রুলার ও কম্পাস দিয়ে কোণ ত্রিখণ্ডন

প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

জ্যামিতির একটা প্রাচীন ও বিখ্যাত ধাঁধা নিয়ে আজ আলাপ করা যাক। কেবল একটি রুলার (যা দিয়ে শুধু সোজা দাগ টানা যায়, কোনো পরিমাপের দাগ কাটা থাকে না) ও একটি কম্পাস ব্যবহার করে কি যেকোনো কোণকে সমান তিন ভাগে ভাগ করা সম্ভব?

হাজার বছর ধরে চেষ্টা করেও কেউ রুলার আর কম্পাস দিয়ে যেকোনো কোণকে ত্রিখণ্ডিত করতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে ঊনবিংশ শতাব্দীতে বীজগণিতের হাত ধরে প্রমাণিত হয় যে, না এটি আসলেই অসম্ভব!

কিন্তু জ্যামিতির এই ব্যর্থতার পেছনে লুকিয়ে আছে দুর্দান্ত এক বীজগণিতীয় রহস্য।

রুলার আর কম্পাসের জ্যামিতিক সীমানাটা আগে একটু বুঝে নেওয়া যাক। আমরা যখনই রুলার দিয়ে দুটি সরলরেখা টানি কিংবা কম্পাস দিয়ে বৃত্ত এঁকে তাদের ছেদবিন্দু বের করি, বীজগণিতের ভাষায় আমরা আসলে সরলরৈখিক সমীকরণ (Linear Equation) বা বড়জোর দ্বিঘাত সমীকরণ (Quadratic Equation) সমাধান করি। এর মানে হলো, রুলার ও কম্পাস দিয়ে কেবল যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ ও বর্গমূল করার মাধ্যমে পাওয়া দৈর্ঘ্য বা বিন্দুই তৈরি করা সম্ভব। একে আমরা বলি ‘কনস্ট্রাক্টিবল নাম্বার’ (Constructible Number)।

বর্গমূল কেন? কোনো সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজ যদি হয় (x+1) আর একটি ভূমি যদি হয় (x-1), তবে লম্ব হচ্ছে √((x+1)²-(x-1)²)=2√x, একে দুই ভাগ করলেই আমরা √x পেয়ে যাচ্ছি। আর বর্গমূলের ওপর আবার বর্গমূল চাপিয়ে চতুর্থ মূল, অষ্টম মূল বা যেকোনো 2ⁿ তম মূল আমরা বের করতে পারব, যেখানে n∈ℕ={0,1,2,3,....}। কিন্তু 2ⁿ=3 এর জন্য n∉ℕ, এমনকি n∉ℚ। তাই আমাদের এই জ্যামিতিক টুল বক্স দিয়ে কখনো কোনো ঘনমূল বা ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধান করা সম্ভব নয়।

তাহলে কোণ ত্রিখণ্ডনের সঙ্গে ত্রিঘাত সমীকরণের সম্পর্কটা কোথায়? সম্পর্কটা লুকিয়ে আছে ত্রিকোণমিতির ভেতরে।

ধরা যাক, আমাদের কাছে একটি কোণ θ দেওয়া আছে। একে ত্রিখণ্ডিত করা মানে হলো θ/3 কোণটি জ্যামিতিকভাবে তৈরি করা।

স্থানাঙ্ক জ্যামিতির ভাষায়, যদি আমাদের cosθ এর মান জানা থাকে, তবে আমাদের খুঁজে বের করতে হবে cos(θ/3) এর মান।

এখন আমরা জানি,

cosθ=4cos³(θ/3)-3cos(θ/3)

সহজ করার জন্য, আমরা যদি ধরে নিই x=cos(θ/3) এবং আমাদের চেনা কোণের মান a=cosθ, তাহলে ওপরের সূত্রটি চমৎকার একটি বহুপদী সমীকরণের রূপ নেয়:

4x³-3x-a=0

এই সমীকরণে x এর সর্বোচ্চ ঘাত লক্ষ করে দেখুন, এটাই আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত ত্রিঘাত সমীকরণ! Euler এর বিখ্যাত সূত্র eⁱˣ=cos(x)+i.sin(x) থেকে সহজেই এটি প্রমাণ করা যায়! আমরা যখন একটি কোণকে তিন গুণ করি, তখন আসলে কমপ্লেক্স প্লেনে একটি সংখ্যাকে পরপর তিনবার গুণ করা হয়। আর সেই কিউবিক বিস্তৃতির বাস্তব অংশ (Real part) থেকেই জন্ম নেয় ত্রিঘাতের পদটি।এখন একটি বাস্তব উদাহরণ দেখা যাক। ধরুন, আমাদের একটি 60° কোণ দেওয়া আছে। আমরা একে সমান তিন ভাগে ভাগ করে 20° কোণ বানাতে চাই। আমরা জানি, cos60°=½, কাজেই আমাদের সমীকরণটি দাঁড়াবে: 4x³-3x-½=0.

এই সমীকরণ মূলদ সংখ্যার (Rational numbers) ওপর সম্পূর্ণ ‘অভেদ্য’ বা Irreducible। একে কোনোভাবেই সরলরৈখিক বা দ্বিঘাত সমীকরণে ভেঙে ফেলা যায় না। এর সমাধান করতে গেলে আমাদের অপরিহার্যভাবে ঘনমূল বা কিউব রুটের আশ্রয় নিতেই হবে। কিন্তু আমাদের কম্পাস তো কেবল বর্গমূল করতে জানে! যেহেতু ৩ কোনোভাবেই ২–এর ঘাত নয়, তাই রুলার আর কম্পাসের জ্যামিতিক পরিধি কোনো দিনই এই ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান ছুঁতে পারবে না। আর ঠিক এ কারণেই সাধারণ নিয়মে 60° কোণকে ত্রিখণ্ডিত করা অসম্ভব।তবে মজার ব্যাপার হলো, কিছু কিছু কোণের ক্ষেত্রে কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটে! যেমন ধরুন 90° ডিগ্রি কোণের জন্য cos90°=0 হওয়ায় সমীকরণটি দাঁড়ায় 4x³ - 3x = 0 বা x(4x²-3) =0অর্থাৎ ত্রিঘাত সমীকরণটি ভেঙে একটি সরলরৈখিক (x=0) এবংএকটি দ্বিঘাত সমীকরণে (4x²-3=0) রূপান্তরিত হয়ে যায়! এ জন্যই রুলার-কম্পাস দিয়ে 90° কোণকে ত্রিখণ্ডিত করে 30° বানানো কোনো ব্যাপারই নয়।তবে কি কোনোভাবেই কোণকে ত্রিখণ্ডন করা সম্ভব নয়? আমরা দাগহীন স্কেল, কম্পাস ও সমতল ধরে নিয়েছিলাম। আমাদের এই স্বীকার্যগুলোর পরিবর্তন করলে কেমন হয়? গ্রিক গণিতবিদ আর্কিমিডিস দেখিয়েছিলেন যে স্কেলে মাত্র দুটি দাগ কেটে ‘নিউসিস অঙ্কন’ পদ্ধতিতে ঘনমূল বের করা সম্ভব। একইভাবে জাপানি অরিগ্যামি শিল্পের জ্যামিতিক নিয়ম (Huzita–Hatori axioms) ব্যবহার করে কাগজ ভাঁজ করে নিখুঁতভাবে ঘনমূল বের করা এবং যেকোনো ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধান করা সম্ভব!গুরু আর্কিমিডিসের পদ্ধতির মাধ্যমেই নাহয় আজকের আলোচনার ইতি টানা যাক।প্রথমে প্রদত্ত কোণ ∠AOD = θ এর শীর্ষ বিন্দু O-কে কেন্দ্র করে যেকোনো ব্যাসার্ধ r নিয়ে একটি বৃত্তচাপ আঁকি। ধরা যাক, এই বৃত্তচাপ কোণের দুটি বাহুকে যথাক্রমে A ও D বিন্দুতে ছেদ করে। কোণের নিচের বাহু OD-কে বিপরীত দিকে (বাঁয়ে) সোজা বর্ধিত করি। এবার আমাদের সেই স্কেল নিই, যার দুটি দাগের মধ্যকার দূরত্ব ঠিক আমাদের নেওয়া বৃত্তচাপের ব্যাসার্ধ r-এর সমান।

স্কেলটিকে এমনভাবে স্থাপন করি যেন:

∎ স্কেলের ধার A বিন্দুর ওপর থাকে।

∎ স্কেলের প্রথম দাগটি বৃত্তের পরিধির ওপর (ধরা যাক C বিন্দুতে) বসে।

∎ স্কেলের দ্বিতীয় দাগটি বর্ধিত রেখা OD-এর ওপর (ধরা যাক E বিন্দুতে) গিয়ে স্পর্শ করে।

এ অবস্থায় AE রেখাটি টানলে রেখাটির বাঁ প্রান্তে উৎপন্ন কোণ ∠AED হবে মূল কোণ θ-এর ঠিক এক-তৃতীয়াংশ বা θ/3। অর্থাৎ আমাদের কোণ ত্রিখণ্ডন সম্পন্ন হলো! এটি কীভাবে সম্ভব? নিউসিস পদ্ধতিতে স্কেলটিকে যখন একই সঙ্গে ঘোরানো এবং স্লাইড করা হয়, তখন জ্যামিতিতে একটি বিশেষ উচ্চ ঘাতের বক্ররেখা তৈরি হয়, যাকে বলা হয় কনকয়েড অব নিকোমিডিস। এই বক্ররেখাটিই আমাদের সেই অবাধ্য ত্রিঘাত সমীকরণটিকে যান্ত্রিকভাবে সমাধান করে ফেলে!জ্যামিতির সীমাবদ্ধতা যেখানে শেষ হয়, বীজগণিতের অনন্ত আকাশঠিক সেখান থেকেই শুরু! আজ এ পর্যন্তই। প্রমাণ নাহয় পাঠকের জন্য জমা থাকল।