‘মা চাকরি করলে সন্তানের দুর্ভোগ হয়’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বেশ কয়েকবার একটি পোস্ট নজর পড়েছে, যা অনেকটা এ রকম—এক শিশু তার মাকে প্রশ্ন করছে, ‘মা, তুমি কেন আলমারিতে তালা দিয়ে বাইরে যাও? মা বলছেন, যাতে বুয়ারা দামি জিনিস চুরি করতে না পারে। সন্তান তখন কাঁদতে কাঁদতে বলল, মা তুমি তো আমাকে বুয়ার কাছে একা রেখে যাও। তাহলে আমি তোমার সবচেয়ে দামি জিনিস নই?’

default-image

এ মাসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা নিয়ে প্রথম আলোতে একাধিক প্রতিবেদন ও লেখা ছাপা হয়েছে। ডব্লিউইএফের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বে নারী-পুরুষের অসমতার হার আগের চেয়ে কমে দাঁড়িয়েছে ৬৮ শতাংশে। অর্থাৎ সমতার দিকে এগোচ্ছে বিশ্ব। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে নারী–পুরুষ সমতায় বাংলাদেশে সবার শীর্ষে। তবে সারা বিশ্বে পূর্ণ সমতা অর্জনে লাগবে ১৩২ বছর। বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে লাগবে আরও বেশি—১৯৭ বছর। গতকাল প্রথম আলোয় ‘আমরা সবচেয়ে “খারাপ ছাত্রদের” দলে প্রথম হয়েছি’ শীর্ষক নবনীতা চৌধুরীর লেখায় বিষয়টিকে সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের শীর্ষে থাকাটাকে এভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

নারী–পুরুষ সমতা অর্জনে কেন এত বেশি সময় লাগবে, তার বিস্তারিত একটি চিত্র পাওয়া গেছে সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর ‘গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট ২০২২ (বৈশ্বিক শিক্ষা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন)’ প্রতিবেদনে।

একটি মেয়ে পেশায় যুক্ত না হলে তাঁর পড়াশোনা করাটাই অর্থহীন। অনেক পরিবার মেয়ের ভালো বিয়ে দিতে পড়াশোনা করায়। অনেক মেয়ের শ্বশুরবাড়ি তাঁকে চাকরি করতে দিতে চায় না।
অধ্যাপক পারভীন হাসান, উপাচার্য, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি

ইউনেসকোর প্রতিবেদনে ‘ওয়ার্ল্ড ভ্যালুস সার্ভে’–এর ৮৪টি দেশের ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের তথ্য–উপাত্ত তুলে ধরা বলা হয়, বিশ্বের ৪৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ মনে করেন, মা চাকরি বা ঘরের বাইরে কাজ করলে সন্তানের দুর্ভোগ হয়। বাংলাদেশে এ হার ৮৭ শতাংশ। বিশ্বে বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি মানুষ মনে করেন, মা চাকরি করলে সন্তানের দুর্ভোগ হয়। বলিভিয়া ও জর্ডানের অবস্থাও একই। পাকিস্তানে এ হার ৭৯ শতাংশ। এমন মতের পক্ষে সবচেয়ে কম মানুষ (৮ শতাংশ) পাওয়া গেছে ডেনমার্কে। এরপরের অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ও জনবহুল দেশ ইন্দোনেশিয়া (১১ শতাংশ)। এ ছাড়া জাপান, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে, যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস, কানাডা, এস্তোনিয়া ও আফ্রিকার দেশ কেনিয়ার বেশির ভাগ মানুষ এ মতের সঙ্গে একমত নন। এ ইস্যুতে প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শুধু বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের তথ্য ছিল।

নারীর চাকরির বিষয়ে ইউনেসকোর প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে শিক্ষাসচিব মো. আবু বকর ছিদ্দীক প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রশ্নের ধরনের ওপর একেক বিষয়ে একেক মনোভাব প্রকাশ পায়। দেশের এত বেশিসংখ্যক মানুষ নারীর কাজের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন বলে আমি মনে করি না। একটা সময় মেয়েদের বাইরে কাজ করা দুরূহ ছিল, এখন সেই পরিস্থিতি নেই। অনেক ক্ষেত্রে শিশুসন্তান রেখে বাইরে কাজ করতে অনেক মায়ের কষ্ট হয়, সন্তানেরও অসুবিধা হয়। কারণ, এখানে এখনো প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে দিবাযত্ন কেন্দ্র ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।’

‘স্বামীর চেয়ে উপার্জন বেশি হওয়া উচিত নয়’

ইউনেসকোর প্রতিবেদনে বাংলাদেশে নারীদের মধ্যেও পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। সেই বিষয়টি ধরে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর নারীদের ভাবনা সম্পর্কে জানতে মে মাসে গিয়েছিলাম ধলপুরের নিউ আদর্শ কলোনিতে। কথা হয় কয়েকজন নারীর সঙ্গে।

২৫ বছর বয়সী একজন নারী বলেন, উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় ২০১৪ সালে তাঁর বিয়ে হয়। এখন স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে মা–বাবার সঙ্গে থাকেন। পড়াশোনা করে চাকরি করার ইচ্ছা ছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ি বিয়ের পরপর সন্তান নিতে বলেন। চাকরি করার ব্যাপারে তাঁদের ঘোর আপত্তি। স্বামীর আয়ে সংসারে সচ্ছলতা না থাকলেও তিনি নিজে কখনো চাকরি করার প্রয়োজন বোধ করেননি। এতে সন্তানের অযত্ন হতে পারে। তা ছাড়া তাঁদের পরিবারে পুরুষদেরই উপার্জন করার রেওয়াজ।

বাংলাদেশে নারীদের চাকরিসহ কিছু বিষয়ে পুরুষের মতো দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন অনেক নারী। ইউনেসকোর এক প্রতিবেদনে বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে ২০১৪ সালের এক জরিপের ভিত্তিতে (সূত্র: আসাদুল্লাহ ২০২২) বলা হয়, নারী–পুরুষ অসমতার বিষয়ে মাদ্রাসা পাস শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্কুল পাস শিক্ষার্থীদের তেমন তফাত নেই। ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী সমসংখ্যক ৩২ শতাংশ স্কুল ও মাদ্রাসা পাস নারী মনে করেন, স্বামীর চেয়ে স্ত্রীর উপার্জন কম হওয়া উচিত। ২৮ শতাংশ স্কুল পাস ও ২৪ শতাংশ মাদ্রাসা পাস নারী মনে করেন, স্ত্রীর শিক্ষা স্বামীর চেয়ে কম হওয়া উচিত। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ও শক্তিশালী থাকার জন্য মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের পুষ্টিকর খাবার বেশি প্রয়োজন বলে মনে করেন ২৭ শতাংশ স্কুল পাস ও ২২ শতাংশ মাদ্রাসা পাস নারী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক প্রথম আলোকে বলেন, নারীর ক্ষমতায়নে সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তন আসেনি বলে নারীর মধ্যেও পিতৃতন্ত্রের চর্চা বহাল আছে। তাঁর কাছে মনে হয়, পুরুষের শিক্ষা বেশি থাকলে, পুরুষ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী থাকলে, পুরুষের উপার্জন বেশি থাকলে সংসারে অর্থনীতির চাকা সচল থাকবে।

স্বামীর নির্যাতন নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি

ইউনেসকোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বামীর শারীরিক নির্যাতনকে ন্যায়সংগত বলে করেন ৮ শতাংশ স্কুল পাস ও ৫ শতাংশ মাদ্রাসা পাস নারী। পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বামীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে মনে করেন ১৮ শতাংশ স্কুল পাস ও ২০ শতাংশ মাদ্রাসা পাস নারী।

একটি ঘটনায় প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। ঢাকায় একটি বেসরকারি সংস্থায় প্রথম স্ত্রীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্বামীকে ডাকা হয়। সেখানে কথাবার্তার একপর্যায়ে স্বামী ক্ষিপ্ত হয়ে সবার সামনেই স্ত্রীকে চড়থাপ্পড় মারেন। সংস্থার কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিক পুলিশ ডেকে স্বামীকে ধরিয়ে দেন। পুলিশ স্বামীকে নিয়ে যাওয়ার সময় স্ত্রী পুলিশের পায়ে ধরে স্বামীকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানাতে থাকেন।

এ ব্যাপারে বেসরকারি সংগঠন নারীপক্ষের সদস্য হাবিবুন নেসা প্রথম আলোকে বলেন, অধিকারবঞ্চিত হওয়ার কারণে অনেক নারী চিন্তাচেতনায় স্বাবলম্বী হতে পারেন না। স্বামী তাঁকে ‘খাওয়াতে-পরাতে’ পারবেন কি না, সে খোঁজ নিয়ে বিয়ে দেওয়া হয়। নারীকে শিক্ষা দেওয়া হয়, ‘এটা–সেটা’ মেনে সংসার করতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে নারীও মনে করেন, তিনি শাস্তি পেতেই পারেন।

শিক্ষায় মেয়ের সংখ্যা বাড়ছে, তবে...

ইউনেসকোর প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও পড়াশোনা শেষ করার ক্ষেত্রে ছেলেমেয়েদের মধ্যে অসমতা কমছে। এখন তা ১ শতাংশের কম। তবে ভারত, পাকিস্তানসহ কিছু দেশে মেয়ের চেয়ে ছেলেসন্তানের জন্য শিক্ষায় বেশি খরচ করার প্রবণতা রয়েছে। এসব দেশে অনেক পরিবার ছেলেসন্তানদের বেসরকারি স্কুলে বেশি খরচে পড়ায়। তবে বিপরীত চিত্র দেখা যায় ম্যাকাও, চীন ও হংকংয়ে। অবশ্য সাব–সাহারা আফ্রিকায় অন্য অঞ্চলগুলোর তুলনায় শিক্ষায় সমতার গতি ধীর।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশে শিক্ষায় মেয়েদের সাফল্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ২০০০ সালে নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়ালেখা শেষ করার ক্ষেত্রে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে ৬ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিকে ৯ শতাংশ পিছিয়ে ছিল। ২০২০ সালে নিম্নমাধ্যমিকে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে ১৫ শতাংশ এগিয়ে এবং উচ্চমাধ্যমিকে সমতা এনেছে। নব্বইয়ের দশকে উপবৃত্তি চালু হওয়ার পর এ বড় পরিবর্তন এসেছে। কোভিডে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়ার হার ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের কম।

ইউনেসকোর প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক দশক আগেও বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে শিক্ষায় নারী–পুরুষের অসমতার হার উচ্চ ছিল। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কারণে শিক্ষায় সমতার কাছাকাছি পৌঁছানো গেছে। মাদ্রাসাশিক্ষার ফলে গ্রামের রক্ষণশীল পরিবারের মেয়েরাও শিক্ষায় আসছে। তবে স্কুলের পাঠ্যক্রমের মতো বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মাদ্রাসাশিক্ষা নারী–পুরুষ সমতার কথা বলে না।

‘বড় চাকরি’ করা আমার এক বন্ধুর কথা মনে পড়ে, যাঁকে সংসার শুরুর প্রথম সাত-আট বছর চাকরি ছাড়ার চাপ সামাল দিতে হয়েছে। ধনী স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাঁর চাকরি করা একদমই পছন্দ করতেন না। বন্ধুর স্বামী একবার আমাকেও অনুরোধ করেছিলেন, যেন বন্ধুকে চাকরি ছেড়ে দিতে বলি। তাঁর কথা ছিল, ‘কয় টাকা আর বেতন পায়?’ বন্ধুটি এখন স্বামীর সঙ্গে বিদেশে। এখনো তিনি চাকরি করেন। স্বামী এখন আর চাকরি নিয়ে আপত্তি করেন না।

রাজধানীর সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটির উপাচার্য পারভীন হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি মেয়ে পেশায় যুক্ত না হলে তার পড়াশোনা করাটাই অর্থহীন। অনেক পরিবার মেয়ের ভালো বিয়ে দিতে পড়াশোনা করায়। অনেক মেয়ের শ্বশুরবাড়ি তাকে চাকরি করতে দিতে চায় না। শিক্ষক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন অনেক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি।’

অধ্যাপক পারভীন হাসান বলেন, একটি মেয়ে যাতে তার পছন্দের পেশা বেছে নিতে পারে, সে জন্য মা–বাবা বা স্বামী, শ্বশুরবাড়িকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন