তিন কারণে শিক্ষিত তরুণেরা গ্রাম ছাড়ছেন

অভিবাসী শ্রমিকপ্রতীকী ছবি

দেশের গ্রামীণ জনপদ থেকে যাঁরা কাজের সন্ধানে শহরে বা বিদেশে পাড়ি জমান, তাঁরা কি কেবল অভাবের তাড়নায় যান, নাকি এর পেছনে শারীরিক সক্ষমতা ও শিক্ষার কোনো যোগসূত্র আছে?

দীর্ঘ ২১ বছর ধরে চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী রোগব্যাধি নেই, এমন সুস্থ তরুণেরাই অভিবাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে। অর্থাৎ অসুস্থতা মানুষকে নিজের শিকড়ে আটকে রাখে। দেখা গেছে, শিক্ষিত মানুষেরাই গ্রাম ছেড়ে যাচ্ছেন বেশি। শিক্ষা তাঁকে ডানা মেলতে সাহায্য করে আর গ্রাম পড়ে থাকে শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা মানুষ নিয়ে।

জনসংখ্যাতাত্ত্বিকদের মধ্যে ‘হেলদি মাইগ্র্যান্ট ইফেক্ট’ বা ‘সুস্থ অভিবাসী প্রভাব’ নামের একটি ধারণা চালু আছে। এ ধারণার মূলকথা হচ্ছে, সুস্থরাই অভিবাসী হয় এবং সেই অভিবাসনের একটি প্রভাব আছে। এই ধারণা বাংলাদেশে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিংহামটন ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা একটি যৌথ গবেষণা চালিয়েছেন। বিজ্ঞান সাময়িকী হেলিওন ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর ‘সুস্থ মানুষ কি বেশি অভিবাসী হয়? বাংলাদেশের একটি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ২১ বছরের ফলোআপ স্টাডি’ শিরোনামে গবেষণা প্রকাশ করে।

জনসংখ্যাবিদ ও আইসিডিডিআরবির সহযোগী বিজ্ঞানী মো. মঈনউদ্দিন হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা দেখেছি, সম্ভাবনাময় তরুণদের একটি বড় অংশ শহর ও বিদেশে উন্নত শিক্ষা ও ভালো কাজের জন্য চলে যাচ্ছে। গবেষণার ফল এই ইঙ্গিত দেয় যে এই ছেড়ে যাওয়া তুলনামূলকভাবে সুস্থ ও সক্ষম গ্রামীণ মানুষদের মধ্যেই বেশি। এই নীরব প্রস্থান ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে গ্রামীণ জীবন—মেধা ও সক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে আর কমে যাচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করা মানুষের সংখ্যা।’

গবেষণায় শারীরিক অবস্থাকে তিনটি মানদণ্ডে বিচার করা হয়েছে—দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা (গত ১২ মাসের তথ্য), তীব্র বা সাময়িক অসুস্থতা (গত ১ মাসের তথ্য) এবং ব্যক্তির নিজের দৃষ্টিতে তাঁর স্বাস্থ্য কেমন (সেলফ-রেটেড হেলথ)।

গবেষণাপদ্ধতি ও এলাকা

গবেষণাটি চালানো হয়েছে চাঁদপুরের মতলবে। আইসিডিডিআরবির ‘মতলব হেলথ অ্যান্ড ডেমোগ্রাফিক সার্ভিল্যান্স সিস্টেম (এইচডিএসএস)’ এলাকার তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে এই দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ করা হয়। ১৯৯৬ সালে পরিচালিত ‘মতলব হেলথ অ্যান্ড সোশিও–ইকোনমিক সার্ভে (এমএইচএসএস)’ থেকে ৩ হাজার ৭৫৬ তরুণ-তরুণীর (বয়স ১৮-৩৪ বছর) স্বাস্থ্যের তথ্য নেওয়া হয়। এরপর টানা ২১ বছর (১৯৯৬-২০১৭) তাঁদের গতিবিধি ও অভিবাসনের তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

গবেষণায় শারীরিক অবস্থাকে তিনটি মানদণ্ডে বিচার করা হয়েছে—দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা (গত ১২ মাসের তথ্য), তীব্র বা সাময়িক অসুস্থতা (গত ১ মাসের তথ্য) এবং ব্যক্তির নিজের দৃষ্টিতে তাঁর স্বাস্থ্য কেমন (সেলফ-রেটেড হেলথ)।

মূলত দীর্ঘস্থায়ী রোগই মানুষকে শারীরিকভাবে অযোগ্য করে তোলে এবং আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়, ফলে তিনি অজানার উদ্দেশে পাড়ি জমানোর ঝুঁকি নিতে চান না।

অসুস্থতা বাধার দেয়াল

গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যাঁদের কোনো ধরনের দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা (যেমন দীর্ঘদিন ধরে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা দুর্বলতা) নেই, তাঁদের তুলনায় অসুস্থ ব্যক্তিদের এলাকা ছাড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, যাঁদের একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা আছে, তাঁদের অভিবাসনের সম্ভাবনা সুস্থদের চেয়ে ১৮ শতাংশ কম আর যাঁদের দুই বা ততোধিক স্বাস্থ্য সমস্যা আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই হার ২৭ শতাংশ কম।

তবে জ্বর-কাশি বা ডায়রিয়ার মতো সাময়িক বা তীব্র অসুস্থতা অভিবাসনের সিদ্ধান্তে দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রভাব ফেলে না। মূলত দীর্ঘস্থায়ী রোগই মানুষকে শারীরিকভাবে অযোগ্য করে তোলে এবং আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়, ফলে তিনি অজানার উদ্দেশে পাড়ি জমানোর ঝুঁকি নিতে চান না।

পারিবারিক সম্পদের পরিমাণ যাঁদের বেশি, তাঁদের আন্তর্জাতিক অভিবাসনের হারও বেশি। এ থেকে বোঝা যায় যে খরচ মেটানোর সক্ষমতা অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় বড় ভূমিকা রাখে।

নারী-পুরুষ ও বয়সের বিভাজন

গবেষণায় দেখা গেছে, অভিবাসনের ক্ষেত্রে পুরুষের হার (৫৭ শতাংশ) নারীর (৩১ দশমিক ৫ শতাংশ) তুলনায় অনেক বেশি। পুরুষেরা মূলত অর্থনৈতিক কারণে ঘর ছাড়েন আর নারীদের ক্ষেত্রে বড় কারণ বিয়ে। শিক্ষার প্রভাব এখানে অত্যন্ত স্পষ্ট; যাঁরা উচ্চশিক্ষিত, তাঁদের মধ্যে গ্রাম ছেড়ে শহরে বা বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী ব্যক্তিরাই সবচেয়ে বেশি অভিবাসী হন।

ধর্মীয় পরিচয়ের দিক থেকে মুসলিমদের মধ্যে অভিবাসনের হার হিন্দুদের তুলনায় কিছুটা বেশি পাওয়া গেছে। এ ছাড়া পারিবারিক সম্পদের পরিমাণ যাঁদের বেশি, তাঁদের আন্তর্জাতিক অভিবাসনের হারও বেশি। এ থেকে বোঝা যায় যে খরচ মেটানোর সক্ষমতা অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় বড় ভূমিকা রাখে।

শিক্ষিতরাই বেশি ঘর ছাড়ছেন

গবেষণার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিক্ষার স্তরের সঙ্গে গ্রাম থেকে বাইরে যাওয়ার সম্পর্ক গভীর। যাঁরা কোনো দিন স্কুলে যাননি বা প্রাথমিক স্তরেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছেন, তাঁদের তুলনায় উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে এলাকা ছাড়ার প্রবণতা অনেক বেশি। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শিক্ষার প্রতিটি অতিরিক্ত বছর একজন তরুণের অভিবাসনের সম্ভাবনাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।

কেন শিক্ষিতরাই বেশি ঘর ছাড়ছেন? গবেষকদের মতে, এর পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করে। উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব, সামাজিক সচলতা ও তথ্যের সহজলভ্যতা।

শিক্ষিতদের এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার বিষয়টি গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের জায়গা তৈরি করেছে। গ্রামের মেধাবী ও শিক্ষিত অংশটি যদি ক্রমাগতভাবে এলাকা ছেড়ে চলে যায়, তবে গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো দক্ষ মানুষের অভাব দেখা দিতে পারে।

গবেষণার ফল এই ইঙ্গিত দেয় যে এই নীরব প্রস্থান ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে গ্রামীণ জীবন—মেধা ও সক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে। কমে যাচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করা মানুষের সংখ্যা।
মো. মঈনউদ্দিন হায়দার, আইসিডিডিআরবির সহযোগী বিজ্ঞানী

যদিও তারা বাইরে থেকে যে প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) পাঠায়, তা পরিবারের সচ্ছলতা ফেরায়; কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে মেধার এই ‘বহিঃপ্রবাহ’ দীর্ঘ মেয়াদে গ্রামীণ অর্থনীতিতে একধরনের শূন্যতা তৈরি করছে।

গবেষণার তথ্যের সঙ্গে মিল আছে মতলব দক্ষিণ উপজেলার নওগাঁও গ্রামের মজিবুল হকের পরিবারের ঘটনার। মজিবুল কাজ করতেন বাংলাদেশ রেলওয়েতে। তাঁর আট ছেলে, সবাই উচ্চশিক্ষিত। তাঁরা প্রকৌশলী, চিকিৎসক, জজ, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, উকিল—কেউই গ্রামে থাকেন না। একজন থাকেন মতলব পৌরসভা এলাকায়, বাকিরা ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে। গ্রামের সঙ্গে তাঁদের কারও যোগাযোগ নেই।

অভিবাসন নিয়ে কাজ করেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান। গবেষণার বিষয়বস্তু ও ফলাফল বিষয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গবেষণার এই তথ্য ঠিক যে ধনী, শিক্ষিত ও সুস্থদের মধ্যে অভিবাসন বেশি। তবে এ কথাও ঠিক যে প্রবাসী আয় বা শহর থেকে পাঠানো অর্থ গ্রামে বা পরিবারের অবস্থা ফেরায়। আবার কিছু নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগও দরিদ্রদের অভিবাসনে বাধ্য করে। নীতিনির্ধারণে এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ।

[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন প্রথম আলোর মতলব প্রতিনিধি মুহাম্মদ জাকির হোসেন]