ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করতে বুধবার ঢাকায় আলোচনা শুরু হচ্ছে। ঢাকার কর্মকর্তারা আশা করছেন, জুনের মধ্যে অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি (পিসিএ) সইয়ের জন্য দুই দিনের এবারের বৈঠকটি হবে শেষ দফা আলোচনা। এটি সইয়ের মধ্য দিয়ে ইউরোপের ২৭ দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে সম্পর্কের গুণগত উত্তরণের আশা করছে বাংলাদেশ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বুধবার ঢাকায় অনুষ্ঠেয় বৈঠকে যোগ দিতে ইইউর বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পাওলা প্যাম্পালোনি মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকায় এসেছেন। বৈঠকে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্ব দেবেন। আলোচনায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলকে নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব ও পশ্চিম) মো. নজরুল ইসলাম।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বুধবার দুপুরে দুই দেশের প্রতিনিধিরা পঞ্চম বা শেষ দফা আলোচনার জন্য বসবেন। তাঁরা আশা করছেন, চার দফা আলোচনা শেষে আগামী দুই দিন ঢাকা ও সিলেটে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে দুই পক্ষে ৮৩টি ধারা–সংবলিত পিসিএর খসড়া চূড়ান্ত হতে পারে। এরপর কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামী জুনের মধ্যে চুক্তিটি সইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবার পঞ্চম বা শেষ দফা আলোচনার মাধ্যমে পিসিএর খসড়া প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গেলে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ করতে মাস দুয়েক সময় নিতে পারে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এরপর বাংলাদেশের কাছে তা পাঠানো হবে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠন হলে প্রক্রিয়াগত বিষয়গুলো চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
গত বছরের এপ্রিলে ব্রাসেলসে পিসিএর খসড়া চূড়ান্ত করার জন্য প্রথম দফা আলোচনায় বসেছিল দুই পক্ষ। এরপর ভার্চ্যুয়ালি জুলাই ও অক্টোবরে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ দফা আলোচনা হয়েছিল। প্রসঙ্গত, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে ইইউর সঙ্গে পিসিএ স্বাক্ষরকারী প্রথম দেশ। বৃহত্তর পরিসরে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড আর কাজাখস্তানের সঙ্গে পিসিএ সই করেছে ইইউ। বাংলাদেশের সঙ্গে ইইউর প্রস্তাবিত পিসিএতে সহযোগিতার অন্তত ৩৫টি ক্ষেত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও কাজাখস্তানের সঙ্গে সই করা ইইউর পিসিএতে খাতের সংখ্যা যথাক্রমে ১৩, ১৫ ও ১৯।
প্রায় ২৫ বছর আগে ২০০১ সালে বাংলাদেশ ও ইইউর মধ্যে একটি সহযোগিতা চুক্তি হয়েছিল, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল উন্নয়ন–সহায়তা। নতুন পিসিএ চুক্তির মাধ্যমে সেই সম্পর্ককে আরও গভীর, বহুমাত্রিক ও রাজনৈতিকভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় দুই পক্ষ।
পিসিএ কী এবং এর গুরুত্ব
ইইউর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পিসিএ হলো আইনগত বাধ্যতামূলক চুক্তি, যা ইইউ ও একটি অংশীদার দেশের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি রূপরেখা প্রতিষ্ঠা করে।
অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে ইইউ অংশীদার দেশগুলোতে রাজনৈতিক সংলাপ, শান্তি ও নিরাপত্তা, সুশাসন ও মানবাধিকার, বাণিজ্য, অর্থনীতি, আর্থিক সহযোগিতাসহ নানা বিষয় এর মধ্যে থাকে। অর্থাৎ এই সহযোগিতার পরিধিতে রয়েছে গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সমর্থন করা। একটি শক্তিশালী মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং ব্যবসা ও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশের বিকাশ নিশ্চিত করা। নানা ক্ষেত্রে বাণিজ্য সম্পর্ক ও সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়টিও এর অন্তর্ভুক্ত।
অংশীদারত্ব চুক্তিতে যা থাকছে
বাংলাদেশের সঙ্গে ইইউর প্রস্তাবিত পিসিএর আওতায় আইনের শাসন, সুশাসন, মানবাধিকার, শ্রম অধিকার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সংযুক্তি, মুদ্রা পাচার রোধ, নিরাপত্তা, অন্তর্জাল নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি, মৎস্য, দক্ষ অভিবাসন, কৃষিসহ প্রায় ৩৫টি খাত রয়েছে।
পিসিএ চুক্তি সই হলে ইইউর সঙ্গে বাংলাদেশের যে সহযোগিতা চুক্তি রয়েছে, তা আর কার্যকর থাকবে না। প্রসঙ্গত, ২০০১ সালে ইইউর সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি সই করে বাংলাদেশ। সেই চুক্তিতে অর্থনীতি, উন্নয়ন, সুশাসন ও মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
রাজনৈতিক উত্তরণের অভিপ্রায়
বাংলাদেশ ও ইইউর মধ্যে সম্পর্কের পরিসর বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবর নতুন করে ইইউ-বাংলাদেশ অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। ব্রাসেলসে ওই অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ইউরোপিয়ান কমিশনের (ইসি) প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন উপস্থিত ছিলেন।
এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির প্রথম দফার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় পিসিএ চুক্তির আলোচনা স্থগিত করেছিল ইইউ। পরবর্তী সময়ে ইইউ অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে পিসিএ সই করার সিদ্ধান্ত নিলে নভেম্বরে ঢাকায় অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছিল।