তাহলে কি আপনি এখানে একধরনের নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জের কথা বলছেন?

ডেভিড ব্রুস্টার: এ অঞ্চল ঘিরে বিপুল নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এই চ্যালেঞ্জেগুলোর মধ্যে একটির উৎপত্তি ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতা ঘিরে। বিশেষ করে স্নায়ুযুদ্ধের সময় পরাশক্তির প্রতিযোগিতা ছোট দেশগুলোতে যেভাবে অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছিল, তেমনটাই আমরা এখন দেখতে পাই।

স্নায়ুযুদ্ধকালীন দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতা ঘিরে ছোট ছোট দেশে তাদের প্রভাবের কথা বলছেন। এটি কি বিশেষ কোনো দেশের কথা বোঝাতে চাইছেন?

ডেভিড ব্রুস্টার: সাম্প্রতিক সময়ে মালদ্বীপ আর শ্রীলঙ্কার দিকে তাকালেই তো আমরা এই প্রতিযোগিতার স্পষ্ট প্রভাব দেখতে পাই। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম কারণ বড় এই দুই দেশের (ভারত ও চীন) প্রতিযোগিতার ফসল। সবার স্বার্থেই এই প্রতিযোগিতার প্রভাব এড়ানোটা জরুরি। এটি বাদ দিলে জলবায়ুর পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জটি সামনে আসে। এই অঞ্চলের জন্য আমি এটিকে প্রধান নিরাপত্তার ঝুঁকি মনে করি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পুরো অঞ্চলেই অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে। এর ফলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি বাস্তুচ্যুতির মতো নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। অস্ট্রেলিয়া চায় এ অঞ্চলের দেশগুলো এই সমস্যাগুলো দূর করার সক্ষমতা অর্জন করুক। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির ফলে বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা রয়েছে। আমরা একটি সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী বাংলাদেশ দেখতে চাই। ভৌগোলিক অবস্থানের পাশাপাশি বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই এ অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পার। অংশীদারদের সংকটে বাংলাদেশ কী করতে পারে, ২০২০ সালে শ্রীলঙ্কাকে সহায়তার মাধ্যমে সেটা প্রমাণিত হয়েছে।

গত বছর প্রকাশিত ‘নিউ ইন্দোপ্যাসিফিক পার্টনারশিপ: বিল্ডিং অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ সিকিউরিটি টাইজ’ গবেষণাপত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্ক জোরদারের কথা আপনি উল্লেখ করেছেন।

ডেভিড ব্রুস্টার: বাংলাদেশের রপ্তানিকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক মডেল গত কয়েক দশকে বেশ সফল হয়েছে। তাইওয়ান, ভিয়েতনামের মতো সফল দেশের সঙ্গেও আমরা কাজ করেছি। এই দেশগুলোর নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, প্রাকৃতিক সম্পদ সরবরাহের উৎস হিসেবে আমাদের অংশীদারত্ব রয়েছে। তা ছাড়া এসব দেশের পণ্যের নির্ভরযোগ্য বাজার হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়ার সমৃদ্ধির সঙ্গে এর একটা যোগসূত্র রয়েছে। আমাদের নতুন অংশীদারের তালিকার শীর্ষ আছে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশ। জ্বালানির যে সংকট বাংলাদেশ টের পাচ্ছে, তাতে প্রমাণিত হয়েছে নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী তার নেই। এখানে এগিয়ে আসতে পারে অস্ট্রেলিয়া। অর্থনীতির দিক থেকে এটি দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে দেখতে গেলে পুরো অঞ্চল ঘিরে আমরা স্থিতিশীলতা চাই। আমি বাংলাদেশের বৃহত্তর ভূমিকা শুধু অস্ট্রেলিয়াই নয়, অন্যান্য মাঝারি শক্তির দেশগুলোর সঙ্গেও দেখতে আগ্রহী। দুই দেশের অভিন্ন সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বঙ্গোপসাগর ঘিরে অবৈধ মাছ শিকার, মানব ও মাদক পাচার, সামুদ্রিক অপরাধের বিষয়গুলো আছে। এতে অস্ট্রেলিয়ার স্বার্থ জড়িত। বাংলাদেশের বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চলে সামর্থ্য ও নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো অপরিহার্য। এখানে আমরা বাংলাদেশকে সহযোগিতায় আগ্রহী। কারণ, বঙ্গোপসাগরে সমস্যা থেকে গেলে তা আমাদের প্রভাবিত করবে। তাই আমরা এ অঞ্চলে সাগর–মহাসাগর ঘিরে অপরাধকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই।

তার মানে এই অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তার স্বার্থেই বাংলাদেশের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্ক নিবিড় করার যোগসূত্র রয়েছে।

ডেভিড ব্রুস্টার: তা তো বটেই। এখানে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে শ্রীলঙ্কার অংশীদারত্বের প্রসঙ্গটি এসে যায়। গত এক দশকে সামুদ্রিক নিরাপত্তার সামর্থ্য বাড়াতে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করেছে অস্ট্রেলিয়া। মানব পাচার নেমে এসেছে শূন্যের কোঠায়। আমাদের নিজেদের স্বার্থেই সব দেশ যাতে নিজের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিজেই নিশ্চিত করতে পারে, সেটা আমরা চাই।

শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতার আলোকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কথা বললেন। সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালিসহ অনেক দেশই বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতায়, বিশেষত কেনাকাটায় মনোযোগ দিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার নজর কি কেনাকাটায়?

ডেভিড ব্রুস্টার: প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে কিছু দেশ সমরাস্ত্র কেনাকাটার নিরিখে দেখে। এটা হতেই পারে। আমি অস্ট্রেলিয়ার জন্য এই সুপারিশ করব না। প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আমি সামুদ্রিক পরিসরে বাংলাদেশের সামর্থ্য বাড়ানোর পরিপ্রেক্ষিতে দেখি। কারণ, এর সঙ্গে সরাসরি অস্ট্রেলিয়ার স্বার্থ জড়িত। আমরা অস্ট্রেলিয়ার স্বার্থেই শক্তিশালী, সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ দেখতে চাই।

আপনি যখন ব্যাপক পরিসরে অস্ট্রেলিয়ার স্বার্থেই স্থিতিশীলতার কথা বলেন, সংগত কারণেই এই অঞ্চল ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের মতো বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রসঙ্গটি চলে আসে। আইপিএসের (ভারত–প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশল) প্রসঙ্গ এলে মানুষ একে চীনের পাল্টা উদ্যোগ মনে করে।

ডেভিড ব্রুস্টার: দেখুন, আইপিএসের ধারণাটি যুক্তরাষ্ট্র অনেক পরে নিয়েছে। এমনকি এই ধারণা পুরোপুরি গ্রহণের ক্ষেত্রে একটা পর্যায় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিধা ছিল। এই ধারণাটি ২০০৭ সালে জাপানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে প্রথম সামনে নিয়ে আসেন। এর কয়েক বছরের মধ্যেই এই ধারণার গুরুত্ব অস্ট্রেলিয়া ধরতে পেরেছিল। এরপর এ অঞ্চলের জন্য নিজেদের কৌশলও ঠিক করে। কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র নিজের কৌশল ঠিক করে। যখন লোকজন বলে, এতে আমি অবাক হই। এখন পর্যন্ত দেশ ও জোট মিলিয়ে ২০টি আলাদা আইপিএস আছে। চীনের নিজের একটি আইপিএস আছে। যেটিকে তারা বলে বিআরআই। কাজেই লোকজন বুঝতে পারে না প্রতিটি দেশের নিজের অঞ্চলের জন্য পরিবর্তনের সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নেবে। প্রতিটি দেশের আইপিএস আলাদা। বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কীভাবে এই কৌশলগত পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেবে।

তার মানে বলতে চাইছেন ভূকৌশলগত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাংলাদেশের নিজস্ব আইপিএস থাকা উচিত?

ডেভিড ব্রুস্টার: অবশ্যই বাংলাদেশের নিজস্ব আইপিএস থাকা উচিত। ভূকৌশলগত যে পরিবর্তন ঘটে চলেছে, পছন্দ হোক বা না হোক, বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব পড়বে। ভূরাজনীতির পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি থেকে যেকোনো দেশকে নিজস্ব কৌশল ঠিক করাটা অপরিহার্য। পরিস্থিতি আপনাকে বলে দেবে কী করতে হবে। এর চেয়ে বড় বিষয়টি হচ্ছে কৌশলগত পরিবেশ ঠিক করার ক্ষেত্রে আপনি ভূমিকা রাখছেন। অস্ট্রেলিয়া প্রায়ই সামনে থেকে কৌশলগত পরিবেশ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের জন্য আমার সুপারিশ হচ্ছে পরিবেশ নির্ধারণে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি মাঝারি শক্তির জাপান, অস্ট্রেলিয়া আর অন্য যেসব দেশ আছে, তাদের সঙ্গে কাজ করা। বাংলাদেশের অনেক ইস্যু আছে বঙ্গোপসাগরে। এখানে শুধু মিয়ানমারের বিষয়টি নয়, আরও বেশ কিছু বিষয় রয়েছে।

ভূরাজনীতি আর স্থিতিশীলতার আলোচনায় মিয়ানমারের চলমান সংকট আর রোহিঙ্গা ইস্যু প্রাসঙ্গিকভাবেই চলে আসে। এই সংকট কেমন প্রভাব ফেলতে পারে?

ডেভিড ব্রুস্টার: মিয়ানমারের, বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকটের সহজ কোনো সমাধান নেই। কারণ, বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের রোহিঙ্গাদের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা নেই।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে কি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা প্রয়োজন?

ডেভিড ব্রুস্টার: বাংলাদেশকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা উচিত। মাদক পাচার ও সহিংস উগ্রপন্থার মতো ঝুঁকি রয়েছে। রোহিঙ্গাদের কিন্তু এশিয়ার ফিলিস্তিনি হওয়ার ঝুঁকি আছে। কারণ, তাদের ঘিরে অনেক রকমের সমস্যা রয়েছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে সঠিক পরিকল্পনা থাকলে। আপনি তাদের চিরতরে আশ্রয়শিবিরে রেখে দিতে পারবেন না। আমার আশঙ্কা, একসময় তাদের অর্থায়ন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারেন। মানবিক সহায়তা বছরের পর বছর চলতে পারে না।

সমস্যাটি দীর্ঘস্থায়ী হলে পুরো অঞ্চলে যখন প্রভাবের আশঙ্কা আছে, সহযোগীরা বাংলাদেশকে ছেড়ে যাওয়াটা কতটা বাস্তবসম্মত?

ডেভিড ব্রুস্টার: দেখুন, আপনার এখনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ আছে। এটা তো অনিবার্য যে ইউক্রেন বা অন্য কোনো দেশের শরণার্থীরা একসময় গুরুত্বের কেন্দ্রে চলে আসবেন। সে ক্ষেত্রে সময় থাকতে দাতাদের মনোযোগের কেন্দ্রে থাকা জরুরি। বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত অগ্রাধিকারের ক্ষেত্র মানবিক সহায়তা ঘিরে। রোহিঙ্গাদের জীবিকা ও দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। পাঁচ–দশ বছর সময় নিলে তা কিন্তু অনেক দেরি হয়ে যাবে। দাতারা অন্য জায়গা মনোযোগ দেবে। দ্রুত কীভাবে তা দীর্ঘ মেয়াদে করবেন, তাতে নজর দিতে হবে। এটা বাংলাদেশের সমস্যা নয়। কারণ, বাংলাদেশের ঘাড়ে এটা চেপে বসেছে।

বাংলাদেশ ঘিরে অস্ট্রেলিয়ার কৌতূহল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেভাবে দেখছি, অতীতে তা ছিল না। বাঁকবদলের শুরুটা কেন ও কীভাবে হলো?

ডেভিড ব্রুস্টার: এই মনোযোগের কেন্দ্রে আছে আইপিএস। কাকতালীয়ভাবে ভারত মহাসাগরের ওপর বেশি মনোযোগ থেকেই এটা ঘটেছে। প্রাথমিকভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গত ১০–১৫ বছরে বেশ ভালোভাবে এগোনোর পর আমরা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দেশের ওপর মনোযোগ দিতে শুরু করেছি। আমার কাছে বাংলাদেশকে নানা কারণে আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। আর সে কারণগুলো আগেই বলেছি।