ব্র্যাকে আরও তিনটি শিখন তরি, শিশুদের মধ্যে তৈরি হবে জানার আগ্রহ

নারায়ণগঞ্জের বন্দরে শীতলক্ষ্যা নদীতে পাশাপাশি রাখা ছিল তরিগুলো। ১৫ জুনছবি: প্রথম আলো

ল্যাপটপের সামনে বসে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআইকে একজন নারী শিক্ষা সহায়তাকারী (ফ্যাসিলিটেটর) বললেন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ের একটি ছবি দাও। কিছু সময় পরেই মুক্তিযুদ্ধের ছবি ভেসে উঠল ল্যাপটপে। ঘটনা কী বা কীভাবে ঘটল তা দেখতে মনোযোগী হয়ে উঠল আশপাশের কয়েকজন শিক্ষার্থী।

অন্যদিকে ট্রে আকৃতির একটি কাঠের ফ্রেমের মধ্যে রাখা হয়েছে পুঁতির মতো ছোট ছোট দানা। এগুলো খুঁড়লেই বেরিয়ে আসছে বিভিন্ন তথ্য লেখা কার্ড। শিশুরা একসময় এভাবে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার বা অন্য কিছু আবিষ্কার করে ফেলছে। খেলতে খেলতে শিশুরা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো কঠিন বিষয়টিও সহজে বুঝে ফেলছে। ততক্ষণে জীববৈচিত্র্য, দূষণসহ নানান বিষয়ে শিশুদের মাথায় ঘুরছে নানান প্রশ্ন।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন তরির বহরে যুক্ত হওয়া পরিবেশ তরি, ডিজিটাল তরি আর ইতিহাস তরি এই শিশুদের মনোজগতে এই পরিবর্তনগুলো ঘটাচ্ছে।

আজ সোমবার নারায়ণগঞ্জের কদমরসুল দরগাহ মাঠে নতুন শিখন তরিগুলো ফিতা কেটে উদ্বোধন করেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্। শিখন তরির কার্যক্রম ও উপকরণগুলো বিশেষভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য সাজানো হয়েছে, তবে অন্যান্য শিক্ষার্থী এবং দর্শকেরাও এখানে শেখার আনন্দ অনুভব করতে পারবেন।

নারায়ণগঞ্জের বন্দরে শীতলক্ষ্যা নদীতে পাশাপাশি রাখা ছিল তরিগুলো। শিশুদের আকৃষ্ট করার জন্য তরিগুলোকে দৃষ্টিনন্দনভাবে সাজানো হয়েছে। তরিগুলোর ভেতরে রয়েছে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকের সহায়তায় শিশুদের নানা বিষয়ে শেখানোর ব্যবস্থা।

তবে এখানে শিশুরা কোনো কিছু মুখস্থ করবে না, হাতে-কলমে শিখবে বা পর্যবেক্ষণ করবে। তরিগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম শিশুদের শুধু আনন্দ দেবে না, বৈষম্য, মুখস্থনির্ভর শিক্ষা ও সুযোগের অসমতাসহ শিক্ষাব্যবস্থার একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতেও সহায়তা করবে বলে বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

দুর্গম ও নদীভাঙন এলাকা অথবা হাওরাঞ্চলের শিশুদের জন্য নতুন তিনটি তরিসহ ব্র্যাকের শিখন তরির সংখ্যা দাঁড়াল ৬। আগের তিনটি তরির বিষয়বস্তু ছিল গণিত, মূল্যবোধ আর বিজ্ঞান।

পুঁতির মতো দানাগুলো খুঁড়লেই বেরিয়ে আসছে বিভিন্ন তথ্য লেখা কার্ড। শিশুরা একসময় এভাবে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার বা অন্য কিছু আবিষ্কার করে ফেলছে। ১৫ জুন
ছবি: প্রথম আলো

কদমরসুল দরগাহ মাঠে তরিগুলোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এলাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকেরা উপস্থিত ছিলেন। এ অনুষ্ঠানে ব্র্যাকের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও মাইগ্রেশন কর্মসূচির পরিচালক সাফি রহমান খান জাদুঘর দেখেছে কি না জানতে চাইলে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই না বলে জানাল। অনুষ্ঠানের পর একেক তরিতে গিয়ে এই শিক্ষার্থীরা অবাক হয়ে যাচ্ছিল। রোবটের হাতকে নির্দেশ দিলে তা মানছে, বই কার্যক্রমে ডিভাইস ক্যামেরা বইয়ের পাতার দিকে ধরলে বাঘ, হাতি, মানবদেহ, রকেট, সৌরজগৎ থ্রিডি মডেলে জীবন্ত হয়ে উঠছে। শুধু দেশের মধ্যে নয়, রহস্যময় কম্পাস নিয়ে আলতামিরা গুহা, পিরামিড বা তাজমহলের মতো ঐতিহাসিক স্থানগুলোও ঘুরে আসা যাচ্ছে। বিভিন্ন লেখায় রুমান আর ঋতু নামের দুই শিক্ষার্থী কোডিং, প্রযুক্তিতে সমতা, অনলাইন নিরাপত্তা, সাইবার বুলিংসহ কত–কিছু নিয়ে যে কথা বলে যাচ্ছে। বিষয়ভিত্তিক তরিগুলোর ভেতরে নিজের ঘরের মতো করেই পৃথিবীর যত্ন নিই, নদী রক্ষা করি এমন নানান কথা লেখা রয়েছে।

ব্র্যাকের কর্মকর্তারা বললেন, তরিগুলোতে শিক্ষা উপকরণগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যা শিশুদের কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্ বলেন, ‘একসময় ভাবতাম পড়াশোনা করতে হবে, পরীক্ষায় ভালোভাবে পাস করলে ভালো চাকরি পাওয়া যাবে এটাই হচ্ছে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য যখন বিদেশ গেলাম, তখন সেখানে গিয়ে দেখি মুখস্থ বিদ্যায় কোনো লাভ নেই। বাস্তব জীবনের সমস্যাকেও অঙ্কের মাধ্যমে সমাধান করতে বলা হয়।’

ফিতা কেটে নতুন শিখন তরীগুলো উদ্বোধন করেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্‌। ১৫ জুন
ছবি: প্রথম আলো

আসিফ সালেহ্ বলেন, মুখস্থবিদ্যা দিয়ে হয়তো পরীক্ষায় পাস করা যায়, কিন্তু বাস্তব জীবনে সমস্যার সমাধান করা যায় না। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বড় ঘাটতি হলো শ্রেণিকক্ষে শেখার সঙ্গে বাস্তব জীবনের সংযোগটি শিক্ষার্থীদের সামনে স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয় না। শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে সমস্যা সমাধানের জন্য যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এই কর্মকর্তা।

ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির হেড অব সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজেস নিভিন রেজা বলেন, হাওর ও নদীবেষ্টিত অঞ্চলের শিশুদের জন্য এই তরিগুলো গল্প বলা অথবা হাতে-কলমে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের ক্ষেত্র হয়ে উঠবে। তরিগুলো থেকে শিক্ষার্থীরা অনেক তথ্য নিয়ে বাড়ি যাবে তা নয়, মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এখানে আসার পর তারা প্রশ্ন করতে শিখবে। কৌতূহল এবং জানার আগ্রহ নিয়ে বাড়ি যাবে। শিশুরা শেখে দেখার মাধ্যমে, স্পর্শ করার মাধ্যমে। পাঠ্যবইয়ে গতানুগতিকভাবে যা লেখা থাকে, শ্রেণিকক্ষে শুধু তা–ই পড়িয়ে গেলে হবে না।

নিভিন রেজা বলেন, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সুনামগঞ্জ থেকে মূল্যবোধ, গণিত আর বিজ্ঞান তরিগুলো যাত্রা শুরু করেছিল। বর্তমানে তরিগুলো ভোলায় অবস্থান করছে। এ পর্যন্ত ৪৬২ জন ফ্যাসিলিটেটর বা প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে ১৬টি জেলায় ৭৭টি স্পট বা জায়গায় অবস্থান করার সময় তরিগুলো থেকে প্রায় ৮০ হাজার শিক্ষার্থী অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে এগুলো কৌতূহল তৈরি করতে পেরেছে বলেই নতুন করে তিনটি তরি এতে যুক্ত হলো।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা শিবানী সরকার বক্তব্য দেন। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাইয়ুম খান এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজমল হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। শেষে তাঁরা শিখন তরিগুলো ঘুরে দেখেন।

ব্র্যাকের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, প্রতিটি তরি একটি এলাকায় সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিন অবস্থান করে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এতে শিশুদের পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় মানুষও অংশ নিতে পারেন। প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তিদের সহজে প্রবেশ নিশ্চিত করতে তৈরি করা হয়েছে বিশেষ র্যাম্প। তরির ভেতরে রাখা হয়েছে হুইলচেয়ার।

শিখন তরীর কার্যক্রম ও উপকরণগুলো বিশেষভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য সাজানো হয়েছে, তবে অন্যান্য শিক্ষার্থী এবং দর্শকেরাও এখানে শেখার আনন্দ অনুভব করতে পারবেন। ১৫ জুন
ছবি: প্রথম আলো

২০১১ সালে ব্র্যাক দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যাপ্রবণ এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে চালু করেছিল শিক্ষাতরি। সেই কার্যক্রম শেষ হয়ে গেলে কয়েকটি তরি রয়ে যায়। ব্র্যাকের ৫০ বছর পূর্তি সামনে রেখে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির উদ্যোগে এই তরিগুলোকে খেলাধুলা ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শেখার জায়গায় রূপান্তর করা হয়। চালু হয় ব্র্যাকের অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন তরি।

তিনটি তরির ভেতরে থাকা কিছু উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম

কদমরসুল দরগাহ মাঠে তরিগুলোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এলাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকেরা উপস্থিত ছিলেন। ১৫ জুন
ছবি: প্রথম আলো

ইতিহাস তরিতে শিশুরা যাতে ইতিহাস মুখস্থ না করে ইতিহাসকে অনুভব করে, সে চেষ্টা করা হয়েছে। আহসান মনজিল, মহাস্থানগড় বা পানাম নগরের অতীত ও বর্তমানের ছবি দেখার পর শিশুরা কোন ছবি কোন স্থানের, তা মেলাতে থাকে। পাজলভিত্তিক এই কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা বুঝতে পারে সময়ের সঙ্গে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর পরিবর্তন ঘটার বিষয়টি। জেলাভিত্তিক রঙিন পাজল ম্যাপে বিভিন্ন জেলার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী স্থানকে পতাকা ও নামফলকের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে। ধাপে ধাপে পাজল সম্পন্ন করতে গিয়ে শিশুরা ষাটগম্বুজ মসজিদের পুরো অবয়ব দেখতে পায়। লালবাগ কেল্লাকেও তুলে ধরা হয়েছে আরেকটি পাজল কার্যক্রমের মাধ্যমে।

পরিবেশ তরিতে পরিবেশের ভারসাম্য, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রিডিউস, রিইউজ, রিসাইকেল বা ৩ আর এর ধারণা, গ্রিনহাউস গ্যাসসহ নানা কার্যক্রম শিশুরা নিজেরাই যাতে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা করতে পারে তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ডিজিটাল তরিতে রোবোটিকস, ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি (ভি আর), অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এ আর), ডিজিটাল স্টোরিটেলিংসহ আছে নানা কার্যক্রম। একজন শিশু ভার্চ্যুয়ালি নিজেকে নভোচারী, চিকিৎসক, ফায়ার সার্ভিসের কর্মী, আইনজীবী বা ক্রিকেটার হিসেবে দেখতে পারবে, সে বিশেষ ব্যবস্থা সেখানে আছে।