ভিডিও মুন্সীগঞ্জের, দাবি করা হচ্ছে সীমান্তে গুপ্তচর আটকের

পুশ ইন নিয়ে সীমান্তের কয়েকটি স্থানে উত্তেজনা চলার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, বিজিবির হাতে ধরা পড়েছেন ভারতীয় এক গুপ্তচর। তবে যাচাই করে দেখা গেছে, এই ভিডিও সীমান্তেরও নয়, এখনকারও নয়। এটি গত সংসদ নির্বাচনের দিন মুন্সিগঞ্জে বিজিবি সদস্যদের হাতে এক বাংলাদেশি আটকের ঘটনার।

সম্প্রতি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কয়েকটি সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা চালাচ্ছে। তাঁদের দাবি, এবার বাংলাদেশের নাগরিক, অবৈধভাবে ভারতে অবস্থান করছিলেন। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি পুশ ইনের এই চেষ্টা প্রতিরোধ করে যাচ্ছে। তা নিয়ে বিভিন্ন সীমান্তে উত্তেজনা চলছে কয়েক দিন ধরে।

এর মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে ভিডিওটি, যেখানে দাবি করা হচ্ছে, ‘সীমান্তে মাইন পাতার জন্য বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী বিএসএফের এক গুপ্তচরকে আটক করেছে বিজিবি।’

ভিডিওতে দেখা যায়, আলু চাষের জমিতে কয়েকজনকে ধাওয়া করে আটক করেছেন সেনাসদস্যরা। ভিডিওর ক্যাপশনে বিজিবি সদস্য বলা হলেও সেখানে বিজিবির পোশাকের কাউকে দেখা যাচ্ছে না। যাঁদের দেখা যাচ্ছে, তাঁরা রয়েছেন সেনাবাহিনীর পোশাকে।

ভিডিওটি ফেসবুকে শতাধিক পেজ ও প্রোফাইল থেকে পোস্ট ও শেয়ার করা হয়েছে।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক, পঞ্চম লিংক

কোলাজ: প্রথম আলো গ্রাফিকস

৪ লাখ ৭১ হাজার অনুসারীর পেজ ‘দ্য স্টুডেন্ট জার্নাল’–এ ৩২ সেকেন্ডের ভিডিওটি গত ৭ জুন রাতে পোস্ট করা হয়। তাদের পোস্টে ভিডিওটি আজ সোমবার দুপুর পর্যন্ত ৬৫ লাখ বার দেখা হয়। পোস্টে প্রতিক্রিয়া পড়ে ৩ লাখ ১০ হাজারের বেশি, মন্তব্য জমা হয় ৬ হাজার ২০০টি। তাদের পোস্টটি শেয়ার হয় ২১ হাজারের বেশি বার।

মূলত ‘দ্য স্টুডেন্ট জার্নাল’–এর পেজের ভিডিওটি অন্যরা বেশি শেয়ার করছেন। ভিডিওটির সত্যতা জানতে এই পেজের দেওয়া মুঠোফোন নম্বরে কল করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠালে পেজটির পরিচালকদের কেউ প্রথমে সাড়া দেননি। তবে তারপর ভিডিওটি আর পেজটিতে পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর পেজটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, অসাবধানতাবশত ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়েছিল। এটি এখন সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

তবে ‘দ্য স্টুডেন্ট জার্নাল’ থেকে নেওয়া ভিডিও অনেকে পোস্ট করায় এটি এখনো নানা পেজ ও প্রোফাইলে রয়েছে।

এদিকে এক্স প্ল্যাটফর্মে ‘এশিয়াডিকোডেড’ নামের একটি পেজে একই দৃশ্যের ২ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের ভিডিও ক্লিপ পোস্ট করে দাবি করা হয়, ভারতের বিএসএফের এক ‘গুপ্তচর’ মাইন পুঁতে রাখতে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করলে বিজিবি সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে ধরেন।

এক্সে এই ভিডিও দেখা হয় ১৮ হাজারের বেশি বার। গতকাল আরও এক্স অ্যাকাউন্টে এমন ভিডিও পোস্ট করা হয়।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক

ভিডিওটির সত্যতা যাচাইয়ে কি-ফ্রেম রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে বেসরকারি একাধিক টেলিভিশনের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজে তা পাওয়া যায়। তবে সেগুলো এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির। একটি ভিডিওর শিরোনাম ছিল—‘মুন্সীগঞ্জে কেন্দ্রের বাইরে ককটেল বিস্ফোরণ; পাকড়াও করলো সেনাবাহিনী’।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক

প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করলে সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন পাওয়া যায়। তা থেকে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাকান্দির এলাকার একটি কেন্দ্রে ককটেল বিস্ফোরণের পর সেনাবাহিনীর অভিযানে অস্ত্র ও তাজা ককটেল উদ্ধার করা হয়। এ সময় আটক করা হয় পাঁচজনকে।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মাকহাটি গুরুচরণ উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের অদূরে একাধিক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। একদল দুর্বৃত্ত পাশের আলুখেত থেকে এসে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আবার ওই খেতে আশ্রয় নিচ্ছিল। নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা সেনাসদস্যরা তখন অভিযান চালিয়ে আলুখেত থেকে পাঁচজনকে আটক করে।

মুন্সিগঞ্জ সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সজীব দে প্রথম আলোর জেলা প্রতিনিধিকে জানান, ভিডিওতে যাকে দেখা যাচ্ছে, তার নাম শিপন মল্লিক (৩০)। তিনি সদর উপজেলার মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের পূর্ব মাকাহাটি গ্রামের জামাল মল্লিকের ছেলে।

এ থেকে প্রমাণিত হয়, যে ভিডিও ছড়িয়ে সীমান্তে মাইন পাতার সময় ভারতীয় গুপ্তচর আটকের দাবি করা হচ্ছে, তার ভিত্তি নেই।