শাপলা ও নীলার দিনগুলো

প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: [email protected]

অলকরণ: মাসুক হেলাল

শাপলাকে পড়া শেখাতে গিয়ে আমরা বাড়ির সবাই প্রায় হাঁপিয়ে উঠলাম। লেখা তো দূরের কথা, আজ ‘অ আ’ শেখালে পরদিন শুধু ‘অ’ মনে রাখে। সুতরাং ‘ই’-তে যাওয়ার কোনো সুযোগই নেই। ক, খ; এক, দুই; এ, বি, সি, ডি—সবকিছুতেই একই অবস্থা। ৮-৯ বছর বয়সী একটা মেয়ের স্মৃতিশক্তি এতটাও খারাপ হওয়ার কথা নয়। এ ছাড়া শাপলা খুব চটপটে মেয়ে। পদ্মার ওপারের চরে বাড়ি। হিসাবমতো, এসব টুকটাক অক্ষর শেখা শাপলার জন্য বাঁ হাতের খেল। অথচ শাপলাকে পড়াতে বসালে আমাদের কপালের ঘাম ছুটে যেত। তাতে অবশ্য ওর রেহাই ছিল না। রোজ সন্ধ্যায় আমাদের সঙ্গে শাপলাকেও পড়তে বসতে হতো।

শাপলা যখন প্রথমবার আমাদের বাড়ি এল, তখন শীতকাল। গায়ে চাদর পেঁচিয়ে গলার কাছে বেঁধে রাখা। রোদে পোড়া মুখটা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, মাঠে থাকে নিয়মিত। হাসলে সামনের বড় বড় সাদা দাঁত দুটি চোখে লাগে ভীষণ। মাঠের কাজ থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্যই সম্ভবত শাপলার নানি এসেছিলেন কোথাও কাজের জন্য রেখে যেতে। সব বুঝেশুনে মা শাপলাকে রেখে দিলেন আমার সদ্য হাঁটা শেখা ছোট ভাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছুটে বেড়ানোর জন্য। আমার ভাই ‘ল’ উচ্চারণ করতে পারত না তখনো, বলত ‘র’। ব্যাস, শাপলার নাম হয়ে গেল ‘শাপরা’।

শাপলা আমার চেয়ে এক-দুই বছরের ছোট ছিল। সারা দিন পাখির মতো উড়ে বেড়াত। তরতর করে অনায়াসে যেকোনো গাছে উঠে যাওয়া, ডুবসাঁতার দিয়ে পুকুরের এপার থেকে ওপারে গিয়ে ওঠা—সবই সহজ ছিল শাপলার কাছে। অন্য রকম প্রাণশক্তি ছিল মেয়েটার ভেতরে। তবে শাপলাকে আমি সঙ্গী হিসেবে কাছে টানতে পারিনি কোনো দিন। আমাদের মধ্যে অদৃশ্য একটা দূরত্ব রয়েই গিয়েছিল।

আমার তখন বারবার মনে পড়ত নীলার কথা। নীলা ছিল আমার ভীষণ আপন। একসময় মাকে বাড়ির কাজে সাহায্য করতে আসত এক খালা। তাঁরই মেয়ে ছিল নীলা। আমার সমবয়সী। সে শাপলার মতো ছিল না মোটেও।

নীলা বোকা বোকা সব কাণ্ড ঘটাত। একবার ইংরেজির স্যার ‘মাইসেলফ’ প্যারাগ্রাফ লিখতে দিলেন। নীলা আমার খাতা দেখে লিখে জমা দিল। পরে দেখা গেল, আমার মতো নীলাও লিখেছে, ‘মাই নেম ইজ তথাপি।’ এ ঘটনার জেরে কয়েক দিন বেশ হাসাহাসি হলো। নীলার তাতে কিছু আসে–যায়নি অবশ্য।

তবে নীলা আমার শৈশবের অনেকখানি জুড়ে বহুদিন একাই রাজত্ব করেছে। যেনতেন নয়, একদম শক্তভাবে। একসঙ্গে পড়া, খেলা, গল্প করা—আমার সব ভালো লাগায়, ভালোবাসায় ছিল সে। অবশ্য আমার সেই রঙিন প্রজাপতির মতো সময় স্থায়ী হয়নি বেশি দিন। আমার শৈশব শূন্য করে দিয়ে নীলারা চলে গিয়েছিল।

কয়েক বছর আগে হঠাৎ একবার দেখা হয়েছিল নীলার সঙ্গে। টুকটুকে বেগুনি রঙের একটা শাড়ি ছিল পরনে। মাথায় ঘোমটাটা টেনে দেওয়া। পুরোদস্তুর সংসারী যাকে বলে। আমি নীলার সঙ্গে নিঃসংকোচ হয়ে কথা বলতে পারিনি সেদিন। ওই মুহূর্তে পৃথিবীর সব জড়তা এসে আমার ওপর ভর করল। শৈশবের স্মৃতিগুলো মাথার ভেতরে গরম পানির মতো টগবগ করে ফুটছে। কথার ঝাঁপি খুলতে গিয়েও আটকে গেল। যদি এমন হয়, আমার মতো করে ওর তেমন কিছুই মনে নেই? ওর কাছে হয়তো ওই ধূসর হয়ে যাওয়া কাহিনিগুলোর কোনো অর্থ নেই এখন। সংসারের হাজারটা কাজের মধ্যে নীলার কাছে শৈশব এসে লুকোচুরি খেলার সুযোগ পায় না নিশ্চয়। আমি অপ্রস্তুত বোধ করতে লাগলাম ভীষণ। গলার কাছে সব কথা এসে আটকে গেল। নীলাকে শেষ পর্যন্ত কিছুই বলা হলো না আমার।

শাপলা ছিল নীলার বিপরীত স্বভাবের। একবার তো ভয়ংকর এক কাণ্ড ঘটাল। ছাদের রেলিংয়ে বসে দুষ্টুমি করে ঢিল ছুড়ে দিল। সরাসরি চোখে এসে লাগল আমার। অগত্যা হাসপাতালে গিয়ে এক চোখে ব্যান্ডেজ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হলো।

তবে এসব ইঁদুর-বিড়াল খেলা বেশি দিন আর চলল না। শাপলার নানি মিথ্যা বলে শাপলাকে নিয়ে চলে গেলেন। পরে খোঁজ পাওয়া গেল, শাপলার বিয়ে হয়ে গেছে।

শাপলা চলে যাওয়ার কিছুদিন পর ওর পড়াশোনার রহস্য জানতে পেরে বাড়ির সবাই থ বনে গেলাম। আর আমার ভীষণ অভিমান হলো নিজের প্রতি। শাপলা ছিল প্রজাপতির মতো, যাকে পাখির মতো পোষ মানানো যায় না। সত্যিই তো, নীলার মতো করে শাপলার সঙ্গে কোনো অলস দুপুরে গল্পের ঝাঁপি খুলে বসিনি আমি। তাই শাপলাও হয়তো আমাকে আপন ভাবতে পারেনি। বলতেও পারেনি চুপিচুপি মনের কথাগুলো আমায়।

অথচ চলে যাওয়ার কয়েক দিন আগে শাপলা পুকুরঘাটে সবার কাছে গল্প করেছে, ‘আমার পড়তে ভালো লাগে না। তাই ইচ্ছা করেই পড়া ভুলে যাওয়ার ভান করি, যাতে ওরা আমাকে বেশি দূর পড়া শেখাতে না পারে।’