আনিস আলমগীরের সাক্ষাৎকার

সেটি যেন জেলখানার মধ্যে আরেকটা জেল

সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তারের তিন মাস পর ১৪ মার্চ কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন সাংবাদিক আনিস আলমগীর। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে আলোচিত-সমালোচিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার, ডিবি হেফাজত এবং কারাগারে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের।

প্রথম আলো:

  ডিবি কার্যালয়ে থাকা অবস্থায় প্রথম আলো থেকে আপনাকে ফোন দেওয়া হয়েছিল এবং আপনার আটকের খবরও প্রচার করা হয়েছিল। যখন ডিবিতে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন কি ভেবেছিলেন, আপনি গ্রেপ্তার হতে যাচ্ছেন?

 আনিস আলমগীর: তারা জিম (ব্যায়ামাগার) পরিদর্শনের নাম করে এসেছিল। আমি যখন বের হয়ে যাচ্ছি, তখন তাদের দেখে মবের ঘটনার মতো মনে হচ্ছিল। তাদের চলে যেতে বললে তারা জানায়, ডিবি প্রধান আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছে। আমি তখন বুঝতে পারি, গ্রেপ্তার হতে যাচ্ছি। পরে জানতে পারি, ওই দিন সকালে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার নির্দেশে আমাকে গ্রেপ্তার করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য আমি কোথায় যাচ্ছি, তা ট্র্যাক (অনুসরণ) করা হচ্ছিল।

প্রথম আলো:

  সেদিন ডিবি কার্যালয়ে ও পরবর্তী সময়ে কী হয়েছিল?

 আনিস আলমগীর: ডিবি কার্যালয়ে আমাকে কয়েক ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। কিন্তু কোনো মামলা না থাকায় তারা নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করছিল। রাত একটার দিকে সাজানো একটা মামলা এল। আমি ডিবি প্রধানকে বললাম, যেই অভিযোগগুলো আমার বিরুদ্ধে দিয়েছে, সেসব বক্তব্য অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে যায়। তারা সবকিছু শুনেছে এবং আমাকে কী করবে, তা নিয়ে একধরনের বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়। তবে পরবর্তী সময়ে সাজানো মামলায় আমাকে গ্রেপ্তার দেখায়।

 তারপর একটা নির্জন রুমে নিয়ে যায়। সেটি অন্ধকার এবং ওখানে অনেক মশা ছিল। মনে হয়, কোনো দিন সেখানে মশার স্প্রে করা হয়নি। পাশেই ছিল নালা। মশা ও নালার গন্ধে সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। প্রায় ২৪ ঘণ্টা এভাবেই কেটেছে। পরের দিন সন্ধ্যার আগে নিয়ে যাওয়া হয় আদালতে। সেখান থেকে আসার পর আগের রুমে অন্য একজনকে রেখে আমাকে পাশের রুমে নিয়ে যায়। সেখানে তারা পাঁচ দিনের রিমান্ড আদেশ পেয়েছিল। সব মিলিয়ে সাত দিন সেখানে ছিলাম। রিমান্ড শেষে আমাকে কেরানীগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হলো। সে সময় আমার উকিল ডিভিশন (বিশেষ মর্যাদা) চেয়েছিল, ডিভিশন দেওয়াও হয়েছিল। তবে তারা ডিভিশনকে কেয়ার করেনি। তখন আমাকে আমদানি (কারাগারে নতুন বন্দীদের পর্যবেক্ষণের জন্য যে কক্ষ বা ওয়ার্ডে রাখা হয়) বলে একটা জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। ওখান থেকে পরদিন সকালে আবার আমাকে টানাহ্যাঁচড়া করে কাশিমপুর কারাগারে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে এমন এক জায়গায় রেখেছিল, সেটা যেন আরেকটা আমদানি। সেখানে কয়েক শ লোক এক রুমে থাকে। এরপর মধুমতি নামে একটি ভবনের এক কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ছিল। পুরো জেলখানাভর্তি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, যাদের বেশির ভাগের পদপদবিও নেই।

গত ১৪ মার্চ গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান আনিস আলমগীর (সবার বাঁয়ে)
ফাইল ছবি
প্রথম আলো:

  জেলজীবন কীভাবে কেটেছে? জেলে কাদের সঙ্গে রাখা হয়েছে?

আনিস আলমগীর: মধুমতি ভবনে প্রথম এক মাস খুবই খারাপ গেছে। একটা কক্ষে ৩৫ জন লোক থাকে, শোবার জায়গা ছাড়া আর কিছু নেই। ঘুমানোর পরিবেশও ছিল না। তারা ভোর ছয়টায় একবার গুনতে আসে, গুনে দেখে কতজন আছে। এরপর লকআপ খুলে দেয়। বের হওয়ার পর দেখা যায়, বসার জায়গা নেই কোথাও, দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। দুপুর ১২টায় তারা আরেকবার গুনতে আসে। সাড়ে চারটার দিকে যখন লকআপে দিয়ে দেয়, তখন আবার গুনতে আসে। কারাগারের ভেতরে যে কয়টি ভবনে আওয়ামী লীগের লোকজনকে রেখেছে, সেটি যেন জেলখানার মধ্যে আরেকটা জেল। অন্য ওয়ার্ডগুলোর বন্দীরা বাইরে ঘুরতে পারলেও তারা পারত না। আমিও সেই চক্করের মধ্যে সেখানে ছিলাম। বাইরে যেতে পারিনি। তবে এক মাস পরে আমাকে যখন ডিভিশন দেওয়া হলো, তখন থাকা-খাওয়ার একটা পরিবেশ ছিল। কিন্তু সেখানে আবার নির্জনতা বেশি। আমরা ১৪-১৫ জন ছিলাম। সেখানেও কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা আর পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। ডিভিশনেও অবশ্য ভবনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না আমার। এটা সবচেয়ে বেশি পীড়া দিয়েছে।

সেখানে নিয়ে এমন এক জায়গায় রেখেছিল, সেটা যেন আরেকটা আমদানি (কারাগারে নতুন বন্দীদের পর্যবেক্ষণের জন্য যে কক্ষ বা ওয়ার্ডে রাখা হয়)। সেখানে কয়েক শ লোক এক রুমে থাকে। এরপর মধুমতি নামে একটি ভবনের এক কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ছিল। পুরো জেলখানাভর্তি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, যাদের বেশির ভাগের পদপদবিও নেই।
প্রথম আলো:

  জেলের ভেতরে খাবার ও শৌচাগার কেমন ছিল?

 আনিস আলমগীর: মধুমতিতে যে কদিন ছিলাম, খাবার জঘন্য ছিল। ওই খাবার খেতে পারিনি। তবে কেনা খাবারের ব্যবস্থা ছিল, সেটা খেতাম। অবশ্য এর মানও ভালো ছিল না। কিন্তু যখন ডিভিশনে এলাম, তখন আমাদের জন্য যে বরাদ্দ আছে, সেটাকে আমরা আরও কিছু টাকা দিয়ে একটু ‘আপগ্রেড’ (উন্নত) করে খেতে হয়েছে। সেখানে খাবারের সমস্যা হয়নি। আর টয়লেটের কথা বলতে গেলে ২৫-৩৫ জন লোক একটা টয়লেটে যাওয়ার জন্য লাইন ধরে থাকতে হতো। পানিও নিয়মিত আসত না। দিনে দু-তিনবার আসত। টাইম ধরে আবার শেষ হয়ে যেত।

প্রথম আলো:

  আপনি কি এর আগে কখনো জেলে গিয়েছিলেন?

 আনিস আলমগীর: না, এর আগে কখনো জেলে যেতে হয়নি। আমাকে এক-এগারোর সময় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সে সময় থানাতেই ছিলাম, জেলে নেওয়া হয়নি।

প্রথম আলো:

  আপনাকে বারবার আদালতে আনা হলেও জামিন দেওয়া হয়নি। যে আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সে বিষয়ে একটু বলবেন?

আনিস আলমগীর: সন্ত্রাস দমন আইনে কমপ্লিট (সম্পূর্ণ) একটা ভুয়া মামলা। এর থেকে চরম নির্যাতনমূলক আইন এবং চরম ভুয়া মামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে আর হয়নি। প্রতিটি মামলার সঠিক বিচার করতে গেলে এগুলো একটাও টিকবে না। ড. ইউনূস জুলাই হত্যাকাণ্ডের শহীদদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। উনি একটা মামলাতে ৬০০-৭০০ লোককে ঢুকিয়ে রেখেছেন, যাদের সঙ্গে ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। এর মানে মামলার কোনো মেরিট নেই। অথচ পুলিশকে যদি দায়িত্ব দেওয়া হতো, তাহলে এই মামলাগুলোর বিচার হতো এবং শহীদেরাও বিচার পেত।

ড. ইউনূসের ১৮ মাসের শাসনে প্রথম আলো সবচেয়ে ‘টার্গেটেড’ (আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু) পত্রিকা ছিল। অথচ প্রথম আলো আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সরকারের সমালোচনা করে অনেক প্রতিবেদন করেছে। সেই সরকারের আমলে নির্যাতনের শিকারও হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পুড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশের সংবাদপত্রের অন্ধকার যুগের সূচনা করা হয়েছে।
প্রথম আলো:

  দুদক আপনার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলা করেছে, এই মামলায় আপনি জামিনও পেয়েছেন। এ বিষয়ে একটু বলবেন?

 আনিস আলমগীর: একটা জমি বিক্রি করেছিলাম। সেটার ট্যাক্স দেওয়ার আগেই গ্রেপ্তার হয়েছিলাম। পরবর্তী সময়ে সেটি আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এখন ট্যাক্স দিয়ে দিলে সেটা ঠিক হয়ে যাবে। তবে এটা সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক যে যখন আমাকে একটা ভুয়া মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার দেখানো হলো এবং সেটা নিয়ে যখন সমালোচনা হচ্ছে, তখন আমাকে ডিফেইম (ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন) করার জন্য দুদককে লাগিয়ে দেওয়া হলো। আপনি আমাকে ট্যাক্সের জন্য ধরছেন, কিন্তু ড. ইউনূস ক্ষমতায় এসে তাঁর ৬৬৬ কোটি টাকার কর মাফ করে দিয়েছেন। এর থেকে মকারি মনে হয় ইতিহাসে কেউ করেনি।

সাংবাদিক আনিস আলমগীর
ছবি: আনিস আলমগীরের ফেসবুক থেকে নেওয়া
প্রথম আলো:

 সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কেমন ছিল, পরবর্তী সময়ে পার্থক্যটা কেমন দেখেন?

 আনিস আলমগীর: আওয়ামী লীগ আমলের চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংবাদপত্রের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছে বেশি। সংবাদপত্রে কে চাকরি করবে, না করবে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করেছে তারা। যে কেউ যেকোনো পত্রিকা অফিসে ‘মব’ করতে পারে। ইউনূসের ১৮ মাসের শাসনে প্রথম আলো সবচেয়ে ‘টার্গেটেড’ (আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু) পত্রিকা ছিল। অথচ প্রথম আলো আওয়ামী সরকারের আমলে সরকারের সমালোচনা করে অনেক প্রতিবেদন করেছে। সেই সরকারের আমলে নির্যাতনের শিকারও হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পুড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশের সংবাদপত্রের অন্ধকার যুগের সূচনা করা হয়েছে। ড. ইউনূস প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার নিষিদ্ধ করেছে জেলখানাতে। জেলখানাতে আগে ডেইলি স্টার পাওয়া যেত, এখন পাওয়া যায় না। আর প্রথম আলো আগেও পাওয়া যেত না, এখনো পাওয়া যায় না।

সন্ত্রাস দমন আইনে কমপ্লিট (সম্পূর্ণ) একটা ভুয়া মামলা। এর থেকে চরম নির্যাতনমূলক আইন এবং চরম ভুয়া মামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে আর হয়নি। প্রতিটি মামলার সঠিক বিচার করতে গেলে এগুলো একটাও টিকবে না।
প্রথম আলো:

  একটি পক্ষ বলে, আপনি আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলেন এবং আপনাকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ ডাকে। এ বিষয়ে কী বলবেন?

 আনিস আলমগীর: এটা সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা। কারও সমালোচনা করলে ধরে নেওয়া হয়, আমি অন্য পক্ষের লোক। এই সমালোচনার জন্য আওয়ামী লীগ আমলে আমাকে বিএনপি-জামায়াত বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের শাসনে আমি তিন বছরও চাকরি করতে পারিনি। আমি জুলাই আন্দোলন সমর্থন করেছিলাম, যে কারণে অন্তর্বর্তী সরকারকে ছয় মাস সমর্থন দিয়েছিলাম। এরপরও আমাকে জুলাইবিরোধী বলা হয়। যারা এই কথা বলে, তারা মনে করে ড. ইউনূসের সমালোচনা করা মানে বিগত সরকারকে সমর্থন দেওয়া। একই কাণ্ড সামনেও ঘটবে। বিএনপির সমালোচনা করলে হয়তো বলবে, আমি আওয়ামী লীগের লোক। আবার আওয়ামী লীগ এলে তাদের সমালোচনা করলে বলবে বিএনপির লোক। তবে ভবিষ্যতে যদি আমি রাজনীতি করি, সেটা প্রকাশ্যে করব। গুপ্ত রাজনীতি করার দরকার নেই।

প্রথম আলো:

  আপনি সাংবাদিকতা করতেন, এখন কী করছেন?

 আনিস আলমগীর: এ মুহূর্তে আমি ফ্রিল্যান্সিং করছি, কিছু কিছু কনসালটেন্সি করছি, কিছু শিক্ষকতা করছি।

সাংবাদিক আনিস আলমগীর
ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলো:

কারাগারে নেওয়ার পর ভয় পেয়েছিলেন কি না? আগের মতো কথা বলে যাবেন কি না?

 আনিস আলমগীর: আমি কখনো ভয় পাইনি। আমি সত্য বলব। সত্য কথা বলতে কখনো ভয় পাব না, সেটা যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক। সরকারের বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা এবং দলীয় দালালি—এটা কখনো করিনি, সামনেও করব না। কারণ, একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব এটা নয় যে কোনো একটা সরকারকে টিকিয়ে রাখা কিংবা সরকারকে ফেলে দেওয়া। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব কী ঘটছে, সেটা জনগণকে অবহিত করা। কিন্তু দল ছাড়া কোনো সাংবাদিক আছে—এই বিশ্বাসই অনেক জায়গা থেকে উঠে গেছে। আমি সেই বিশ্বাসটা ফেরাতে চাই যে দলীয় দালালি ছাড়া দলনিরপেক্ষ সাংবাদিক থাকা যায় এবং দলনিরপেক্ষ সাংবাদিক থাকলে তাদের মানুষ শ্রদ্ধা করে।

প্রথম আলো:

  আপনাকে ধন্যবাদ।

আনিস আলমগীর: আপনাকেও ধন্যবাদ।