চিকিৎসায় অবহেলার আইনি প্রতিকার কী

প্রতীকী ছবি

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার একটি হাসপাতালে নবজাতকের মৃত্যুর পর প্রসূতি মাহমুবা রহমানও মারা যান। অভিযোগ রয়েছে ভুল চিকিৎসা, দায়িত্বে অবহেলা ও কর্তৃপক্ষের প্রতারণার কারণে এমনটা ঘটেছে। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে মামলা হয়েছে এবং দুজন চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারেও পাঠানো হয়েছে। এর আগে তাঁরা ভুল চিকিৎসা ও প্রতারণার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এর আগেও বিভিন্ন সময় কোনো কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসা বা চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের ঘটনার প্রতিকারে আমাদের দেশে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট আইন কার্যকর নেই।

চিকিৎসায় অবহেলা কী

ভুল চিকিৎসা কিংবা চিকিৎসায় অবহেলায় রোগীর মৃত্যু বা অপূরণীয় ক্ষতিসাধনের অভিযোগ বাংলাদেশে নতুন নয়। এরকম অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রায়ই চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের বাদানুবাদ, ভাঙচুর এমনকী মারামারির খবর পাওয়া যায়। চিকিৎসায় অবহেলা বলতে শুধু চিকিৎসকের অবহেলা নয় বরং চিকিৎসাসেবা–সংক্রান্ত আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা যেমন নার্স, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন ও সরবরাহকারীদের অবহেলাও বোঝানো হয়। চিকিৎসায় অবহেলার দায়ে কাউকে অভিযুক্ত করতে চাইলে প্রথমত, প্রমাণ করতে হবে যে রোগী এবং চিকিৎসাসেবা প্রদানকারীর মধ্যে এমন একটি চুক্তি হয়েছিল, যার মাধ্যমে রোগীর প্রতি যথাযথ মনোযোগ দেওয়া ও যত্ন নেওয়ার একটি আইনি দায়িত্ব চিকিৎসক বা চিকিৎসাসেবা প্রদানকারীর ছিল। দ্বিতীয়ত, সেই দায়িত্ব পালনে চিকিৎসক বা চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী অবহেলা করে বা ব্যর্থ হয়েছে। তৃতীয়ত, দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা ব্যর্থতার কারণে ওই রোগী ক্ষতির শিকার বা মৃত্যুবরণ করেছে।

চিকিৎসায় অবহেলার আইনগত কী প্রতিকার রয়েছে

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবার উন্নয়ন সাধনকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার অধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আইনি কাঠামো এবং বাংলাদেশের আদালতের বিভিন্ন বিচারিক সিদ্ধান্তে এটি বর্তমানে সুপ্রতিষ্ঠিত যে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার অধিকার মূলত জীবনের অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভুল চিকিৎসা বা চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং আইনগত প্রতিকারের জন্য এখনো বাংলাদেশে নির্দিষ্ট ও একক কোনো আইন কার্যকর নেই। তবে বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত আইনে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে আইনি প্রতিকারের সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে বর্ণিত মৌলিক চাহিদার মধ্যে ‘স্বাস্থ্য’ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ১৮ অনুচ্ছেদে জনগণের পুষ্টিমান এবং ‘গণ-স্বাস্থ্য’ সুরক্ষার কথা সন্নিবেশিত হয়েছে। অনুচ্ছেদ ৩২-এ বর্ণিত ‘জীবন রক্ষার অধিকার’ একটি সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত এবং আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য। চিকিৎসায় অবহেলা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যর্থতা এই জীবন রক্ষার মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করে। তাই চিকিৎসায় অবহেলা হলে সর্বোচ্চ আদালতে রিট বা জনস্বার্থে মামলা করার সুযোগ আছে।

১৮৬০ সালে প্রণীত দণ্ডবিধি বাংলাদেশের প্রধান ফৌজদারি আইন। দণ্ডবিধির ৩০৪ (ক) ধারানুযায়ী কোনো ব্যক্তি যদি বেপরোয়া বা অবহেলামূলক কাজের মাধ্যমে কারও মৃত্যু ঘটায়, তাহলে সেটি ৫ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। দণ্ডবিধির ৩১২ থেকে ৩১৪ ধারায় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া গর্ভপাত ঘটানো একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দণ্ডবিধির ২৭৪, ২৭৫ ও ২৭৬ ধারায় যথাক্রমে ওষুধ বা চিকিৎসা সরঞ্জামে ভেজাল মেশানো, ভেজাল ওষুধ বা চিকিৎসা সরঞ্জাম বিক্রি এবং এক ওষুধ বা চিকিৎসা সরঞ্জাম অন্য নামে বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য। এসব অপরাধ দমন ও আইনি প্রতিকার প্রদানের উদ্দেশ্যে ২০০৯ সালের ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনের মাধ্যমে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয় এবং শাস্তি ও জরিমানার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে একই দণ্ডবিধির ৯২ ধারানুসারে সরল বিশ্বাসে কোনো ব্যক্তির উপকার করার উদ্দেশ্যে চিকিৎসক চিকিৎসাসেবা প্রদান করলে এবং এর ফলে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না।

প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার প্রতি ডাক্তারদের অতি আগ্রহ এবং যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মতো প্রাইভেট ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরি গজিয়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৮২ সালে প্রণীত হয় মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স। তবে এই আইনের উদ্দেশ্য খুব সামান্যই পূরণ হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী লাইসেন্সবিহীন প্রাইভেট ক্লিনিক স্থাপন অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। লাইসেন্স পাওয়ার শর্তের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সুব্যবস্থা, জীবন রক্ষাকারী ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং অস্ত্রোপচার ও ডাক্তারি পরীক্ষা–নিরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ব্যবস্থা করা। এই আইনের আওতায় চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থেকে শুরু করে ক্লিনিক, ল্যাব, হাসপাতাল প্রভৃতির লাইসেন্স প্রদান করা, মান নিয়ন্ত্রণ করা, পরিদর্শন করা এবং অনিয়ম দেখা দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্ব। এমনকি এই আইনের অধীনে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক প্রভৃতির অব্যবস্থাপনার জন্য আদালতে মামলা করার ক্ষমতা একমাত্র স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাতে।

প্রতীকী ছবি

১৯০৮ সালের দেওয়ানি কার্যবিধির ১৯ ধারা অনুসারে কারও অবহেলাজনিত কাজের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি স্থানীয় দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণ চেয়ে দেওয়ানি মামলা করতে পারেন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুসারে কোনো রোগী ফির বিনিময়ে ডাক্তার, হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সেবা গ্রহণ করলে তিনি ‘ভোক্তা’ হিসেবে গণ্য হবেন এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত অবহেলার শিকার হলে ভোক্তা অধিকার আইনে ক্ষতিপূরণ চেয়ে অভিযোগ করতে পারবেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার যদি রোগনির্ণয়ে ভুল বা অবহেলা করে, ফলে রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিংবা যদি সেবা প্রদানে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করে, তাহলে ভোক্তা অধিকার আইনে মামলা করা যাবে। এই আইন অনুসারে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযোগকারী আদায়কৃত জরিমানার ২৫ শতাংশ অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রাপ্য হবেন।

চিকিৎসক এবং চিকিৎসাসেবার মান নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে প্রণীত মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০ অনুসারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল বা বিএমডিসি। কোনো চিকিৎসকের বা স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের অবহেলার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকায় অবস্থিত বিএমডিসিতে অভিযোগ করা যায়। মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০–এর ধারা-২৩ অনুসারে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত চিকিৎসকের নিবন্ধন বাতিল করার ক্ষমতা বিএমডিসির রয়েছে। উল্লিখিত আইনগুলো ছাড়াও আরও কিছু আইনে চিকিৎসা ও ওষুধসংক্রান্ত অপরাধের প্রতিকারের বিধান আছে যেমন ড্রাগস অ্যাক্ট, ফার্মাসি অর্ডিন্যান্স, ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক প্র্যাকটিশনার্স অর্ডিন্যান্স, মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন আইন ইত্যাদি।

স্বাস্থ্যসেবাগ্রহীতাদের প্রতি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব অবহেলা এবং চিকিৎসকদের সুরক্ষা উভয় বিষয়ের আইনি প্রতিকার বিধানের উদ্দেশ্যে ২০১৮ সালে স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন নামে একটি আইনের খসড়া চূড়ান্ত হয়েছিল। সর্বশেষ এটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল যা এখনো কার্যকর হয়নি। আইনটির মাধ্যমে ১৯৮২ সালের মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স আইনটি রহিত ও প্রতিস্থাপিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই খসড়া আইনের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পেশাগত দায়িত্ব পালনে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবহেলা করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তিকে হুমকি প্রদান, ভীতি প্রদর্শন, দায়িত্ব পালনে বাধাদানসহ যেকোনো ধরনের অনিষ্ট সাধন বা স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তির ক্ষতিসাধন করলে সেটিও দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচ্য হবে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই আইনের খসড়া ২০১৪ সাল থেকে শুরু হলেও চিকিৎসক সমাজ এই আইনের বিষয়ে বিভিন্ন আপত্তি উত্থাপন করে আসছেন এবং এটি আজও চূড়ান্ত আইন হিসেবে কার্যকর করা যায়নি। চিকিৎসায় অবহেলা প্রতিরোধ এবং রোগী ও চিকিৎসক উভয়ের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আইনটি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

সাঈদ আহসান খালিদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক