ঘুমকাড়ানি খেলা

ভেবে দেখলাম যে ইনসমনিয়ায় ভোগা মানুষের সুদিন এসেছে। তাঁরা নির্দ্বিধায় নিদ্রাহীন অবস্থায় বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচগুলো দেখতে পারবেন। দেখার আনন্দ উপভোগ করতে তাঁদের কোনো অসুবিধা হবে না। ইচ্ছা হলে মাঝে মাঝে ফ্লাস্কে রাখা চা-কফি আর সঙ্গে এটা-ওটা স্ন্যাকসও খেতে পারবেন। সেই সঙ্গে ডাক্তারদের নির্দেশিত ওষুধপাতি তো চলবেই। মোটকথা তাঁদের নির্ঘুম অবস্থাটা বিশ্বকাপ দেখার আনুকূল্য পাবার মতো। তবে এবার বিভিন্ন সময় নির্ধারিত হয়েছে খেলার। কোনোটা রাত ১১টায়, কোনোটা সকাল ৬টা-৭টায়। এই রকমের সব উল্টাপাল্টা সময়। এসব মেনে চলতে ঘুম থেকে উঠবস করতে হবে। আমার ঘটনাটি অবশ্য ভিন্ন। প্রায় মধ্য–আশি বয়সী হলেও ঘুমকাতুরে ভাবটি শারীরিকভাবে রয়ে গেছে। সন্ধে সাতটা-আটটার পর টিভিতে চোখ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। পৃথিবীজুড়ে তখন কী সব ঘটছে বা সারারাত ধরে ঘটবে, সেসব খবরাখবর জানা থেকে নিস্তারে সহযোগী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় প্রচণ্ড ঘুম। তখন গিন্নির সিরিয়াল দেখার দিকটিতেও সহদর্শক থাকতে পারি না ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ায়। উঠি ৯টা-১০টায়।

তো বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং প্রথম খেলাটি দেখার জন্য প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে যেমন করেই হোক ওসব দেখব। নিদ্রার কাছে হার মানা চলবে না। সে জন্য তিন ঘণ্টায় দুই মগ কফি পান করেছিলাম। তাতে আংশিক সাফল্য এসেছিল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি দেখতে পেরেছিলাম কিন্তু মেক্সিকো-সাউথ আফ্রিকার খেলাটি আর দেখা হয়নি। খেলা শুরুর আগেই তা থেকে চোখ সরাতে নিদ্রা নামক দিকটি কখন-কখন লাল কার্ড দেখিয়ে দিয়েছিল যে টের পাইনি। ঘুম থেকে জেগে সকালে খবরের কাগজে দেখলাম যে মেক্সিকো ২ গোলে জিতেছে একটি লাল কার্ড খেয়েও।

রফিকুন নবী
ফাইল ছবি

তবে মেক্সিকো জেতায় আনন্দিত হয়েছি। কারণ, দেশটিতে আমি একসময় গিয়েছিলাম। দারুণ ভালো লেগেছিল শিল্পী রিভিয়েরা, অরোজকো, ফ্রিডা কোহলির দেশটিকে। কষ্টও লেগেছিল দেশটির এককালের মূল অধিবাসী অ্যাজটেকদের দুরবস্থা দেখে। খুশি হয়েছিলাম অবশ্য সবার আতিথেয়তায়। তো, তারা প্রথম খেলাটি জিতে যাওয়ার খবর পড়ে ভালো লেগেছে খুব। তবে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের ফুটবল এতটাই ক্যারিশমাটিক অবস্থানে রয়েছে যে মেক্সিকো কত দূর পর্যন্ত উঠবে, তা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে। দল হিসেবে জায়ান্টদের পাশে এ দেশটি ঈষৎ ছোট জায়ান্ট বলে আমার মনে হয়।

আসলে দোষ বলি বা গুণ, আমার একটি স্বভাব রয়েছে, আমি যেসব দেশে গিয়েছি বিভিন্ন সময়ে আমন্ত্রিত হয়ে, সেসবের প্রতি একধরনের ভালোলাগা তৈরি হয়ে রয়েছে। অতএব বিশ্বকাপ ফুটবলেও তাদের আমি সমর্থক। তবে বিপত্তি ঘটে তেমন সমর্থিত দুটি দেশ যখন মুখোমুখি হয়। সে রকমটার জন্য একটা বুদ্ধি বের করে নিয়েছি। বুদ্ধিটি হলো ‘টস’ করে নেওয়া। ব্যাপারটি কারও সামনে করি না। করি মনে মনে।

এমনিতে খেলাধুলা নিয়ে আমার খুব একটা হেলদোল নেই। তার সঙ্গে দেশ-বিদেশের রাজনীতির খেলাও রয়েছে। এর মধ্যে সারা বছর ধরে চলা ফিফা কাপ, ইউরোপিয়ান কাপ, কোপা, এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ধরনের ফুটবল প্রতিযোগিতা হয়, তার খবর জানলেও খেলায় চোখ রাখা হয় না। কত কত নতুন নতুন খেলোয়াড়দের আবির্ভাব ঘটছে, তা–ও জানা থাকে না। তবে রোনালদো, এমবাপ্পে, নেইমার, মেসিদের নাম আর সবার মতো আমারও জানা আছে। তাঁদের টিমগুলোর খেলা দেখি। ভালো লাগে। তাদের স্কিল, পারদর্শিতা এবং বুদ্ধিমত্তা দেখে বিস্মিত হই।

তবে মেক্সিকো জেতায় আনন্দিত হয়েছি। কারণ, দেশটিতে আমি একসময় গিয়েছিলাম। দারুণ ভালো লেগেছিল শিল্পী রিভিয়েরা, অরোজকো, ফ্রিডা কোহলির দেশটিকে। কষ্টও লেগেছিল দেশটির এককালের মূল অধিবাসী অ্যাজটেকদের দুরবস্থা দেখে। খুশি হয়েছিলাম অবশ্য সবার আতিথেয়তায়। তো, তারা প্রথম খেলাটি জিতে যাওয়ার খবর পড়ে ভালো লেগেছে খুব।

এবার বলি মন খারাপের কথা। আমাদের দেশে বিশ্বকাপ নিয়ে হুলুস্থুল চলে। ভালো লাগার টিমগুলোকে নিয়ে মাতামাতির অন্ত নেই। সীমাহীন আনন্দে মেতে ওঠে সবাই। ঘরে ঘরে বিভিন্ন প্রতিযোগী দেশের পতাকা টাঙায়। বিশেষ করে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার। রীতিমতো ভক্ত-ক্লাবও রয়েছে দুটি দলের। কিন্তু বিশ্বকাপ ফুটবলের ফিকশ্চারে নিজেদের পতাকা থাকে না। অথচ ফুটবল নিয়ে উন্মাদনার দিকটি অন্য দেশের চাইতে তুলনায় কম নেই। তবে আশা রাখি, ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার কারণে একদিন না একদিন নিশ্চয়ই বিশ্বকাপে আমাদের পতাকাও উড়বে। এ ব্যাপারে ক্রিকেটে অগ্রগামী ভূমিকাটি অর্জিত হয়েছে।

যা–ই হোক, বিশ্বকাপের টিম পছন্দের দিকটিতে সমর্থকদের ভাগটি রয়েছে মূলত দুটি টিমকে নিয়ে। অর্থাৎ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার ব্যাপার নিয়ে ভাগটি চোখে পড়ার মতো। অবস্থাটি এমনই যে পাড়ায় পাড়ায় তো বটেই, একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও দুটি টিমের সমর্থক রয়েছে। স্বামী-স্ত্রী, পুত্র–কন্যা, নাতি-নাতনিদের মধ্যেও পছন্দ নিয়ে বিরোধের কাণ্ডটি ঘটে। ব্যাপারটি আর কোনো দেশে এমনটা রয়েছে বলে আমার মনে হয় না।

এতসব উন্মাদনার মধ্যে আমার আরেকটি অভ্যাসের কথা বলি। সেটি হলো বিশ্বকাপ ফুটবলের ব্যাপারে আমি সব সময় দুর্বল টিমের সমর্থক থাকি। তারা শক্তিধর কোনো টিমকে হারালে আনন্দিত হই। ভাবি, বড় টিম তো বড়ই। তাদের জেতাটা প্রায়ই অবশ্যম্ভাবী হওয়ার কথা। কিন্তু কিছুটা কমজোর দলের কাছে আচমকা তারা ধরাশায়ী হলে ভালো লাগে। এবারে অবশ্য সব দল নিয়ে আমার ধারণা জন্মেছে যে স্কিলের দিক দিয়ে সবাই কাছাকাছিতে রয়েছে। এক বছরে উন্নতি ঘটেছে সবার। অতএব নামীদামিদেরও ছোটদের দ্বারা কুপোকাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই বছরের প্রতিযোগিতায় বড়দের মধ্যে ইতালি নেই, নেই রাশিয়াও। তবে যুদ্ধে নিপতিত ইরানের প্রতি দৃষ্টি থাকবে। বেচারারা শত্রুর দেশে খেলবে। প্রচণ্ড মনোবল থাকবে যে সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। তাদের জন্য মিত্রপক্ষের শুভকামনা থাকবে অঢেল বলে আমার বিশ্বাস।

এতসব উন্মাদনার মধ্যে আমার আরেকটি অভ্যাসের কথা বলি। সেটি হলো বিশ্বকাপ ফুটবলের ব্যাপারে আমি সব সময় দুর্বল টিমের সমর্থক থাকি। তারা শক্তিধর কোনো টিমকে হারালে আনন্দিত হই। ভাবি, বড় টিম তো বড়ই। তাদের জেতাটা প্রায়ই অবশ্যম্ভাবী হওয়ার কথা।

যা–ই হোক, যে কথা দিয়ে লেখাটি শুরু করেছিলাম, সেই কথায় আসি। অর্থাৎ নিদ্রার দিকটি। আসলে বিশ্বজুড়ে বিশ্বকাপ মানুষদের ঘুম হারাম করে ছাড়বে। বিশেষ করে সময়ের হেরফেরে যেসব দেশে গভীর রাতে খেলা হবে। আমাদের দেশে বেশির ভাগ খেলার সময় কখনো খুব সকালে, কখনো আবার ভরসন্ধ্যা পার করে। আমার ঘুমের পরিধি রাত ১০টা থেকে পরদিন সকাল ১০টা পর্যন্ত। অতএব বিড়ম্বনায় পড়ার মতো। তবু দেখার বাসনাকে ধরে রাখার চেষ্টা করে যাব।

এবারে শেষ ইচ্ছাটার কথা বলি—

জানি বিশ্বজুড়ে

কেউ ধনী কেউ নিঃস্ব,

তবু বিশ্বকাপে

এক হয়ে থাক বিশ্ব।