কাবাবের খুশবু যেভাবে ছড়াল

কালমি কাবাব, বিফ পেশোয়ারি, রেশমি কাবাবসহ অন্তত ২০ রকমের কাবাব তৈরি করেন শেফ মাসুদ রানা। চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ির ‘তানুর কাবাব’ রেস্তোরাঁয়
ছবি: প্রথম আলো

ছোলা, মুড়ি, জিলাপি, পেঁয়াজু—ইফতার আয়োজন বললে চোখের সামনে ভেসে ওঠে তেলে ভাজার এই পদগুলো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মেজবানি গরুর মাংস, হালিম আর কাবাবও এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে। রেশমি, জালি, টিকিয়া, শাশলিক, শিক কাবাবসহ নানা পদের কাবাব এখন ইফতার আয়োজনে চোখে পড়ছে। বাদ যাচ্ছে না আফগানি কিংবা তুর্কি কাবাবও। অথচ কাবাব মোটেও চট্টগ্রামের খানদানি ঐতিহ্য নয়। এটি ধীরে ধীরে জায়গা করে নিয়েছে চট্টগ্রাম নগরবাসীর খাদ্যতালিকায়।

দশম শতাব্দীর বিখ্যাত লেখক ইবনে সায়ার আল–ওয়াররাখ তাঁর কিতাব আল–তাবিখ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, কাবাব মূলত পারস্য, ইরাক আর আরবের ঐতিহ্যবাহী পদ। ফারসিতে কেবাব থেকে কাবাব শব্দের উৎপত্তি। ফারসি কেবাবের অর্থ ভাজা খাবার। ইতিহাসবিদদের অনেকের মতে, নবম শতাব্দীতে মধ্যপ্রাচ্যের সমরখন্দ শহরে কাবাবের উৎপত্তি। সেখান থেকে তুরস্কের ওসমানিয়া বা অটোমান সম্রাটদের আভিজাত্যে লালিত হয়ে কাবাব হয়ে উঠেছে বৈচিত্র্যময় ও দুর্দমনীয়।

পারস্য, মধ্যপ্রাচ্য হয়ে সপ্তদশ শতাব্দীতে কাবাব ঢুকে পড়ে ভারতে। বাংলাদেশে পুরান ঢাকাকে বলা যায় কাবাবের রাজধানী। সাদ উর রহমান রচিত ঢাকাই খাবার ও খাদ্য সংস্কৃতি বইয়ে এর বিশদ বিবরণও পাওয়া যায়। পুরান ঢাকার টিকিয়া, জালি কাবাব, শামি কাবাব, বিফ কিমা, মাটন কিমা, শিক কাবাব, বিফ চাপ, চিকেন চাপ, মাটন চাপ, সুতি কাবাবের সুখ্যাতির কথা খাদ্যরসিকদের অজানা নয়।

চট্টগ্রামে কাবাব জনপ্রিয় করে তুলেছে স্টেডিয়ামপাড়ার রেস্তোরাঁগুলো। আশির দশকের কথা। ঘরের বড়দের সঙ্গে স্টেডিয়ামে আমরা যেতাম কাবাব খেতে। স্টেডিয়াম এলাকার সার্কিট হাউসের সামনের খোলা মাঠে কাবাবের রেস্তোরাঁগুলোর টেবিল–চেয়ার পাতা থাকত। সবচেয়ে বিখ্যাত দারুল কাবাব এখনো বহাল তবিয়তে টিকে আছে। দারুল কাবাবের শিক কাবাব, টিকিয়া, ব্রেন ফ্রাইয়ের স্বাদ ভোলার মতো নয়।

চট্টগ্রামের ধাবা, তাভা, বারকোড, রয়েল হাট, দারুল কাবাব, রোদেলা বিকেলসহ বেশ কিছু রেস্তোরাঁর কাবাব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। রমজান উপলক্ষে নানা স্বাদের কাবাবও রাখছে তারা ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখে। এসব রেস্তোরাঁয় সর্বনিম্ন ৪৫ টাকা থেকে হাজার টাকা দামের কাবাব আছে। এসব কাবাবের রকমফের আর স্বাদের তারতম্য জানতে আমরা গিয়েছিলাম স্টেডিয়ামপাড়ার ‘তানুর কেবাব’–এর তরুণ শেফ মাসুদ রানার কাছে। তিনি জানালেন, কেবল কাবাব খেতেই ইফতারের সময় তাঁদের রেস্তোরাঁয় প্রতিদিন প্রচুর মানুষ ভিড় করেন। চেনা কাবাবের পাশাপাশি তাঁদের রেস্তোরাঁর ভাট্টিওয়ালা মোরগ, বিফ পেশোয়ারি, চিকেন রেশমি, বিফ ডালোটি আর কালমি কাবাবের মতো স্বল্প পরিচিত কাবাবও বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

তবে কাবাব যেখানকারই হোক, এ দেশে এসে সেটা খানিক মসলাদার হয়ে ওঠে বলে মনে করেন মাসুদ রানা। রোববার রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে কাজের ফাঁকে গল্প হয় তাঁর সঙ্গে।

তাঁর কাছ থেকে জানা গেল, ইউরোপে কাবাব তৈরি হয় কম মসলায়। কেবল লবণ, গোলমরিচ, মাস্টার্ড পেস্ট আর অলিভ অয়েলে ম্যারিনেট করেই কাবাব তৈরি করেন তাঁরা। তুরস্কের বা আরব দেশে কাবাবে ব্যবহার করা হয় লং, এলাচি, ধনে, জিরা, দারুচিনি, গোলমরিচ আর চিলি ফ্লেকস—এই সাতটি মসলা। অপর দিকে ভারতে এসবের সঙ্গে হলুদ, মরিচ, দইসহ নানা মসলা যুক্ত হয়েছে।

তুর্কি বা আরবি কাবাব এখানকার অনেকেরই ভালো লাগে না কম মসলার কারণে। তাই নামে তুর্কি কাবাব হলেও সেসবের সঙ্গে এখানকার লোকজনের পছন্দসই মসলা যোগ করতে হয় বলে জানালেন মাসুদ।

পত্রিকার পাতায় কাবাব নিয়ে এই ‘ব্রিফ স্টোরি’ পড়ে মন ভরবে না ভোজনরসিকদের। তাঁরা চেঁচিয়ে বলবেন, পশ্চিমের টি বোন স্টেক, ডোনার কাবাব বা কাশ্মীরি গুস্তাবা কিংবা গ্রিলড টুনা ফিশের কথা তো উঠল না। তাঁদের জন্য শেফ মাসুদ রানার একটা রেসিপি দিয়ে শেষ করা যাক। দিন শেষে বলতে পারবেন, যাক, লেখাটা থেকে অন্তত একটা কিছু পাওয়া গেল। চাইলে ইফতারে এই নতুন মেনু যুক্তও করতে পারেন।

মাসুদ রানার অন্যতম পছন্দের কাবাব হচ্ছে কালমি কাবাব। হালকা মসলাদার এই কাবাবে কামড় বসালে মাংসের নরম স্বাদে মন জুড়িয়ে যাবে। এই কাবাব তৈরির জন্য লাগবে আদা, রসুন, টক দই, কাঁচা মরিচ, লবণ, শর্ষের তেল আর মুরগির লেগ পিস। সব মসলা দিয়ে মুরগির লেগ পিস ম্যারিনেট করে রাখতে হবে দুই ঘণ্টা। তারপর কয়লার স্লো ফ্লেমে ২০ মিনিট রাখলেই হয়ে যাবে সুস্বাদু কালমি কাবাব।