মামুনুর রশীদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি নিজের জীবনকথা বলতে গিয়ে একই সঙ্গে বাংলাদেশের নাট্যচর্চা, টেলিভিশনের বিকাশ, মুক্তিযুদ্ধ এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাসও তুলে ধরেন। ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস তাঁর কথায় একাকার হয়ে যায়।
‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’ শীর্ষক নিয়মিত সাক্ষাৎকারের অংশ হিসেবে আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম তাঁর।
তাঁর মতে, ১৯৩০-এর দশকে একটি মুসলিম পরিবারের মেয়ের নাম ‘রোকেয়া’ রাখা প্রমাণ করে, বেগম রোকেয়ার প্রভাব কতটা বিস্তৃত ছিল। আজও তিনি বেগম রোকেয়ার সুলতানা’স ড্রিম নতুন করে পড়েন এবং এর আধুনিকতা তাঁকে বিস্মিত করে।
১৯৪৮ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কালিহাতীর পাইকড়ায় তাঁর জন্ম। তাঁর ভাষায়, সেটি ছিল তাঁর মাতুলালয়। বাবা হারুনুর রশীদ খান ছিলেন পোস্টমাস্টার। চাকরির কারণে পরিবারকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে হয়েছে। প্রথম লেখাপড়া শুরু হয় ময়মনসিংহের ফুলপুরে। পরে বল্লা ও এলেঙ্গায় পড়াশোনা করেন। ১৯৬৩ সালে বল্লা করোনেশন হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন।
শৈশবের স্মৃতিচারণায় তিনি একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তাঁর মা রোকেয়া খানমের নামকরণ হয়েছিল বেগম রোকেয়ার প্রভাবেই। তাঁর মতে, ১৯৩০-এর দশকে একটি মুসলিম পরিবারের মেয়ের নাম ‘রোকেয়া’ রাখা প্রমাণ করে, বেগম রোকেয়ার প্রভাব কতটা বিস্তৃত ছিল। আজও তিনি বেগম রোকেয়ার সুলতানা’স ড্রিম নতুন করে পড়েন এবং এর আধুনিকতা তাঁকে বিস্মিত করে।
আবদুল্লাহ আল–মামুন, জামান আলী খান ও আমজাদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন। শেষ পর্যন্ত প্রযোজক আবদুল্লাহ ইউসুফ ইমামের উৎসাহে তাঁর প্রথম টেলিভিশন নাটক শেষ অঙ্ক নির্মিত হয়।
বাংলা সাহিত্য নিয়েও তাঁর আগ্রহ স্পষ্ট। বিভূতিভূষণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি বাংলা উপন্যাসের তিন প্রধান স্তম্ভ হিসেবে দেখেন। তাঁর মন্তব্য, সময়মতো আন্তর্জাতিক অনুবাদ হলে তাঁদের বিশ্বস্বীকৃতি আরও বড় হতে পারত।
নাটকের প্রতি তাঁর আকর্ষণ শুরু যাত্রাপালা দেখে। বিশেষ করে সোহরাব-রুস্তম পালা তাঁর ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। প্রথমে অভিনেতার শক্তিতে মুগ্ধ হলেও পরে তিনি উপলব্ধি করেন, নাটকের মূল শক্তি নাট্যকারের হাতে। এই উপলব্ধিই তাঁকে নাটক লেখার দিকে নিয়ে যায়।
ঢাকা পলিটেকনিকে পড়ার সময় ১৯৬৫ সালে তিনি লেখেন তাঁর প্রথম নাটক মহানগরীতে একদিন। নাটকটি পলিটেকনিকে মঞ্চস্থ হয় এবং সাড়া ফেলে। এরপর তিনি ধারাবাহিকভাবে নাটক লিখতে থাকেন। টেলিভিশনের জন্য লেখার সুযোগ পেতে তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। আবদুল্লাহ আল–মামুন, জামান আলী খান ও আমজাদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন। শেষ পর্যন্ত প্রযোজক আবদুল্লাহ ইউসুফ ইমামের উৎসাহে তাঁর প্রথম টেলিভিশন নাটক শেষ অঙ্ক নির্মিত হয়।
তাঁর টেলিভিশনের জন্য লেখা আবার আসিব ফিরে নাটকটি রেডিও নাটক হিসেবে প্রচারিত হয় মৃত্যুহীন প্রাণ নামে। পরে তিনি আরও নাটক লেখেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য।
এরপর তিনি নিয়মিত টেলিভিশনের জন্য লিখতে থাকেন। তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শহীদুল্লা কায়সারের সংশপ্তক-এর নাট্যরূপ। শহীদুল্লা কায়সারের সঙ্গে নিয়মিত বসে তিনি নাট্যরূপ নিয়ে আলোচনা করতেন। নাটকের প্রয়োজনে উপন্যাসের বাইরে কিছু অংশ সংযোজন করা হয়েছিল। পরে নাটকটি দেখে শহীদুল্লা কায়সার সন্তুষ্ট হন এবং সেই সংযোজনগুলো ভবিষ্যৎ সংস্করণে ব্যবহার করার আগ্রহ প্রকাশ করেন বলে মামুনুর রশীদ স্মরণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মামুনুর রশীদ ঢাকায় ছিলেন। ২৫ মার্চের রাত, পরদিনের ধ্বংসযজ্ঞ, জিনজিরা ও আশপাশের এলাকার পরিস্থিতি—সবই তিনি প্রত্যক্ষ করেন। পরে টাঙ্গাইলে ফিরে কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। স্থানীয়ভাবে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার ঘটনাও তিনি স্মরণ করেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি ভারত যান। আগরতলা হয়ে কলকাতায় পৌঁছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন। সেখানে তাঁর টেলিভিশনের জন্য লেখা আবার আসিব ফিরে নাটকটি রেডিও নাটক হিসেবে প্রচারিত হয় মৃত্যুহীন প্রাণ নামে। পরে তিনি আরও নাটক লেখেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য।
তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি নির্মলেন্দু গুণ ও আবুল হাসানকে ঘিরে। নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে পরিচয়ের পর তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। পরে এলিফ্যান্ট রোডের একটি ভাড়া বাসায় একসঙ্গে থাকতেন তিনজন। সেই সময় নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন হুলিয়া, আবুল হাসান লিখছেন তাঁর প্রথম দিকের কবিতা। মামুনুর রশীদের ভাষায়, তাঁদের সাহিত্যচর্চা ও পারস্পরিক সম্পর্ক কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল তাঁর।
আরণ্যকের প্রথম প্রযোজনা ছিল মুনীর চৌধুরীর কবর। তাঁর মতে, স্বাধীন বাংলাদেশে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের সূচনায় এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নাট্যচর্চা ও আরণ্যক
স্বাধীনতার পর নাট্যচর্চাকে সংগঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় আরণ্যক। কলকাতায় অবস্থানকালে উৎপল দত্ত, শম্ভু মিত্র ও অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাটক দেখে তাঁরা নিয়মিত গ্রুপ থিয়েটার গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। দেশে ফিরে সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হয়। আরণ্যকের প্রথম প্রযোজনা ছিল মুনীর চৌধুরীর কবর। তাঁর মতে, স্বাধীন বাংলাদেশে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের সূচনায় এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নিজের নাটকগুলোর মধ্যে তিনি নির্দিষ্টভাবে এখানে নোঙর, শ্বেতকাহিনী, একটি সেতুর গল্প, বাঁচা, ওরা কদম আলী, ওরা আছে বলেই এবং ইবলিশ-এর কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বিশেষ করে ওরা কদম আলী এবং পরবর্তী দুটি নাটক ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে উল্লেখযোগ্য আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
আলাপের শেষ দিকে আলোচনায় আসে বর্তমান বাংলাদেশ নিয়ে। তিনি বলেন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও খেলাধুলার চর্চা বাড়ানোর উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। নিজের ছাত্রজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি গ্রামীণ স্কুলের নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকদের কথা স্মরণ করেন, যাঁরা সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতেন।
ধর্ম ও রাজনীতি প্রসঙ্গে তাঁর পর্যবেক্ষণও স্পষ্ট। তাঁর মতে, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে দুর্বল করেছে। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ যে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রচিন্তার জন্ম দিয়েছিল, সেই চেতনাকে ধরে রাখা প্রয়োজন।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আলোকিত মানুষ চাই’—এই ধারণা এখনো সমান প্রাসঙ্গিক। তাঁর মতে, বই পড়া, সংস্কৃতিচর্চা এবং মুক্তবুদ্ধির বিকাশই বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ।
মামুনুর রশীদের জীবনকে শুধু একজন নাট্যকারের জীবন হিসেবে দেখলে পূর্ণ ছবি পাওয়া যায় না। তাঁর অভিজ্ঞতার মধ্যে বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, টেলিভিশন নাটকের বিকাশ এবং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের কয়েক দশকের বিবর্তনের একটি ধারাবাহিক দলিলও পাওয়া যায়।