনিয়ার সঙ্গে আর কী কী ব্যাধি ছিল, হাসপাতালে আসতে কত শিশুর বিলম্ব হয়েছে, হাসপাতালে ব্যবস্থাপনায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না, কোন কোন ওষুধ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব প্রশ্নের উত্তর শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে ভূমিকা রাখত বলে জনস্বাস্থ্যবিদেরা মনে করেন।
এ ব্যাপারে গতকাল যোগাযোগ করা হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান প্রথম আলোকে বলেন, এসব কাজ করার কথা অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি)। তিনি রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দেন।
হামের চিকিৎসায় কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। হামের কারণে নিউমোনিয়া হলে তা জটিল হয়। হাম হলে আরও অনেক জটিলতা দেখা দেয়। হাসপাতালে শিশুদের আনা হচ্ছে অনেক জটিলতা হওয়ার পর। লাইফ সাপোর্ট দিয়েও তাদের বাঁচানো যাচ্ছে না।বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. মাহবুবুল হক
সিডিসির পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, সিডিসি এ ধরনের কোনো কাজ করছে না।
মৃত্যু কেন থামানো যাচ্ছে না, প্রথম আলোর পক্ষ থেকে এই প্রশ্ন একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের কাছে করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. মাহবুবুল হক প্রথম আলোকে বলেন, হামের চিকিৎসায় কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। হামের কারণে নিউমোনিয়া হলে তা জটিল হয়। হাম হলে আরও অনেক জটিলতা দেখা দেয়। হাসপাতালে শিশুদের আনা হচ্ছে অনেক জটিলতা হওয়ার পর। লাইফ সাপোর্ট দিয়েও তাদের বাঁচানো যাচ্ছে না।
শিশু হাসপাতালের তথ্য বলছে, সারা দেশের ৪২টি জেলার ৫১০টি শিশু এই হাসপাতালে জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যান্ত চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ২২ জন।
শিশুমৃত্যু কেন থামানো যাচ্ছে না, এমন প্রশ্নের উত্তরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ফোয়ারা তাসনিম প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালে শিশুদের আনা হচ্ছে বিলম্বে, জটিল অবস্থায়। হামজনিত নিউমোনিয়ায় ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিছু শিশুকে হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দিয়েও সুস্থ করে তোলা সম্ভব হচ্ছে না।
এখন শিশুদের জ্বর, সর্দি, কাশি হলে বা শরীরে র্যাশ উঠলে অনেক মা–বাবা ধারণা করেন, হাম হয়েছে অথবা হামের ভয়ে থাকেন। সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র বলছে, এ বছর ৪১ হাজার ৭৯৩ জন রোগী হামের চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে এসেছে। এদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৮ হাজার ৮৪২ জন। কিন্তু হাম শনাক্ত হয়েছে ৫ হাজার ৪৬৭ জনের।
কিন্তু বাস্তবে হামে আক্রান্ত হয়েছে আরও অনেক বেশি। প্রথমত, কিট সমস্যার কারণে উপসর্গ থাকা সব মানুষের নমুনা পরীক্ষা করতে পারছে না স্বাস্থ্য বিভাগ। অন্যদিকে কিছু কিছু চিকিৎসক তাঁদের ব্যক্তিগত চেম্বারে হামের চিকিৎসা দিচ্ছেন, যা সরকারি তথ্যে যুক্ত হচ্ছে না।
হাসপাতালে শিশুদের আনা হচ্ছে বিলম্বে, জটিল অবস্থায়। হামজনিত নিউমোনিয়ায় ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিছু শিশুকে হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দিয়েও সুস্থ করে তোলা সম্ভব হচ্ছে না।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ফোয়ারা তাসনিম
কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন, হামজনিত নিউমোনিয়ায় ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব ক্ষেত্রে অক্সিজেন ওষুধের কাজ করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সারা দেশের সরকারি হাসপাতালে ১ হাজার ৩৭২টি আইসিইউ শয্যা আছে। সব শয্যা শিশুদের ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত না। ভেন্টিলেটর বা আইসিইউর প্রয়োজন আছে ঠিকই। কিন্তু স্বল্পমূল্যে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করা গেলে বেশিসংখ্যক শিশু উপকৃত হতো।
শিশুস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, কোভিড–১৯ মহামারির সময় হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহ উন্নত করা হয়েছিল। রোগীদের উচ্চমাত্রায় অক্সিজেন দেওয়ার জন্য হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এখনো তা করা গেলে কিছু শিশুর মৃত্যু হয়তো ঠেকানো যেত।
এ ক্ষেত্রে ছয়টি লক্ষণ দেখা দিলে শিশুকে হাসপাতালে আনতে হবে—১. রোগীর শ্বাসকষ্ট হলে বা শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হলে, বুকের খাঁচা দেবে গেলে; ২. তরল খাবার বা বুকের দুধ খেতে না পারলে; ৩. বারবার বমি হলে; ৪. খিঁচুনি, নিস্তেজ, তন্দ্রাচ্ছন্ন বা ডাকে সাড়া না দিলে; ৫. মুখে ঘা, চোখে সমস্যা, চোখ খুলতে না পারলে এবং ৬. তীব্র পানিশূন্যতা বা অপুষ্টিতে ভুগলে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও শিশুরোগবিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব রোগীর হাসপাতালে আসার বা আনার দরকার নেই। অনেকে ভয় পেয়ে শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে আসছেন, ভর্তি করাচ্ছেন। এতে অনেক ক্ষেত্রে হামের প্রকৃত রোগী হয়তো ভর্তি হতে পারছে না। সরকারি পরিসংখ্যানও তা–ই বলছে।
এ ক্ষেত্রে ছয়টি লক্ষণ দেখা দিলে শিশুকে হাসপাতালে আনতে হবে—১. রোগীর শ্বাসকষ্ট হলে বা শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হলে, বুকের খাঁচা দেবে গেলে; ২. তরল খাবার বা বুকের দুধ খেতে না পারলে; ৩. বারবার বমি হলে; ৪. খিঁচুনি, নিস্তেজ, তন্দ্রাচ্ছন্ন বা ডাকে সাড়া না দিলে; ৫. মুখে ঘা, চোখে সমস্যা, চোখ খুলতে না পারলে এবং ৬. তীব্র পানিশূন্যতা বা অপুষ্টিতে ভুগলে।
বিশিষ্ট রোগতত্ত্ববিদ এবং সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, রোগী ব্যবস্থাপনার উন্নতি এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মোতাবেক রোগী আইসোলেশন করলে হাসপাতালে রোগী কমবে। কম রোগী মনোযোগ বেশি পাবে। এতে মৃত্যু কমবে।
