ক্যানসারে হারিয়ে যাওয়া মুগ্ধতার স্মৃতি থাকবে জেগে, দেবে লড়াইয়ের সাহস

মাত্র সাত বছর তিন মাস বয়সে ক্যানসারের কাছে হার মানতে হয়েছে নূরেন ফাইজা ইকরাম মুগ্ধতাকেছবি: পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া

মাত্র সাত বছর তিন মাসের ছোট্ট এক জীবন। তবু এই অল্প সময়ের ভেতরেই রেখে গেছে অনেক দীর্ঘ আলো। পুতুল খেলার বয়সে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে হার মানা নূরেন ফাইজা ইকরাম মুগ্ধতা পৃথিবীতে আর নেই। কিন্তু তার নামে আজ বেঁচে আছে সাহস আর সহমর্মিতা। যে শিশুটি নিজে বাঁচতে পারেনি, সে-ই এখন অন্য শিশুদের বাঁচার লড়াইয়ে পাশে দাঁড়াচ্ছে—‘মুগ্ধতা স্মৃতি বৃত্তি’র মধ্য দিয়ে।

২০১৯ সালের মার্চে ছোট্ট নূরেন ফাইজা ইকরাম মুগ্ধতার ব্লাড ক্যানসার শনাক্ত হয়। টানা দুই বছরের চিকিৎসা, আশা-নিরাশার দোলাচল পেরিয়ে ২০২১ সালের ২৯ মে পৃথিবী ছেড়ে যায় সে। সে চলে গেলেও রেখে গেছে অন্য এক আলো। যে আলো ‘মুগ্ধতা স্মৃতি বৃত্তি’র মাধ্যমে অন্য শিশুদের স্বপ্ন আর সাহস জোগাচ্ছে।

হঠাৎ অসুস্থতা

মুগ্ধতার জন্ম ২০১৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি। পাঁচ বছর বয়সে ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত সে অসুস্থ ছিল না; কখনো বড় কোনো অসুখেও ভোগেনি। কিন্তু একসময় মেয়ের চেহারায় ক্লান্তি, ঘুমের মধ্যে কাশি—এই সামান্য লক্ষণই উদ্বিগ্ন করে তোলে তার মা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের সহকারী পরিচালক নাজনীন সুলতানা ও বাবা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ডিজিএম মো. তুহিন ইকরামকে। তাঁদের আরও এক ছেলে ও এক মেয়ে আছে। ছেলে মাধুর্যের বয়স আট বছর ও মেয়ে মেহরিশের বয়স দুই বছর।

হুট করেই জানতে পারি মুগ্ধতার ব্লাড ক্যানসারের কথা। তখন চিকিৎসার শুরুতেই শিক্ষা ক্যাডার সমিতির সদস্যরা ২০ হাজার টাকা আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। যে যেভাবে পেরেছেন সহায়তা করেছেন। ক্যানসার চিকিৎসায় এ টাকার পরিমাণ হয়তো কিছুই ছিল না; কিন্তু তখন মনে সাহস পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল আমাদের পাশে তো অনেক মানুষ আছেন।
—নাজনীন সুলতানা, মুগ্ধতার মা

মুগ্ধতার মা নাজনীন সুলতানা বলেন, ‘ক্লান্তি আর ঘুমের মধ্যে কাশির কারণে মেয়েকে নিয়ে শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লার কাছে যাই। তিনি দেখেই সিবিসি (কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট, কমপ্লিট ব্লাড পিকচার টেস্ট) পরীক্ষা করতে দিলেন। তিনি হোয়াটসঅ্যাপে পরীক্ষার রিপোর্ট পাঠাতে বললেন। আমার ছোট বোনও চিকিৎসক। তাঁরা রিপোর্ট দেখেই বুঝতে পারলেন। তারপর সবকিছু খুব দ্রুত ঘটে যায়।’

বাবার কোলে মুগ্ধতা, মায়ের কোলে মাধুর্য, ২০২০ সালে
ছবি: পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া

এরপর ছোট্ট মুগ্ধতাকে নিয়ে শুরু হয় যুদ্ধ। চিকিৎসার জন্য ভারত ও বাংলাদেশে দৌড়াতে হয়। যেতে হয় ভারতের মুম্বাইয়ের টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে। প্রথম দফায় টানা ছয় মাসের বেশি ভারতেই থাকতে হয়। সে সময় হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়নি, শুধু হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসকদের দেখাতে হতো। তখন চিকিৎসার খরচ হাতের নাগালেই ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে ভারতের হাসপাতালেই থাকতে হয় ৫৩ দিন। তখন খরচের পরিমাণও বাড়তে থাকে। এই চিকিৎসায় মোট খরচ পড়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা।

২০১৯ সালের মার্চে ছোট্ট মুগ্ধতার ব্লাড ক্যানসার শনাক্ত হয়। টানা দুই বছরের চিকিৎসা, আশা-নিরাশার দোলাচল পেরিয়ে ২০২১ সালের ২৯ মে পৃথিবী ছেড়ে যায় সে। সে চলে গেলেও রেখে গেছে অন্য এক আলো। যে আলো ‘মুগ্ধতা স্মৃতি বৃত্তি’র মাধ্যমে অন্য শিশুদের স্বপ্ন আর সাহস জোগাচ্ছে।

মুগ্ধতার বাবা-মা দুজনেই সরকারি চাকরিজীবী। এত বড় ব্যয় একা বহন করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। সে সময় এই পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন স্বজন, বন্ধু ও মুগ্ধতার বাবা-মায়ের সহকর্মীরা। এ কারণে লড়াই চালিয়ে যাওয়া অনেকটাই সহজ হয়েছিল, মনে সাহস পেয়েছিলেন বাবা ও মা।

নাজনীন সুলতানা বলেন, ‘চিকিৎসার শুরুতেই শিক্ষা ক্যাডার সমিতির সদস্যরা ২০ হাজার টাকা আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। যে যেভাবে পেরেছেন সহায়তা করেছেন। ক্যানসার চিকিৎসায় এ টাকার পরিমাণ হয়তো কিছুই ছিল না। কিন্তু তখন মনে সাহস পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল আমাদের পাশে তো অনেক মানুষ আছেন।’

গত বছর ছোট্ট মুগ্ধতার নামে পারিবারিক উদ্যোগে চালু হয়েছে ‘মুগ্ধতা স্মৃতি বৃত্তি’
ছবি: পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া

হার মেনেছে মুগ্ধতা

যে বয়সে স্বপ্নের ভাষা হয় খেলনা আর রঙিন বই, সে বয়সেই ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে হার মানতে হয়েছে মুগ্ধতাকে।

মেয়েকে সুস্থ করতে সাধ্যমতো করার চেষ্টা করেছেন বাবা-মা। এরপরও তাঁদের মনে ঘুরে ফেরে অসংখ্য প্রশ্ন—চিকিৎসা ঠিক ছিল তো? আর কিছু করার সুযোগ কি ছিল?

নাজনীন সুলতানা বলেন, ‘আমরা তো সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। কিন্তু ভাবি, যেসব বাবা-মায়ের আর্থিক সামর্থ্য নেই, তাঁদের কষ্টটা কতটা ভয়াবহ!’

মুগ্ধতার নামে আলো ছড়ানোর চেষ্টা

মুগ্ধতার মৃত্যুর পর থেকেই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন তার বাবা-মা। মুগ্ধতা চলে যাওয়ার দিনটি প্রতিবছর মসজিদে এতিম বাচ্চাদের খাবারের ব্যবস্থার পাশাপাশি পথশিশুদের নিয়ে কেক কেটে কাটান তাঁরা।

এ ছাড়া গত বছর পারিবারিক উদ্যোগে চালু করেন ‘মুগ্ধতা স্মৃতি বৃত্তি’। দরিদ্র পরিবারের ক্যানসার আক্রান্ত শিশু, ক্যানসার সারভাইভার বা ক্যানসার থেকে সুস্থ হওয়া শিশু বা পরিবারের কেউ ক্যানসার আক্রান্ত হলে সেই পরিবারের শিশুদের জন্য এই সহায়তা।

মুগ্ধতার জন্মদিনে প্রতিবছর পথশিশু ও এতিমদের নিয়ে কেক কাটেন মা–বাবা।
ছবি: পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া

মুগ্ধতার মা বলেন, ‘মেয়ে মারা যাওয়ার পর থেকেই বিভিন্নভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। গত বছর থেকে মেয়ের নামে খুব ছোট পরিসরে পারিবারিকভাবে একটি বৃত্তি চালু করেছি। যেহেতু খুব বেশি পরিবারকে এখনো সহায়তা করতে পারছি না, তাই এই বৃত্তির কথা প্রচারও করি না। তবে ভবিষ্যতে মেয়ের নামে তহবিল গঠন করে বড় আকারে কিছু করার ইচ্ছা আছে।’

সেন্টার ফর ক্যানসার কেয়ার ফাউন্ডেশনের ‘পাশে আছি’ কার্যক্রমের মাধ্যমে এই বৃত্তিটি পরিচালিত হচ্ছে। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের জন্য এই বৃত্তির আবেদন করা যাবে। ফরম পূরণ করে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে cccbangladesh 2023 @gmail. com ঠিকানায় আবেদন ই-মেইল করতে হবে।

নাজনীন সুলতানা জানিয়েছেন, যাচাই-বাছাই শেষে পাঁচ থেকে ছয়জন শিশুকে এককালীন ১২ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ক্যানসার দিবসে শিশুদের হাতে ‘মুগ্ধতা স্মৃতি বৃত্তি’র টাকা তুলে দেওয়া হবে।

মুগ্ধতা রাজধানীর শান্তিনগরের লিটল অ্যাঞ্জেলস লার্নিং হোমসে পড়ত। তার বাবার স্বপ্ন ছিল, মেয়ে ব্যারিস্টার হবে।

নাজনীন সুলতানা বলেন, মুগ্ধতাও শুনে শুনে বলত, বড় হয়ে সে ব্যারিস্টার হবে। মুগ্ধতা আর নেই। তার সে স্বপ্নও আর পূরণ হলো না।

স্বপ্ন পূরণ না হলেও মুগ্ধতা আজ অন্য শিশুদের বাঁচার লড়াইয়ে নীরবে পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ছোট্ট একটি জীবনের এই রেখে যাওয়া মানবিক উত্তরাধিকারই হয়তো সবচেয়ে বড় জয়—ক্যানসারের বিরুদ্ধে।