ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ার ১৩টি পথে ১৪টি বাস নিয়ে নারীদের জন্য ‘পিংক বাস’ সার্ভিস

বাসগুলো পরিচালনা করবেন নারী চালক ও নারী সহকারীরাছবি: প্রথম আলো

গাজীপুর বিআরটিসি ট্রেনিং সেন্টারে তাঁরা গাড়ি চালানো শেখেন। প্রত্যেকেই ছাত্রী। আজ মঙ্গলবার তেজগাঁওয়ে তাঁরা এসেছিলেন নারীদের জন্য বাস সার্ভিসের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে। কারণ, এই বাসগুলো পরিচালনা করবেন নারী চালক ও নারী সহকারীরা। ভাড়া তুলবেন নারীরা। বাসের যাত্রী থাকবেন শুধু নারীরা।

ছাত্রীদের একজন নাজমুন ইসলাম গাজীপুরের বিজিআইএফটি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে বিবিএ করেছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘গণপরিবহনে নারীদের বিভিন্ন সময়ে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। নারীদের পরিচালিত নারী বাস সার্ভিস হওয়ায় এই ভয় থাকবে না। নিশ্চিন্তে বাসে উঠতে পারব।’ তিনি জানান, তিনি বাসের নিয়মিত যাত্রী। দেখা যায়, সকালের দিকে বাসে জায়গা থাকে না, আবার অনেক সময় বাসে মেয়েদের নিতে চায় না। ফলে সময়মতো ক্লাসে পৌঁছানো যায় না, কর্মস্থলে পৌঁছানো যায় না। তাঁর মতে, শুধু ঢাকার ভেতরে যেন না হয়, ঢাকার বাইরেও এই বাস দরকার। তাই বাসের সংখ্যা আরও বাড়ানো উচিত।

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসি ট্রাক ডিপো প্রাঙ্গণে মহিলা বাস সার্ভিসের (পিংক বাস) উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শেখ রবিউল আলম বলেন, এই সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল নারীদের পরিচালনায় বিশেষ বাস চালু। উদ্দেশ্য ছিল, নারী বাসে ওঠার আগে ও পরে নারীবান্ধব পরিবেশ পাবে। বাসের জন্য অপেক্ষার সময় নারীদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি হয়, বাসের মধ্যে অস্বস্তির পরিবেশ হয়, বাস থেকে নামার পর নিরাপদ ঝুঁকিতে পড়ে নারীরা। এ কারণে নিরাপদ যাতায়াতের প্রয়োজনে নারীবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা করার অঙ্গীকার ছিল। ঢাকার ১০টি রুটে একটি একতলা ও ৯টি দ্বিতল বাস চলবে। বগুড়ায় দুটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস চলবে। চট্টগ্রামে একটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস চলবে। তিন জেলায় ১৩৪টি স্থানে বাসগুলো থামবে। পরে বাসের সংখ্যা আরও বাড়বে, রুট সম্প্রাসারণ করা হবে। ২০০ ইভি (ইলেকট্রনিক বাহন) বাস আসবে। এর মধ্যে ১০০ বাস থাকবে নারীদের জন্য। অন্য বিভাগেও নারী বাস সার্ভিস চালু হবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক, নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমীন পারভীন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিআরটিসির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) আবদুল লতিফ মোল্লা।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কথা হয় কয়েকজন নারী যাত্রীর সঙ্গে। মীম নামের স্নাতক (সম্মান) শেষ বর্ষের এক ছাত্রী বলেন, অনেক সময় বাসে আসন পাওয়া যায় না। দাঁড়িয়ে যেতে হয়। বাসের ভিড়ের মধ্যে অনেক সময় খারাপ স্পর্শের শিকার হতে হয়। নারীদের জন্য দেওয়া বাসে উঠে এসব হয়রানির মুখে পড়তে হবে না। গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের সম্মান তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী মৃদুতা আওয়াল বলেন, নারী বাস সার্ভিসের এই উদ্যোগ খুব ভালো। বাসের সংখ্যা আরও বাড়ানো উচিত। তাঁর মতে, নারীরা বাস চালক হবে, এ নিয়ে অনেকে নেতিবাচক মন্তব্য ছড়াচ্ছে। এ ধরনের মনোভাব প্রকাশ থেকে বিরত থাকা উচিত।

বাস চালু হওয়ার ঠিক আগে আগে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলতে বাসে ওঠেন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আমার ভালো লাগছে। এখানে যাত্রীরা যাত্রার জন্য উৎসাহিত হয়ে এসেছে। এ যাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য যা যা করণীয় তা মন্ত্রণালয় থেকে করতে পারলে ভালো লাগবে।’

বাসের চালক মোসাম্মৎ রাবেয়া খাতুন বলেন, তিনি বিআরটিসিতে ছোট বাহন চালনার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এখন নারী বাসের চালক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। তিনি এমএ পাস। পরিবারে মা–বাবা, স্বামী ও শিশুসন্তান রয়েছে। বাস চালাবেন এটা শোনার পর পরিবার থেকে আপত্তি উঠেছিল। কিন্তু তিনি মনে করেন সব কাজ সবার জন্য। তাই তিনি এই চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন।

বাস চলাচল শুরুর পর সুমাইয়া নামে একজন যাত্রী বলেন, ‘আমরা সুন্দরভাবে চলাচল করতে পারব।’ চাকরিজীবী সাদিয়া আফরিন বলেন, ‘নারী বাসে নারীরা নিরাপদে চলতে পারব। কোনো হয়রানির শিকার হবো না বলে আশা করি।’ সীমা আক্তার নামে আরেক যাত্রী বলেন, ‘এখন থেকে হেনস্তা ছাড়াই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব, সেটা ভেবেই স্বস্তি লাগছে।’ তবে দ্রুত বাসের সংখ্যা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। বাসের চালক জান্নাতুল ফেরদৌসী বলেন, তিনি নারায়ণগঞ্জ থেকে মতিঝিল রুটে বাস চালাবেন। এমন একটি দিনের সাক্ষী হয়ে তাঁর ভালো লাগছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আগামী তিন মাসের মধ্যে ৫০টি বাস চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সেবাটি দ্রুত চালুর লক্ষ্যে বিদ্যমান সম্পদ ব্যবহার করে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার মধ্যেই সড়কপথে নারী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ যাত্রার লক্ষ্যে নারী চালক ও কন্ডাক্টর দ্বারা পরিচালিত পিংক কালারের এই বিশেষ বাস সার্ভিস সীমিত পরিসরে চালু করেছে বিআরটিসি। প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়া শহরের ১৩টি পথে মোট ১৪টি বাস চলাচল করবে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ১০টি, বগুড়া ও চট্টগ্রাম শহরে দুটি করে বাস সার্ভিস পরিচালনা করবে বিআরটিসি। ঢাকা নগরের ১০৬টি, চট্টগ্রামে ১২টি ও বগুড়ার ১৬টি মিলিয়ে মোট ১৩৪টি জায়গা থেকে যাত্রীসেবা দেওয়া হবে। নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা ডিপো, বাস ও কাউন্টারের দৃশ্যমান স্থানে সাঁটানোর পাশাপাশি এ সার্ভিসে ই-টিকিট চালু করা হয়েছে। তিনটি বাসে ক্লোজড-সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা এবং প্রতিটি বাসে ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) সংযোজন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি বাসে এই সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে।

বাসের যাত্রী থাকবেন শুধু নারীরা
ছবি: প্রথম আলো

এর আগেও ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ চালু হলেও তা সফল হয়নি। বিআরটিসির মহিলা বাস সার্ভিস পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম চালু হয় ১৯৯৮ সালে। নারী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ সালের ২৫ অক্টোবর এই বাসসেবা উদ্বোধন করা হয়। রুট ছিল ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা। মোট ১২টি বাস থাকলেও ৪-৫টির বেশি রাস্তায় চলাচল করতে দেখা যেত না। নারী যাত্রীদের অভিযোগ ছিল, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও তাঁরা বাসের দেখা পেতেন না। কিছু বাস নারীদের লিজ দেওয়া হয়। বাসের চালক থাকতেন পুরুষ। এক নারী উদ্যোক্তা ক্ষতির মুখে লিজ প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন এমন ঘটনাও ঘটেছিল। ২০০৯ সালে আবার এই সেবাকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। তবে তা তেমনভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।

এবার বাস সার্ভিস চালুর পর সে রকম ঘটনার যেন পুনারাবৃত্তি না হয়, সেদিকে নজর রাখতে বলেছেন নারী যাত্রীরা। তাঁরা বলেন, বিভিন্ন কারণে আগের বাস সার্ভিস সফল হয়নি। ব্যবস্থাপনা ভালো হওয়া দরকার। সেই সঙ্গে নারী বাস সার্ভিসের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও ইতিবাচক হওয়া দরকার।

মহিলা বাস সার্ভিসের পথ ও থামার স্থান

ঢাকার নতুন বাজার (কোকাকোলা)—মতিঝিল পথের বাস থামবে: কোকাকোলা, নতুন বাজার, উত্তর বাড্ডা, মধ্য বাড্ডা, মেরুল বাড্ডা, রামপুরা, আবুল হোটেল, মালিবাগ, কাকরাইল, পল্টন, গুলিস্তান, মতিঝিল।

তালতলা—মতিঝিল পথে বাস থামবে: তালতলা, খিলগাঁও রেলগেট, বাসাবো, বৌদ্ধ মন্দির, মুগদা, কমলাপুর রেলস্টেশন, আরামবাগ, শাপলা চত্বর, সচিবালয়।

ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার—জিপিও পথের বাস থামবে: ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার, বাঁশের পুল, কাজলা, যাত্রাবাড়ী, জনপথ মোড় (সায়েদাবাদ), ওয়ারী (বলধা গার্ডেন), গুলিস্তান, পল্টন, সচিবালয়, মৎস্য ভবন।

মিরপুর ১০— মতিঝিল পথের বাস থামবে: মিরপুর-১০, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, আসাদগেট, কলাবাগান, শাহবাগ, পল্টন, মতিঝিল।

মিরপুর—মতিঝিল পথের বাস থামবে: মিরপুর-১২, মিরপুর-১০, মিরপুর-১, টেকনিক্যাল, শ্যামলী, ফার্মগেট, শাহাবাগ, গুলিস্তান, মতিঝিল।

মিরপুর ১২—মতিঝিল পথে বাস থামবে: মিরপুর-১২, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, ফার্মগেট, শাহবাগ, প্রেসক্লাব, গুলিস্তান, মতিঝিল।

নারায়ণগঞ্জ—ঢাকা পথে থামবে: চাষাঢ়া, শিবুমার্কেট, স্টেডিয়াম, কালকুড়ি, ভূঁইগড়, সাইনবোর্ড, রায়েরবাগ, শনির আখড়া, টিকাটুলি, গুলিস্তান, মতিঝিল।

মোহাম্মদপুর—মতিঝিল পথে থামবে: মোহাম্মদপুর, শংকর, ঝিগাতলা, ধানমন্ডি-১৫, সিটি কলেজ, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, শাহবাগ, পল্টন, মতিঝিল, কমলাপুর।

আবদুল্লাহপুর—মতিঝিল পথে থামবে: আবদুল্লাহপুর, আজমপুর, এয়ারপোর্ট, খিলক্ষেত, বিশ্বরোড, কুর্মিটোলা, বনানী, মহাখালী, ফার্মগেট, শাহবাগ, মৎস্যভবন, প্রেসক্লাব, গুলিস্থান, মতিঝিল।

গাজীপুর—বিমানবন্দর পথে বাস থামবে: গাজীপুর শিববাড়ী, গাজীপুর চৌরাস্তা, মালেকের বাড়ি, বোর্ডবাজার, গাজীপুরা, কলেজগেট, স্টেশন রোড, আবদুল্লাহপুর, আজমপুর, বিমানবন্দর।

বগুড়ার শেরপুর—মাটিডালি পথের বাস থামবে: আরডিএ স্কুল, নয়মাইল মোড়, শাজানপুর উপশহর গেট, বি-ব্লক-মাঝিরা, বনানী, সাতমাথা, মহিলা কলেজ, মাটিডালি।

বগুড়ার বনানী—মোকামতলা পথে থামবে: বনানী, সাতমাথা, মহিলা কলেজ, মাটিডালি মোড়, টিএমএসএস হাসপাতাল, মহাস্থান বাজার, মোকামতলা স্ট্যান্ড।

চট্টগ্রামের কালুরঘাট—পতেঙ্গা পথে বাস থামবে: কালুরঘাট, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, ২নং গেট, জিইসি মোড়, লালখান বাজার, টাইগারপাস, দেওয়ানহাট, চৌমুহনী, আগ্রাবাদ, বারেকবিল্ডিং, ফ্রি পোর্ট, কাঠগড়, পতেঙ্গা।