বিশেষ সাক্ষাৎকার : সেঁজুতি সাহা

জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে নিজেদের সক্ষমতা গড়ে তুলতে চেয়েছি

বাংলাদেশের স্বনামধন্য অণুজীববিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহা সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্যাবিন ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউটের মর্যাদাপূর্ণ ‘রাইজিং স্টার অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন। টাইফয়েড টিকা কর্মসূচি, জিনোম সিকোয়েন্সিং এবং জনস্বাস্থ্য গবেষণায় অবদানের জন্য তাঁকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়। আজ মঙ্গলবার ওয়াশিংটন ডিসিতে এক অনুষ্ঠানে এ পুরস্কার গ্রহণ করবেন তিনি। সেঁজুতি সাহা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিএইচআরএফ) উপনির্বাহী পরিচালক। বাংলাদেশের টিকাব্যবস্থা, জিনোম গবেষণা, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ, মহামারির প্রস্তুতি ও দেশে টিকা উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মোস্তফা ইউসুফ

প্রথম আলো:

‘রাইজিং স্টার অ্যাওয়ার্ড’ কী, কারা এ স্বীকৃতি পায়?

সেঁজুতি সাহা: স্যাবিন ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউট অনেক বছর ধরে একটি ‘গোল্ড মেডেল অ্যাওয়ার্ড’ দেয়, যেটাকে অনেকটা লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড বলা যায়। অনেক বড় বড় বিজ্ঞানী এই সম্মাননা পেয়েছেন। তবে ২০২০ সাল থেকে তারা আরেকটি পুরস্কার দিচ্ছে, সেটি হলো ‘রাইজিং স্টার অ্যাওয়ার্ড’। ৪০ বছরের নিচের বিজ্ঞানীরা এ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন।

আমি অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে একটি বৈঠকে ছিলাম। হঠাৎ স্যাবিন ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহীর ফোন আসে। তিনি আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, বোর্ড কোনো দ্বিধা ছাড়াই পুরস্কারের জন্য আমার নাম চূড়ান্ত করেছে। স্যাবিন মূলত ভ্যাকসিন ও ভ্যাকসিনেশন নিয়ে কাজ করা মানুষদের স্বীকৃতি দেয়। কেউ গবেষণায় কাজ করেছেন, কেউ হয়তো টিকা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেছেন—এই পুরো ক্ষেত্রের অবদানের জন্যই পুরস্কারগুলো দেওয়া হয়।

প্রায় পাঁচ কোটি শিশুকে টাইফয়েড কনজুগেট টিকা দেওয়া। এক মাসের মধ্যে প্রায় সাড়ে চার কোটি শিশুকে টিকা দিতে পেরেছি। এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা আমাদের ইপিআই (সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি) ব্যবস্থার। স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠপর্যায়ের কর্মী, স্কুলশিক্ষক—অনেকে দিনরাত কাজ করেছেন।
প্রথম আলো:

আপনাকে কোন কাজের জন্য এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে?

সেঁজুতি সাহা: মূলত টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন নিয়ে ল্যাবে গবেষণার জন্য। গত বছরের ১২ অক্টোবর বাংলাদেশে একটি বড় টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল
প্রায় পাঁচ কোটি শিশুকে টাইফয়েড কনজুগেট টিকা দেওয়া। এক মাসের মধ্যে প্রায় সাড়ে চার কোটি শিশুকে টিকা দিতে পেরেছি। এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা আমাদের ইপিআই (সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি) ব্যবস্থার। স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠপর্যায়ের কর্মী, স্কুলশিক্ষক—অনেকে দিনরাত কাজ করেছেন। ইউনিসেফসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীও ছিল। আমার কাজটা ছিল তার আগের ধাপে। কোনো টিকা দেশে আনতে হলে তো প্রমাণ লাগবে কেন সেটি দরকার, কী ধরনের ঝুঁকি আছে, অর্থায়নের যৌক্তিকতা কী। সেই উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করাই ছিল আমাদের কাজ।

আমরা প্রমাণ করতে সক্ষম হই যে ওই মিউটেশনই অ্যাজিথ্রোমাইসিন প্রতিরোধ তৈরি করছে। পরে বাংলাদেশে ফলাফল যাচাই করা হয় এবং বিশ্বের প্রথম অ্যাজিথ্রোমাইসিন প্রতিরোধী জিনোমের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় বাংলাদেশ থেকে।
প্রথম আলো:

জিনোম সিকোয়েন্সিং নিয়ে আপনার কাজ কীভাবে শুরু হয়েছিল?

সেঁজুতি সাহা: যদিও সিএইচআরএফ অনেক আগে থেকে টাইফয়েডের প্রাদুর্ভাব নিয়ে গবেষণা করে আসছে, আমরা ২০১৬ সালে টাইফয়েড জিনমিক্স নিয়ে কাজ শুরু করি। তখন অ্যাজিথ্রোমাইসিন প্রতিরোধী কিছু টাইফয়েড কেস দেখতে পাই। এটা খুবই উদ্বেগজনক ছিল। কারণ, এই অ্যান্টিবায়োটিকটি সাধারণভাবে বহুল ব্যবহৃত। এর আগে বিশ্বের কোথাও এ ধরনের প্রতিরোধের রিপোর্ট ছিল না।

আমরা জিনোম সিকোয়েন্সিং করে কিছু নির্দিষ্ট মিউটেশন খুঁজে পাই। পরে আমরা আরেকটি ল্যাবরেটরি ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে সেই মিউটেশন প্রবেশ করিয়ে পরীক্ষা করি। বাংলাদেশে তখন সেই সক্ষমতা ছিল না, তাই ক্যালিফোর্নিয়ায় সহকর্মীদের ল্যাবে কাজটি করা হয়। আমরা প্রমাণ করতে সক্ষম হই যে ওই মিউটেশনই অ্যাজিথ্রোমাইসিন প্রতিরোধ তৈরি করছে। পরে বাংলাদেশে ফলাফল যাচাই করা হয় এবং বিশ্বের প্রথম অ্যাজিথ্রোমাইসিন প্রতিরোধী জিনোমের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় বাংলাদেশ থেকে।

একটা ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস কেমন আচরণ করবে, কোন অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করবে, কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে—সবকিছুর উত্তর তার ডিএনএর মধ্যে আছে। মানুষের চুলের রং, উচ্চতা বা শারীরিক বৈশিষ্ট্য যেমন ডিএনএ নির্ধারণ করে, একইভাবে জীবাণুর বৈশিষ্ট্যও তার ডিএনএ নির্ধারণ করে।
প্রথম আলো:

জিনোম সিকোয়েন্সিং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

সেঁজুতি সাহা: একটা ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস কেমন আচরণ করবে, কোন অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করবে, কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে—সবকিছুর উত্তর তার ডিএনএর মধ্যে আছে। মানুষের চুলের রং, উচ্চতা বা শারীরিক বৈশিষ্ট্য যেমন ডিএনএ নির্ধারণ করে, একইভাবে জীবাণুর বৈশিষ্ট্যও তার ডিএনএ নির্ধারণ করে।

আমরা যখন জিনোম সিকোয়েন্সিং করি, তখন বুঝতে পারি কোন জিন অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ তৈরি করছে, কোন পরিবর্তনের কারণে জীবাণু আরও সংক্রামক হচ্ছে বা কোন অংশকে লক্ষ্য করে ভ্যাকসিন তৈরি করা যেতে পারে।

প্রথম আলো:

বাংলাদেশে কি জিনোমভিত্তিক রোগ নজরদারিব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি?

সেঁজুতি সাহা: অবশ্যই। ভবিষ্যতের মহামারি মোকাবিলায় জিনোমিক সার্ভেইল্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি, পরবর্তী মহামারি আবারও কোনো শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস থেকেই আসতে পারে। কোভিডের সময় দ্রুত জিনোম সিকোয়েন্সিং করতে পেরেছিল বলেই বিশ্ব বুঝতে পেরেছিল এটি সার্স-কোভ-২

বাংলাদেশেও যদি নিয়মিতভাবে হাসপাতাল ও কমিউনিটি থেকে নমুনা সংগ্রহ করে সিকোয়েন্সিং করা যায়, তাহলে আমরা আগে থেকেই বুঝতে পারব কোন ভাইরাস ছড়াচ্ছে, কোনটির প্রাদুর্ভাব বাড়ছে, কতটা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এর জন্য প্রথমেই দরকার শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। মাইক্রোবায়োলজি ল্যাব, চিকিৎসক, রিপোর্টিং সিস্টেম—সবকিছুকে যুক্ত করতে হবে। যুক্তরাজ্যে যেভাবে কোনো ল্যাবে টাইফয়েড জীবাণু শনাক্ত হলেই সেটি সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় কিছু জিনমিক্স ল্যাবে পাঠানো হয় সিকোয়েন্সিংয়ের জন্য, আমাদেরও সে ধরনের ব্যবস্থা দরকার।

আমরা টাইফয়েড সৃষ্টিকারী জীবাণু সালমোনেলা টাইফির জিনোম সিকোয়েন্সিং স্টাডিগুলোর একটি করেছি বাংলাদেশে বসে। এই গবেষণার মাধ্যমে আমরা নীতিনির্ধারকদের দেখাতে পেরেছি জীবাণুগুলো কীভাবে অ্যান্টিবায়োটিক–প্রতিরোধী হয়ে উঠছে, কী ধরনের মিউটেশন হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এখনো বাংলাদেশের অনেক টাইফয়েড রোগী ওরাল অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে ভালো হয়ে যায়। কিন্তু যদি এমন সময় আসে, যখন এসব অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করবে না, তখন সবাইকে হাসপাতালে ভর্তি করে ইনজেকশন দিতে হবে। সেটা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করবে। জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে আমরা আগেভাগেই সেই ঝুঁকি বুঝতে পারছি। সত্যি বলতে, কেউ বিশ্বাস করত না বাংলাদেশে বসে আমরা এটা করতে পারব। বিদেশি ল্যাব বা সহকর্মীদের অনেকেই বলতেন, স্যাম্পল পাঠিয়ে দাও, আমরা কম খরচে করে দেব। কিন্তু আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, স্যাম্পল বাইরে পাঠাব না। দেশে বসেই করব। খরচ বেশি হবে, কষ্ট বেশি হবে, তবু নিজেদের সক্ষমতা গড়ে তুলব।

আজ এই স্বীকৃতি আসলে শুধু আমার নয়, এটা বাংলাদেশের। এটা আমাদের প্রতিষ্ঠানের। কারণ, একসময় কেউ আমাদের বিশ্বাস করেনি, কিন্তু এখন বাংলাদেশ বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে—আমরাও পারি।

বাংলাদেশেও যদি নিয়মিতভাবে হাসপাতাল ও কমিউনিটি থেকে নমুনা সংগ্রহ করে সিকোয়েন্সিং করা যায়, তাহলে আমরা আগে থেকেই বুঝতে পারব কোন ভাইরাস ছড়াচ্ছে, কোনটির প্রাদুর্ভাব বাড়ছে, কতটা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
প্রথম আলো:

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

সেঁজুতি সাহা: আপনাকেও ধন্যবাদ।