বিমানের সাবেক এমডির বাসায় নির্যাতনের শিকার শিশুটি এখন কেমন আছে
কেমন আছো জানতে চাইলে ১১ বছর বয়সী মেয়েশিশুটি বলে, ‘একটু ভালো আছি। খালি মাথা ব্যথা করে। শরীরের ঘা একটু শুকাইছে।’
মেয়েটি জানাল, সে বাসার ‘ম্যাডামের’ সব কথা শুনত, তারপরও ম্যাডাম শুধু রাগ দেখাতেন। বাথরুমে নিয়ে আটকে রাখতেন। যখন গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দিতেন, তখন তাকে বাসার অন্য কেউ বাঁচাতে আসত না। কান্নাকাটি করলে মুখ চেপে ধরতেন।
গৃহকর্মীর ছেলেমেয়েকে দেখার পাশাপাশি বাসার বড় দুই গৃহকর্মীর ছুটি থাকলে ঘর মুছতে হতো বা অন্য কাজ করতে হতো। খাবার একদম অল্প দিত। বাসার ‘স্যার’ হাত দিয়ে মারতেন আর বেশির ভাগ সময় ‘ম্যাডাম’ স্যারের সামনে যেতে দিতেন না।
মেরে দাঁত ভেঙে দিয়েছে জানিয়ে মেয়েটি জানাল, তার এখনো খাবার খেতে কষ্ট হয়। তবে রসমালাই খেতে বেশি ভালো লাগে।
বুধবার মেয়েটির বাবার মুঠোফোনে তার সঙ্গে কথা হয়। মেয়েটি গত ৩১ জানুয়ারি রাত থেকে গাজীপুরের একটি হাসপাতালে ভর্তি আছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সদ্য সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাফিকুর রহমান ও বীথি আক্তারের বাসায় কাজ করত ১১ বছরের মেয়েশিশুটি। তাকে নির্যাতনের ঘটনায় সাফিকুর ও তাঁর স্ত্রী বীথি গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দী আছেন।
গত মঙ্গলবার মেয়েটিকে নির্যাতনের ঘটনায় সাফিকুর ও বীথিকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত সাফিকুর রহমানের ৫ দিন, তাঁর স্ত্রীর ৭ দিন, তাঁদের বাসার গৃহকর্মী রুপালী খাতুনের ৫ দিন ও মোছা. সুফিয়া বেগমের ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রুপালী খাতুনের দুই বছর ও ছয় মাসের সন্তানও মায়ের সঙ্গে কারাগারে আছে। মেয়েটি মুঠোফোনে প্রথম আলোকে জানায়, এই দুই শিশুর দেখভাল করত, পাশাপাশি বাসার বিভিন্ন কাজ করত।
মঙ্গলবার এই মামলার শুনানি চলার সময় মেয়েটিকে নির্যাতনের বিবরণ আদালতে তুলে ধরেন ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসাইন। মেয়েটি গত রোববার হাসপাতাল থেকে আদালতে উপস্থিত হয়ে জবানবন্দি দিয়েছে।
২ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৩টার দিকে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের ৭ /সি রোডের বাসা থেকে এই দম্পতি এবং তাঁদের দুই গৃহকর্মীকে গ্রেপ্তার করে উত্তরা পশ্চিম থানা-পুলিশ। পরের দিন আদালতের নির্দেশে দুই গৃহকর্মীসহ চারজনকে কারাগারে পাঠানো হয়।
১ ফেব্রুয়ারি উত্তরা পশ্চিম থানায় মেয়েকে নির্যাতনের ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০–এর বিভিন্ন ধারায় মামলা করেন মেয়েটির বাবা। ৫ ফেব্রুয়ারি সাফিকুর রহমানের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে সরকার।
মঙ্গলবার মেয়েটির বাবা আদালত থেকে মেয়ের কাছে ফেরার পথে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে বসে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁর চেহারা ছিল বিধ্বস্ত। এ সময় তাঁর বড় ভাই এবং পরিবারটিকে মামলা করা থেকে শুরু করে বিভিন্নভাবে সহায়তা করা গাজীপুরের স্থানীয় সাংবাদিক আলমগীর হোসাইনও উপস্থিত ছিলেন।
বর্তমানে আশুলিয়ায় একটি হোটেলে নাশতা বানানোর কাজ করা মেয়েটির বাবা জানালেন, সাফিকুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী বীথির বাসার নিরাপত্তা প্রহরী জাহাঙ্গীরের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সেই সূত্রে আট মাস আগে তিনি মেয়েকে ওই বাসায় কাজে দিয়েছিলেন। মেয়ে বাসায় বাচ্চাদের দেখবে, পড়াশোনা করবে আর ভবিষ্যতে মেয়ের বিয়েও দিয়ে দেবেন—এমনই কথা ছিল। মেয়ে এ কাজের জন্য কোনো বেতন পেত না। মেয়েকে কাজে দেওয়ার সময় একটি স্ট্যাম্পে সই করেছিলেন, একইভাবে গত ৩১ জানুয়ারি অসুস্থ মেয়েকে যখন নিয়ে যান, তখনো সাদা কাগজে সই দিতে হয়েছে তাঁকে।
কাজে দেওয়ার পর দুই মাস ভালো ছিল। তার পর থেকেই মেয়েকে দেখতে চাইলে বকাবকি করতেন, না হলে বিভিন্ন অজুহাতে দেখতে দিতেন না। ফোন দিলেও বাসার ম্যাডাম বিরক্ত হতেন বলে জানালেন নির্যাতনের শিকার মেয়েটির বাবা।
মেয়েটির বাবার পাশে বসা তাঁর বড় ভাই জানালেন, মেয়েটির মা মারা যাওয়ার পর দুই বছর বয়স থেকে ১০ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি তাকে নিজের মেয়ের মতোই বড় করেছেন। মেয়েটি তাঁকে বড় আব্বু (বড় চাচা) ডাকে। মেয়েটিকে কাজে দেওয়ার পর নিজের ভাইয়ের সঙ্গেই সম্পর্কের অবনতি ঘটে। আগে বড় ভাইয়ের সঙ্গেই একটি হোটেলে কাজ করতেন মেয়েটির বাবা।
মেয়েটির বাবার বাড়ি পঞ্চগড় জেলায়। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি আর বিয়ে করেননি। মেয়েটির বাবা জানালেন, গত বছরের ২ নভেম্বর মেয়েকে শেষবার দেখে যান। গত ৩১ জানুয়ারি বাসার ম্যাডাম বীথি ফোন করে মেয়ে অসুস্থ, তাকে যেন নিয়ে যান—এ কথা জানান। ওই দিন দুপুরে মেয়েকে নিতে আসেন। বীথিকে ফোন করলে তিনি বাসার বাইরে আছেন বলে জানান। পরে সন্ধ্যা ৭টার দিকে ফিরে মেয়েকে বাসার নিচে নিয়ে এসে বুঝিয়ে দেন। তখন মেয়ের শারীরিক অবস্থা এত খারাপ ছিল যে ভালোভাবে কথাও বলতে পারছিল না।
মেয়েটির বাবা বলেন, ‘মেয়ে বলে, আব্বু আমি হাঁটতে পারব না।’ তখন মেয়ের মুখের ক্ষতচিহ্ন সম্পর্কে জানতে চাইলে বীথি বলেন, মেয়ে চুলকিয়ে এমন করেছে। ডাক্তার বা কোনো হাসপাতালে না নিয়ে মেয়েকে কবিরাজের কাছে নিতে বলেন। সাড়ে ৫ হাজার টাকাও দেন। এ সময় বীথি আরও বলেন, কবিরাজের কাছে চিকিৎসায় টাকা লাগলে পরে আরও টাকা দেবেন।
মেয়েটির বাবা মেয়েকে নিয়ে ওই বাসা থেকে বের হয়ে বড় ভাইকে বিষয়টি জানান। মেয়েকে গাজীপুরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করান। মেয়ে জানায়, গত নভেম্বর মাসের পর থেকে প্রতিনিয়ত মারধর করা হতো। গরম খুন্তি আগুনে পুড়িয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো।
মেয়েটির বাবা বলেন, ‘মেয়েকে দেখে মনে হইছে, খুন্তি আগুনে গরম করত আর সারা শরীরে ছ্যাঁকা দিত। হাত-পায়েও নাকি শিলপাটার শিল দিয়া ছেঁচছে। আমি এই ঘটনার বিচার চাই। সবাই দেখুক বড় লোকের বিচার হইছে।’
মঙ্গলবার বীথি আক্তার আদালতে বলেছেন, মেয়েটিকে কাজে দেওয়ার জন্য তার বাবা ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মেয়েটির বাবা প্রথম আলোকে বলেন, ‘ম্যাডাম আদালতে মিথ্যা কথা বলেছেন। ম্যাডামের কাছ থেকে গাড়িভাড়া বাবদ এর আগে এক–দুই হাজার টাকা নিছি।’
বীথি আক্তার আদালতে এটাও বলেছেন, মেয়েটি আত্মহত্যা করতে চেয়েছে। সে জন্য তাকে চড়থাপ্পড় মেরেছেন। আর আসামি সাফিকুর রহমানও বলেছেন, তিনি শুধু মাথায় একটি আঘাত করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মেয়েশিশুটিকে নির্যাতন করার ছবি ও মেয়েটির ভিডিও বক্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে মেয়েটি যাতে সুবিচার পায়, তার দাবি তোলা হচ্ছে। অন্যদিকে মেয়েটির ছবি ও ভিডিও পোস্ট করে বিকাশ নম্বর দিয়ে একটি মহল ব্যবসাও করছে।
মেয়েটির বাবা জানালেন, পুলিশের বড় কোনো কর্মকর্তা মেয়েটিকে দেখতে গিয়েছিলেন, তিনি তাঁকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন। আর বিভিন্ন লোকজন ৪০ হাজার টাকার মতো সহায়তা দিয়েছেন। হাসপাতালে সরকারিভাবে চিকিৎসা হচ্ছে। মামলা করতেও তাঁকে কোনো খরচ করতে হচ্ছে না।
সাংবাদিক আলমগীর হোসাইন আর মেয়েটির বাবার বড় ভাই একই ভবনে ভাড়া থাকেন। মেয়েটি যখন তার বড় চাচার কাছে থাকত, তখন থেকে আলমগীর মেয়েটিকে চিনতেন। নির্যাতনের ঘটনার পর আলমগীর পরিবারটির পাশে দাঁড়ান।
আলমগীর হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, থানায় মামলা করতেও বেগ পেতে হয়েছে। প্রথমে থানা মামলা নিতে গড়িমসি করতে থাকে। থানা থেকে মেয়েটির বাবাকে বিমানের এমডির সঙ্গে আপস করে ফেলার প্রস্তাবও দেওয়া হয়। পরে মেয়েটির ঘটনা ফেসবুকে ভাইরাল বা ছড়িয়ে পড়লে মামলা নিতে বাধ্য হয় উত্তরা পশ্চিম থানা।
মেয়েটির বড় চাচা প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেয়ে বলছে তাকে বাথরুমে আটকে রাখত। বাথরুমে থাকা পেস্ট আর পানি খাইত। আমরা তো আর দেখি নাই, আসলে তার সঙ্গে কী কী করা হইছে। তবে মেয়েটার সারা শরীরেই তো খালি ছ্যাঁকার দাগ।’
বাংলাদেশ আইন ও অধিকার এইডের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আলী আসগর ইমন। তিনি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সাংবাদিক। তাঁর সংগঠনের পক্ষ থেকে মেয়েটির বাবাকে আইনি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
আলী আসগর প্রথম আলোকে বলেন, মেয়েটির মামলাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে একটি মহল। ফেসবুকে এবং দু–একটি গণমাধ্যমেও বিমানের এমডিকে ফাঁসানোর জন্য নির্যাতনের নাটক সাজানো হয়েছে বলে ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। আদালতে রিমান্ড চাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রধান দুই আসামিকে বাদ দিয়ে চার নম্বর আসামি এক গৃহকর্মীর রিমান্ড আবেদন করা হয়েছিল। আসামিপক্ষের আইনজীবী আদালতে এমনও বলেছেন, মেয়েটিকে নির্যাতনই করা হয়নি, অথচ তার সারা শরীরে ক্ষতচিহ্ন। ২২ ধারায় জবানবন্দিতেও আদালতে মেয়েটি তাকে কীভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, তা বলেছে।
আলী আসগর বলেন, মেয়েটির বাবা গোলাম মোস্তফা আসামিপক্ষের সঙ্গে আপস করবেন না বলে জানিয়েছেন। সবার চাওয়া, পরিবারটি যাতে সুষ্ঠু বিচার পায়।
মঙ্গলবার রিমান্ড আবেদনে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক রুবেল মিয়া উল্লেখ করেছেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে শিশুটিকে নির্যাতন করতেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। মামলার ঘটনায় ব্যবহৃত গরম খুন্তি কোথায় রাখা হয়েছে, তা আসামিরা জানেন। এ ছাড়া শিশুটির শরীরের ক্ষতচিহ্ন দেখে ধারণা করা হচ্ছে, তাকে অন্য ধরনের পাশবিক নির্যাতনও করা হয়েছে।