নারী নেতৃত্ব বিকাশে উদ্যোগ জরুরি

‘নারী নেতৃত্বের বিকাশ ও টেকসই পরিবর্তনে সমন্বিত উদ্যোগ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) এ এস এম রহমত উল্লাহ, মাশফিকা জামান সাটিয়ার, শবনম মোস্তারী ও শাহীন আনাম। গতকাল ঢাকায় প্রথম আলোর কার্যালয়েছবি: প্রথম আলো

সব ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব বিকাশের জন্য সরকারের পাশাপাশি সব অংশীজনকে এগিয়ে আসতে হবে। জেন্ডার সমতা অর্জনের জন্য নারীদের পর্যাপ্ত দক্ষতা অর্জন খুবই জরুরি। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবসা, রাজনীতি, প্রশাসনসহ সব ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব বিকাশে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। নারীর ক্ষমতায়ন মানে একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা। যেখানে প্রতিটি শিশু তার পূর্ণ সম্ভাবনা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারবে।

ঢাকার নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সহযোগিতায় সেভ দ্য চিলড্রেনের সোচ্চার প্রকল্প ও প্রথম আলোর উদ্যোগে আয়োজিত ‘নারী নেতৃত্বের বিকাশ ও টেকসই পরিবর্তনের সমন্বিত উদ্যোগ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে নারী উদ্যোক্তা, নারীনেত্রী, নারী অধিকারকর্মী, উন্নয়ন সহযোগী ও পেশাজীবী এবং সোচ্চার প্রকল্পভুক্ত এ কথা বলেন। গতকাল সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে এ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শবনম মোস্তারী বলেন, ‘আমাদের সমাজে নারীদের অনেক অগ্রগতি হয়েছে। নারীকে নেতৃত্বের জায়গায় আরও এগিয়ে নিতে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত শিক্ষা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।’ তিনি বলেন, সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবসা, রাজনীতি, প্রশাসনসহ সব ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্বের বিকাশে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। নারী নেতৃত্ব বিকাশে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি অংশীজনদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

ঢাকার নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার মাশফিকা জামান সাটিয়ার বলেন, নারীদের একত্র করা ও নারী নেতৃত্ব বিকাশে সমন্বিতভাবে কাজ করতে নেদারল্যান্ডস দূতাবাস সোচ্চার প্রকল্পকে সহায়তা করছে। তিনি মনে করেন, নারী নেতৃত্বকে এগিয়ে নিতে নারীদের পাশাপাশি উদার চিন্তার পুরুষদের একত্র হওয়ার সময় এসেছে। ৫১ শতাংশ নারীকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এমনটি হলে দেশের অগ্রগতি থমকে যাবে।

নারী নেতৃত্ব বিকাশে কাজ করা সংগঠনগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তার অভাব রয়েছে বলে উল্লেখ করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। তিনি বলেন, বৈশ্বিকভাবে এ সমস্যা আছে। তবে বাংলাদেশে সেটা আরও প্রকট। তিনি সব অংশীজনকে এ সংকট নিরসনে কাজ করার আহ্বান জানান।

নারীকে নেতৃত্বের জায়গায় আরও এগিয়ে নিতে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত শিক্ষা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
শবনম মোস্তারী, অতিরিক্ত সচিব, নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়

ইউনিয়ন থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গা পর্যন্ত নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে যেসব প্রতিষ্ঠান আছে, সেগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না বলেও অভিযোগ করেন শাহীন আনাম। তিনি বলেন, বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নেই। তারা ঠিকমতো প্রতিবেদনও দেয় না। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বাংলাদেশে সোচ্চার প্রকল্পের মাধ্যমে নারী নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করা হচ্ছে উল্লেখ করে সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর এ এস এম রহমত উল্লাহ বলেন, নারী নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও সামাজিক বাধা ও পিতৃতান্ত্রিক মনোভাবের কারণে এখনো অনেক ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়নি। তিনি নারী ও কন্যাশিশুর সমান অধিকার, ন্যায়বিচার ও সুযোগ নিশ্চিতে কাজ করার জন্য সবাইকে দৃঢ় অঙ্গীকার করার আহ্বান জানান।

গত দেড় বছর নারীবিদ্বেষ, নারীবৈষম্য, নারীর বিরুদ্ধে আলোচনার মধ্য দিয়ে অধিকার আদায়ের যে আলোচনা, সেটিকে পরিবর্তনের চেষ্টা ছিল বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম। নারী ধর্ষণের ঘটনায় সমাজে সালিসি প্রথার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করে তিনি বলেন, ধর্ষণ একটা ফৌজদারি অপরাধ। এটার জন্য কোনো সালিস হতে পারে না। তিনি সমাজের তরুণদের মধ্যে জনমত গড়ে তোলার মাধ্যমে এই সালিসি প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা বলেন।

নারী নেতৃত্ব বিকাশে অনেক বাধা ও সীমাবদ্ধতা আছে উল্লেখ করে ইউএনডিপির জেন্ডার টিম লিডার শারমিন ইসলাম বলেন, নারীকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য সম্প্রতি সহিংসতার নতুন অনেক ধরনও দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, নারী যখন নেতৃত্বের জায়গায় থাকে, তখন দেখা যায়, নারী অন্তর্ভুক্তিমূলক অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। কাজেই এখন যাঁরা নেতৃত্বের জায়গায় আছেন, তাঁদের চিন্তা করতে হবে, কী করে নতুন নেতৃত্ব বিকাশে ভূমিকা রাখা যায়।

প্রতিবন্ধী নারীদের স্বাবলম্বী করতে তাঁদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে বলে উল্লেখ করেন আইএলওর ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অফিসার (সোশ্যাল প্রটেকশন) ফারজানা রেজা।

নারী নেতৃত্ব বিকাশে পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন ইউএন উইমেন বাংলাদেশের কো–অর্ডিনেশন অ্যান্ড পার্টনারশিপস অ্যানালিস্ট সৈয়দা সামারা মোরতাদা। তিনি মনে করেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধীসহ ট্রান্সজেন্ডার নারীদের নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

নারীদের হাতে অর্থ না থাকলে নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক সাবা নওরীন। নারী নেতৃত্ব বিকাশে মূল বাধা হিসেবে তিনি সামাজিক প্রবণতা ও পুরুষদের চিন্তাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, পরিবর্তনের জন্য পুরুষদের নিয়ে উঠান বৈঠক করতে হবে। কারণ, একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে মেয়েরা যখন এগিয়ে যেতে চান, তখন তাঁর ভাই অথবা বাবা কিংবা আশপাশের পুরুষ অনেক ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করেন। তাই পুরুষদের কাউন্সেলিং করা দরকার।

ওয়াই ওয়াই ভেন্সার্সের চিফ অপারেটিং অফিসার ওসমান ঢালী নারী নেতৃত্বের সংগঠনগুলোতে বিনিয়োগের কী কী সুযোগ রয়েছে, তা তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সোচ্চার প্রকল্পের কর্মপরিকল্পনা ও বিষয়বস্তু তুলে ধরেন সেভ দ্য চিলড্রেনের পরিচালক (সোশ্যাল ট্রান্সফরমেশন) ওমর ফারুক।

প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরীর সঞ্চালনায় গোলটেবিল বেঠকে আরও বক্তব্য দেন মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের আইন কর্মকর্তা আইভী আক্তার, সবুজের অভিযান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মাহমুদা বেগম, বিএনকেএসের উপপরিচালক উবানু মারমা, কাটনারপাড়া নারী উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক লতিফা ইয়াসমিন লাভলী, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানা, অ্যাসোসিয়েশন ফর অল্টারনেটিভ ডেভেলপমেন্টের প্রধান নির্বাহী সৈয়দা ইয়াছমিন, পিএসটিসির প্রজেক্ট ম্যানেজার কানিজ গোফরানি কোরাইশি ও সেভ দ্য চিলড্রেনের টেকনিক্যাল ম্যানেজার (জেন্ডার ইকুইটি অ্যান্ড সোশ্যাল ইনক্লুশন) রাশেদা আখতার।