জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে দিনব্যাপী আর্ট ক্যাম্প
শিল্পের নান্দনিকতায় উঠে এল গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি
মুক্ত উদার আকাশছোঁয়ার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু নির্মমভাবে ভেঙে দেওয়া হয়েছে তার একটি ডানা। আর পা জড়িয়ে ধরেছে কঠিন পাথুরে জমিন। শিল্পী অমল আকাশ ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিকে আঁকছিলেন ছবিটি। পাশেই নাজিয়া আন্দালিব প্রিমা তাঁর ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলছিলেন এমন এক তরুণের মুখচ্ছবি, যেখানে প্রকাশিত হয়েছে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোর প্রতিরোধ, প্রতিবাদ, সাহস, শোক ও যন্ত্রণার অভিব্যক্তি। তাঁদের মতো আরও অনেক শিল্পী রংতুলিতে মগ্ন ছিলেন জুলাইয়ের স্মৃতিকে মূর্ত করে তুলতে।
সোমবার জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হলো দিনব্যাপী আর্টক্যাম্প। ‘বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতি’ নামের এই আর্টক্যাম্পে দেশের খ্যাতনামা প্রবীণ ও নবীন প্রজন্মের সম্ভাবনাময় শিল্পীরা অংশ নেন। জাদুঘরের পূর্ব প্রান্তে জলাধারের পাশের মাঠে ছাউনি টাঙিয়ে আর্টক্যাম্পের আয়োজন করা হয়। তবে শিল্পীদের কেউ কেউ জাদুঘরের বিশাল অঙ্গনে নিজেদের পছন্দমতো স্থানে বসেও ছবি আঁকেন।
সকাল ১০টা থেকে আর্টক্যাম্পে ছবি আঁকার পর্ব শুরু হয়। বেলা একটার দিকে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে আর্টক্যাম্পের উদ্বোধন করেন। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আয়োজিত এই আর্টক্যাম্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবীণ শিল্পীদের পাশাপাশি উদীয়মান সূর্যের মতো তরুণ প্রজন্মের শিল্পীরা এতে অংশ নিয়েছেন। আমাদের দেশের শিল্পী-সাহিত্যিকেরা বরাবরই মহান ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তাঁদের সৃজনসম্ভারকে সমৃদ্ধ করেছেন; জাতিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে উদ্দীপ্ত করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় ফ্যাসিবাদবিরোধী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেও তাঁরা সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন।
সংস্কৃতিমন্ত্রী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমি তুলে ধরে বলেন, ছাত্র-জনতা, খেটে খাওয়া মানুষ, দিনমজুরসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ আন্দোলনে শামিল হয়েছিল। তাদের সম্মিলিত আন্দোলন ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সেই আন্দোলনের ঘটনাবলি শিল্পকর্মের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যে এই আর্টক্যাম্প আয়োজিত হয়েছে। এ কারণে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি, তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহসান মাহমুদ পরে সাংবাদিকদের বলেন, একসময় এই স্থানটির পরিচিতি ছিল গণভবন হিসেবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। জুলাই অভ্যুত্থানের পর জনগণ এখান থেকে স্বৈরশাসককে উৎখাত করে। সেই স্থানটিকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হয়েছে, যেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনা জানতে পারে। জুলাই অভ্যুত্থানের ঘটনা নিয়ে গবেষণা, দালিলিক প্রমাণ ও স্মৃতি সংরক্ষণ করা এই জাদুঘরের লক্ষ্য। মানুষ যেন ফ্যাসিবাদের গুম, খুন ও নির্যাতনের বিষয়গুলো ভুলে না যায়, সে কারণে শিল্পকর্মের মাধ্যমে ঘটনাগুলো তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, শিল্পীদের সৃষ্ট শিল্পকর্মগুলো জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে স্থায়ীভাবে প্রদর্শন করা হবে।
অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের মধ্যে অধ্যাপক মোস্তাফিজুল হক বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের পতন হলেও এখনো বৈষম্য পুরোপুরি দূর হয়নি; জান্তব লালসা রয়ে গেছে। তিনি অভ্যুত্থান ও পরবর্তী ঘটনা তাঁর শিল্পকর্মে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
শিল্পী মোস্তাফা জামান ছিলেন জুলাই আন্দোলনে রাজপথের সক্রিয় কর্মী। তিনি ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন রাজপথের রক্তাক্ত দৃশ্য। তিনি বলেন, যারা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারা ক্ষমতায় যেতে পারেনি। ফলে যে বহুত্ববাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। তবে অনেক নতুন মুখ সামনে এসেছে। যেটুকু প্রাপ্তি ঘটেছে, সেখান থেকে নতুন করে শুরু করতে হবে।
শিল্পী নাসিম আহমেদ নাদভি তাঁর ক্যানভাসে সাদা-কালোতে দাবার ছকের মতো করে তুলে এনেছেন বিভিন্ন ঘটনা। নাইমা হক অনেকটা বিমূর্তভাবে এঁকেছেন অতীতের স্মৃতির মধ্য থেকে তুলে আনা বিভিন্ন অনুষঙ্গ। জাফরিন গুলশান জানান, জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত শিশু ও তাদের মায়ের সন্তান হারানোর বেদনাকে অবলম্বন করে ছবি এঁকেছেন তিনি। ফারজানা আহমেদ উর্মি জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে আগেও কাজ করেছেন। বেঙ্গল গ্যালারিতে অভ্যুত্থানের পরপরই একটি যৌথ শিল্পকর্ম প্রদর্শনী করেছিলেন তাঁরা। এবার তিনি ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিকে একটি মনোরম পটভূমিতে এঁকেছেন দুই নর-নারীর বিধ্বস্ত অবয়ব—একটি বড় প্রত্যাশা নিয়ে যারা অংশ নিয়েছিল গণ-অভ্যুত্থানে।
আর্টক্যাম্পে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের মধ্যে আরও ছিলেন কাজী সালাউদ্দীন আহমেদ, সামিয়া আফরিন, জিয়তু চাকমা, এ. এছেন, ইমাম হোসেন, খন্দকার নাছির আহাম্মদ, আবদুল হালিম চঞ্চল, তামান্না লিজা, সৈয়দ জাহিদ ইকবাল, ফারিয়া খানম, আরমান চৌধুরী, নাজমুন নাহার, সুমন হালদার, মোমিন মুক্তার ও মোস্তাফা জামান মিঠু। শিল্পীরা তাঁদের বিভিন্ন মাধ্যমের শিল্পকর্মে একটি মুক্ত, উদার ও বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জুলাই অভ্যুত্থানে যাঁরা রাজপথে নেমে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন, নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন, গুম-খুনের কবলে পড়েছিলেন—সেসব ঘটনার স্মৃতিকে সজীব করে তুলেছেন।