আনন্দের ঈদের ছুটিতেও কেন এত হানাহানি
ঈদের মতো উৎসবের ছুটিতেও হানাহানির ঘটনার কোনো কমতি নেই। তুচ্ছ সব ঘটনায় বাধছে সংঘর্ষ। তাতে নিহতের ঘটনাও ঘটছে। সমাজ গবেষকেরা বলছেন, দিনে দিনে মানুষের ধৈর্য কমে যাচ্ছে, স্বার্থপর ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। তাই উৎসবের ছুটিতেও তারা মারামারি-হানাহানিতে জড়াচ্ছে।
অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবালের কাছ থেকে ঘটনাটি শোনা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। গত ঈদুল ফিতরের ছুটিতে কিশোরগঞ্জে তাঁর গ্রামের বাড়িতে গাছের কলা কাটা নিয়ে হুলুস্থুল কাণ্ড হয়। দুটি পক্ষে ভাগ হয়ে মারামারিতে জড়িয়ে যায় প্রায় গোটা গ্রাম। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপে সেই প্রসঙ্গ তুলে তিনি হতাশ কণ্ঠে বলেন, ‘নিজের গ্রামে এমন তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মারামারির ঘটনায় লজ্জা লাগছিল। মানুষ এত অসহিষ্ণু হয়ে গেছে!’
অধ্যাপক ফাতেমার গ্রামের ওই ঘটনা কোনো সংবাদমাধ্যমে খবর হয়ে ওঠেনি। তবে পাঠকের নিশ্চয় এমন অনেক তুচ্ছ ঘটনায় হানাহানি-মারামারি, এমনকি খুনের খবর পাঠের অভিজ্ঞতা রয়েছে। চোখে পড়েছে উৎসবের ছুটিতেও এমন হানাহানির ঘটনার খবর।
গত ঈদুল ফিতর ও এবারের ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটির মধ্যে এমন ৩৭টি খবর পড়লাম। বিচিত্র সব কারণে হাতাহাতি, দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মারামারি-খুনোখুনি। খবরগুলো পড়ে মনে হলো, একে অপরের প্রতি বিদ্বেষের বিষ ছুটির সময়ে যেন দ্বিগুণ হারে উগড়ে দিচ্ছে!
প্রশ্ন জাগে, ছুটির সময় ‘নাড়ির টানে’ নাকি ‘লড়াইয়ের টানে’ বাড়ি ফেরেন কেউ কেউ, যাতে মারামারিতে প্রয়োজনে নিজ পক্ষে লোকের পাল্লা ভারী করা যায়! কোনো কোনো ঘটনায় রাজনৈতিক পক্ষও জড়িত থাকায় ধারণা করা যায়, ঈদের সময় তাঁদের জনবল বেড়ে শক্তি বৃদ্ধি ঘটেছে, যা প্রতিপক্ষের সঙ্গে মারামারিতে নিজেদের মনোবল বাড়িয়ে তুলেছে!
ঈদুল ফিতরের ১৮টি জেলায় মারামারি-হানাহানির ২৮টি ঘটনার খবর আসে সংবাদমাধ্যমে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়—৭টি। সব কটিই নাসিরনগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। শরীয়তপুরে ৩টি, ফরিদপুর ও কিশোরগঞ্জে ২টি করে ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ময়মনসিংহ, রাজশাহী, সিলেট, বাগেরহাট, বরিশাল, দিনাজপুর, নাটোর, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, মাগুরা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নড়াইল ও চুয়াডাঙ্গায় ঘটে একটি করে ঘটনা।
তবে সামগ্রিকভাবে এই প্রবণতা ভয়াবহ অসহনশীল, বিভেদ ও বিদ্বেষপূর্ণ সমাজ তৈরিকে যে স্থায়ী রূপ দিচ্ছে, তা উদ্বেগজনক নিঃসন্দেহে।
দুই মাসের বেশি সময়ের মধ্যে দুটো ঈদের ছুটিতে হানাহানির যেসব সংবাদ পড়েছিলাম, তার থেকে কিছু ঘটনা উল্লেখ করলে বিচিত্র কারণগুলো আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়বে পাঠকের কাছে।
একটা খবর থেকে জানলাম, সকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। বৈরী আবহাওয়ায় ঈদের নামাজ মসজিদে হবে, নাকি ঈদগাহে হবে? তা নিয়ে মতবিরোধ শুরু হয় দুই পক্ষের। এরপর কী হলো, তা আপনি অনুমান করতে পারবেন, যদি এ ধরনের খবর পড়ার পূর্বাভিজ্ঞতা থাকে। দুই ভাগে বিভক্ত গ্রামবাসী ঈদের নামাজ বাদ দিয়ে মারামারিতে জড়িয়ে পড়লেন। কাঠ আর বাঁশের লাঠি দিয়ে হামলে পড়লেন একে অন্যের ওপর। আহত হলেন ১৩ জন, এর মধ্যে কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো। মারামারির জেরে কিছু বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাটও হলো। এ ঘটনা ঘটেছিল ২১ মার্চ ঈদুল ফিতরের দিন সকালে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চর এলঙ্গী আচার্য গ্রামে।
নিজের গ্রামে এমন তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মারামারির ঘটনায় লজ্জা লাগছিল। মানুষ এত অসহিষ্ণু হয়ে গেছে! মাঝেমধ্যে এমন মারামারি হয় যে পরে মামলার ভয়ে গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে যায়।
ঘটনার পাত্রপাত্রী, স্থান-কাল, কারণ বদলে গেলেও ঈদুল আজহার ছুটির সময়ে প্রায় কাছাকাছি রকমের ঘটনা ঘটেছে। ২৮ মে ঈদের দিন সকালে কোরবানির পশুর মাংস মসজিদে ভাগ হবে, নাকি যার যার বাসায় ভাগ হবে— এ নিয়ে দ্বন্দ্বে দুই পক্ষের সংঘর্ষ বাধে। তাতে কমপক্ষে ৩০ জন আহত হন, ভাঙচুর হয় ৪-৫টি ঘর। এ ঘটনা ঘটেছে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার আলগী ইউনিয়নের পূর্ব আড়ুয়াকান্দী গ্রামের ঈদগাহ মাঠে।
সংঘাতের কত যে কারণ!
শবে কদর ও নির্বাহী আদেশে ছুটি ও ঈদুল ফিতরের ছুটি মিলিয়ে ১৭ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত ১১ দিনে অন্তত ২৮টি খবর পড়া হয়েছে মারামারি-হানাহানি নিয়ে। এসব সংঘাতে ৯ জন নিহত হন, আহত হন কমপক্ষে ২৫১ জন। এসব হানাহানির জেরে অন্তত ৩০টি বাড়িতে ভাঙচুর, হামলা, লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সংঘাতের আগুনে পোড়ে একটি নৌকা, ১০-১২টি মোটরসাইকেল। কয়েক ঘণ্টা অবরোধ হয়েছিল সড়ক।
ঈদুল আজহার ছুটিতে ৯টি সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে সংবাদমাধ্যমে। এর মধ্যে দুটি ঘটনা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার, আর একটি করে ঘটনা ঘটেছে হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, নোয়াখালী, শরীয়তপুর, কক্সবাজার ও রাজবাড়ীতে।
কারণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাংস বিক্রি, মাংস কাটা, ঈদের নামাজের স্থান নির্ধারণ, চোখে টর্চের আলো ফেলা, জ্বালানি তেলের ‘সিরিয়াল ভাঙা’, দাওয়াত দেওয়ার কথা বলে ডেকে নিয়ে মারধর, মোটরসাইকেল বিক্রি নিয়ে বিরোধ, ক্রিকেট খেলা নিয়ে, অফিসে দেরিতে আসা নিয়ে কথা-কাটাকাটি, পাওনা টাকা না দেওয়া, ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণ, গাড়িকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া (ওভারটেক), রাজনৈতিক আধিপত্য, পূর্বশত্রুতা ইত্যাদি কারণে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এসব সংঘর্ষে দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি ছররা গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে।
মারামারি-হানাহানির ২৮টি ঘটনা ঘটেছে ১৮টি জেলায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়—৭টি। সব কটিই নাসিরনগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। শরীয়তপুরে ৩টি, ফরিদপুর ও কিশোরগঞ্জে ২টি করে ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ময়মনসিংহ, রাজশাহী, সিলেট, বাগেরহাট, বরিশাল, দিনাজপুর, নাটোর, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, মাগুরা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নড়াইল ও চুয়াডাঙ্গায় ঘটে একটি করে ঘটনা।
মানুষের সহনশীলতা কমে গেছে। একটা ঘটনা ঘটলে স্থির হতে যে নিজেকে সময় দেওয়া লাগে, সেই ধৈর্য নেই। অল্পতেই মানুষ ক্ষুব্ধ ও হতাশ হচ্ছে। পাশাপাশি চারপাশে নানা অস্থিরতা চলমান থাকায় রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে মানুষের অতৃপ্তি রয়েছে। মানুষ ভেতরে রাগ–ক্ষোভ পুষে রাখছে এবং কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ফেলছে।
তবে এসব শুধু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনা। এর বাইরে ওই ১১ দিনে তুচ্ছ কারণে অসংখ্য মারামারির ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে।
ঈদুল আজহার ছুটি ছিল ২৫ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৭ দিন। এই সাত দিনে ৯টি সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে সংবাদমাধ্যমে। এর মধ্যে দুটি ঘটনা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার, আর একটি করে ঘটনা ঘটেছে হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, নোয়াখালী, শরীয়তপুর, কক্সবাজার ও রাজবাড়ীতে।
কোরবানির পশুর মাংস ভাগাভাগির স্থান নির্ধারণ, মাদক কেনাবেচা, পূর্বশত্রুতা, দোকান নির্মাণ, বৈদ্যুতিক তার চুরি, জমি নিয়ে বিরোধ, ফুচকার অর্ডার কে আগে দিয়েছে—এসব কারণে এসব সংঘর্ষ হয়েছে। এতে ২ কিশোর নিহত হয়, আহত হন দুই পুলিশ সদস্যসহ কমপক্ষে ১২৮ জন। ২৫টির মতো ঘর, ৫০টির মতো দোকান ভাঙচুর হয় এসব সংঘর্ষে। কোনো কোনো দোকান লুটপাটও হয়।
ঈদুল ফিতরের সময়ে টর্চ জ্বালিয়ে রাতে সংঘর্ষের সংবাদ নজরে এসেছিল। ঈদুল আজহায়ও এমন দুটো খবর পাওয়া গেছে। শরীয়তপুরে সংঘাতের সময় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে এবারও।
বেশ কিছু ঘটনায় দেখা গেছে, জমিজমা ও সম্পত্তি নিয়ে পূর্ববিরোধ রয়েছে। সেটা ঈদের ছুটিতে কোনো এক অজুহাতে বড় সংঘাতে রূপ নিয়েছে। জমিজমা ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের মাত্রা অনুমান করা যায় মামলার হার থেকেও।
ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলায় বিচারাধীন মামলার ৭৫ থেকে ৭৭ শতাংশই জমিজমা ও সম্পত্তি নিয়ে। এসব বিরোধ থেকেও উৎসবের ছুটিতেও তাৎক্ষণিক তুচ্ছ কারণে মারামারি-হানাহানির কোনো কোনো ঘটনা ঘটতে পারে। পরিবার ও স্বজনের ক্ষেত্রে অনেকে ন্যায়–অন্যায় বিবেচনা না করে প্রতিপক্ষের ওপর একযোগে হামলে পড়ে। শুধু জমিজমা ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার বহু ঘটনা ঘটছে।
এ বিষয়ে বেসরকারি সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা প্রথম আলোকে বলেন, ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলায় বিচারাধীন মামলার ৭৫ থেকে ৭৭ শতাংশই জমিজমা ও সম্পত্তি নিয়ে। এসব বিরোধ থেকেও উৎসবের ছুটিতেও তাৎক্ষণিক তুচ্ছ কারণে মারামারি-হানাহানির কোনো কোনো ঘটনা ঘটতে পারে। পরিবার ও স্বজনের ক্ষেত্রে অনেকে ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা না করে প্রতিপক্ষের ওপর একযোগে হামলে পড়ে। শুধু জমিজমা ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার বহু ঘটনা ঘটছে।
কেন এত মারামারি-হানাহানি
জ্বালানি তেলের চলমান সংকটের সময় সিরিয়াল নিয়েও হয়েছিল হুলুস্থুল কাণ্ড। যেমন ঈদুল ফিতরের ছুটি চলাকালীন ২৩ মার্চ রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার একটি ফিলিং স্টেশনে আগে জ্বালানি তেল নেওয়াকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনায় দুজন আহত হন। জ্বালানি তেলের সংকটের মধ্যে রাতে ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি হয়েছিল। কয়েকজন সারি ভেঙে তেল নেওয়ার চেষ্টা করলে প্রথমে কথা-কাটাকাটি ও পরে হাতাহাতি শুরু হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ।
এখন পরিবার ও স্কুল থেকে নৈতিক শিক্ষার চেয়ে ভালো ফল করার ওপর জোর দেওয়া দেয়। শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবতে শেখায়। এভাবে স্বার্থপরতার বিষবৃক্ষ পোক্ত হচ্ছে। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন মানুষ অর্থনৈতিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে মানুষ অসহনশীল হয়ে উঠছে, এসব হানাহানির ঘটনা সেটাই জানান দেয়।
সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এমন সব হানাহানির কারণ বিশ্লেষণ করে অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, দিনে দিনে মানুষের ধৈর্য কমে যাচ্ছে। মানুষ স্বার্থপর ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। অন্যের মতামতকে সম্মান দিচ্ছে না। নিজের ছাড়া অন্যের সুবিধা-অসুবিধা ভাবতে চায় না। নিজের সমস্যা ছাড়া অন্যের দুঃখের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেও না। এ ধরনের প্রবণতার কারণে উৎসবের ছুটিতেও আনন্দ করার পরিবর্তে তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে মানুষ মারামারি-হানাহানি ও সংঘাতে জড়াচ্ছে।
ঈদের দীর্ঘ ছুটি শেষেও দুই-তিন দিন ছুটির আমেজ থাকে। ফাঁকা থাকে পথ-ঘাট। কেউ কেউ বাড়তি ছুটি নেন। এবার ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষের এক দিন পর ২৫ মার্চ সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার তোয়াকুল ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ে দরজা লাগিয়ে মারামারির ঘটনা ঘটে। সেদিন অফিস সহায়ক আয়াত উদ্দিনের দেরিতে আসার কারণ জানতে চেয়েছিলেন উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন। এ নিয়ে দুজনের বাগ্বিতণ্ডা হাতাহাতিতে গড়িয়েছিল, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, মানুষের সহনশীলতা কমে গেছে। একটা ঘটনা ঘটলে স্থির হতে যে নিজেকে সময় দেওয়া লাগে, সেই ধৈর্য নেই। অল্পতেই মানুষ ক্ষুব্ধ ও হতাশ হচ্ছে। পাশাপাশি চারপাশে নানা অস্থিরতা চলমান থাকায় রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে মানুষের অতৃপ্তি রয়েছে। মানুষ ভেতরে রাগ–ক্ষোভ পুষে রাখছে এবং কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ফেলছে।
সমাজ থেকে সহনশীলতা ক্রমে হারিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে নৈতিক শিক্ষার অভাবকে দায়ী করে নিজের কৈশোরের একটি ঘটনা এই প্রতিবেদককে বলেন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা।
শামসুল হুদার ভাষ্যে, ‘কিশোর বয়সে প্রতিবেশী বসন্ত কাকার সঙ্গে একবার রেগে কথা বলেছিলাম। বসন্ত কাকা কিছু মনে না করলেও তাঁর পাশে থাকা আরেকজন আমার কথা বলার ভঙ্গি পছন্দ করেননি। তিনি সেটা আমার শিক্ষক বাবাকে বলে দেন। রাতে বাবা বাড়ি এসে রাগারাগি করেছিলেন এবং পরদিন বসন্ত কাকার সঙ্গে দেখা করে মাফ চাইতে বলেছিলেন।’
শামসুল হুদা বলেন, এখন পরিবার ও স্কুল থেকে নৈতিক শিক্ষার চেয়ে ভালো ফল করার ওপর জোর দেওয়া দেয়। শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবতে শেখায়। এভাবে স্বার্থপরতার বিষবৃক্ষ পোক্ত হচ্ছে। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন মানুষ অর্থনৈতিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে মানুষ অসহনশীল হয়ে উঠছে, এসব হানাহানির ঘটনা সেটাই জানান দেয়।
সহনশীলতার চর্চা বাড়ানোয় জোর
ঈদুল আজহার দিন সন্ধ্যায় চুলায় রান্না হচ্ছিল গরুর মাংস। ক্ষুধার্ত ছেলে বারবার মাকে বলছিল, ‘তাড়াতাড়ি রুটি দাও, মাংস দাও।’ কিন্তু মায়ের হাতের সেই রান্না আর খাওয়া হয়নি কিশোর মো. ইব্রাহিমের (১৫)। বাড়ির পাশে সংঘর্ষের কথা শুনে সে দেখতে বেরিয়েছিল। সেখানে কয়েক যুবকের মারধরের শিকার হয় ইব্রাহিম। কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের হারিয়াখালী এলাকায়। পূর্বশত্রুতার জেরে দুই পক্ষের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়েছিল।
অন্যের প্রতি বিদ্বেষ অনুভব ও একপর্যায়ে হিংস্র হয়ে ওঠার মানসিকতা এক দিনে গড়ে ওঠে না। তাই এমন মানসিকতা প্রতিরোধে শিশু অবস্থা থেকে সহনশীলতার চর্চা শুরুর প্রয়োজনীয়তার কথা বললেন অধ্যাপক কামাল চৌধুরী। তিনি বলেন, সহনশীলতা বাড়ানোর চর্চা করা দরকার। পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য কিছু বিষয় চর্চা করা দরকার এবং এগুলো স্কুল থেকে শুরু করা দরকার। যেমন শিক্ষার্থীদের মেডিটেশন করানো, খেলাধুলায় যুক্ত করা। এ ধরনের কার্যকলাপের মাধ্যমে বঞ্চনাকে মেনে নিয়ে ইতিবাচকভাবে সামনে কীভাবে এগোনো যায়, সে দক্ষতা গড়ে ওঠে।
অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবালের মতে, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে হবে। ছোট ছোট কিছু কাজের মাধ্যমে এ বন্ধন দৃঢ় হবে। পরিবার থেকে শিশুদের জিনিসপত্র, খাবার, খেলনা ভাগাভাগি করা শেখাতে হবে। পারিবারিক কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। যেমন বাড়িতে অতিথি এলে নাশতা পৌঁছে দেওয়া, খাবার টেবিলে মা–বাবা দিকে খাবারের বাটি এগিয়ে দেওয়া ইত্যাদি। এভাবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে একটি শিশু অন্যকে মর্যাদা দেওয়া শিখবে, অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ থেকে দূরে থাকবে।
মহাত্মা গান্ধীর একটি লাইন দিয়ে লেখাটা শেষ করি। তিনি বলেছিলেন, ‘ক্রোধ ও অসহিষ্ণুতা সঠিক উপলব্ধির যমজ শত্রু’ (‘দ্য টিচিং অব মহাত্মা গান্ধী’, ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত বই)। কারণ, রাগ-ক্ষোভে আমাদের বিচার–বুদ্ধি, বিবেচনা লোপ পায়। অসহিষ্ণুতা আমাদের অন্যের বক্তব্য শোনা ও অন্যের মতকে শ্রদ্ধা জানানোর প্রতি বাধা দেয়। তাই সঠিক বোঝাপড়া নিয়ে এগিয়ে সমাজে নিজের অবস্থানকে অর্থবহ করতে এই ‘যমজ শত্রু’ থেকে দূরে থাকতে হবে।