বিজ্ঞপ্তির প্রতিবাদে ‘গরুভোজ’, সোয়া লাখ টাকায় কেনা হলো গরু

‘গরুভোজ’–এর জন্য সোয়া লাখ টাকায় কেনা হলো গরুছবি: প্রথম আলো

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার বিষয়ে প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তির প্রতিবাদে গরু জবাই করে ভোজের আয়োজন করেছেন একদল শিক্ষার্থী। আজ শুক্রবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ভবন ও গণিত বিভাগের মধ্যবর্তী সড়কে পূর্বঘোষিত ‘জবিয়ানদের গরুভোজ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে গরু জবাই করা হয়। আয়োজকদের ঘোষণা অনুযায়ী, দুপুরের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে খিচুড়ি ও গরুর মাংস বিতরণ করা হবে।

এর আগে ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চের কাছে গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্নাকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। পরে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এতে শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু)। একপর্যায়ে শুক্রবার গরু জবাই করে ভোজের কর্মসূচি ঘোষণা করেন শিক্ষার্থীরা।

উল্লেখ্য, জকসুর নির্বাচিত কমিটির ভিপি, জিএসসহ অধিকাংশ সদস্য ইসলামী ছাত্রশিবির নেতা।

এক লাখ ২৫ হাজার টাকার গরু

গতকাল বৃহস্পতিবার ‘গরুভোজ’ কর্মসূচির জন্য এক লাখ ২৫ হাজার টাকায় একটি গরু কেনা হয়। কর্মসূচিতে সবাইকে উপস্থিত হওয়ার আমন্ত্রণ জানান জকসুর সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মাসুদ রানা। তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন থেকে পাওয়া অর্থ এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তির অনুদান দিয়ে গরুটি কেনা হয়েছে।

‘আমরা শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য গরু জবাই নিয়ে সিটি করপোরেশনের বিজ্ঞপ্তিটা নোটিশ আকারে দিয়েছিলাম। প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে মার্জিত ও সুশৃঙ্খলভাবে গরুভোজ কর্মসূচি আয়োজন করা হলে কোনো আপত্তি থাকবে না।’
অধ্যাপক আজম খান, প্রক্টর (অতিরিক্ত দায়িত্ব), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গরুটি ক্যাম্পাসে আনা হলে আনন্দমিছিল করেন আয়োজকেরা। এ সময় গরু খাওয়ার অধিকার ও প্রশাসনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা এ আয়োজনকে প্রশাসনের আগের বিজ্ঞপ্তির প্রতিবাদ হিসেবে তুলে ধরেন।

জানতে চাইলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক আজম খান বলেন, ‘আমরা শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য গরু জবাই নিয়ে সিটি করপোরেশনের বিজ্ঞপ্তিটা নোটিশ আকারে দিয়েছিলাম। প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে মার্জিত ও সুশৃঙ্খলভাবে গরুভোজ কর্মসূচি আয়োজন করা হলে কোনো আপত্তি থাকবে না।’

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত

১২ অক্টোবর রাতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা অনার্স শেষ করার উপলক্ষ হিসেবে ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চের কাছে গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করেন। ওই স্থানের কাছেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দির।

রান্নার আয়োজন নিয়ে আপত্তি জানান কয়েকজন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী। তাঁদের অভিযোগ, মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্না করায় তাঁদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে। এ সময় রান্নার চুলা তৈরিতে মন্দিরের ইট ব্যবহারের অভিযোগও ওঠে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন।

তবে আয়োজক শিক্ষার্থীরা জানান, প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় রান্নার পরিকল্পনা ছিল। গ্যাসের চাপ কম থাকায় তাঁরা বিকল্প হিসেবে কাঠের চুলায় রান্নার উদ্যোগ নেন। পরে ইটগুলো মন্দিরের বলে জানতে পেরে সেগুলো সরিয়ে ক্যাফেটেরিয়া থেকে লোহার চুলা নিয়ে আসেন। অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য তাঁরা দুঃখ প্রকাশও করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রক্টরের হস্তক্ষেপে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টির সমাধান হয়েছিল। পরদিনও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা হয়। তবে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এ নিয়ে নানা আলোচনা ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখা যায়।

গরু জবাইয়ের পর রান্নার আয়োজন চলছে ক্যাম্পাসে
ছবি: এস এম শাহাদাত হোসেন

পশু জবাই থেকে বিরত থাকার বিজ্ঞপ্তি

১৪ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তর থেকে ক্যাম্পাসে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখার কথা বলা হয়। নির্দেশনা অমান্য করলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়।

প্রশাসনের এমন বিজ্ঞপ্তির পর শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, পশু জবাই বন্ধের নির্দেশনা দিয়ে প্রশাসন শিক্ষার্থীদের খাদ্যাভ্যাস ও সাংস্কৃতিক চর্চার অধিকারে হস্তক্ষেপ করেছে।

বিজ্ঞপ্তির প্রতিবাদে বুধবার রাতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে জকসু। সমাবেশ থেকে বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার, প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ, ঘটনার তদন্ত, ক্যাফেটেরিয়ায় গরু ও খাসির মাংসের ব্যবস্থা এবং ক্যাম্পাসে ধর্মীয় সম্প্রীতি নিশ্চিত করার দাবিসহ চার দফা দাবি জানানো হয়।

জকসুর নেতারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রশাসনকে দুঃখ প্রকাশের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে শুক্রবার গরু জবাই করে ভোজের আয়োজন করার ঘোষণা দেন তাঁরা। কর্মসূচিতে অংশ নিতে শিক্ষার্থীদের জন্য ৭০ টাকা নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়।

বিজ্ঞপ্তির ব্যাখ্যা দিয়ে দুঃখ প্রকাশ প্রশাসনের

পশু জবাই থেকে বিরত থাকার বিজ্ঞপ্তি নিয়ে সমালোচনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে। জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তরের মাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে প্রশাসন জানায়, ক্যাম্পাসে পশু জবাইসহ যেকোনো অনুষ্ঠান আয়োজনের অধিকার সবার রয়েছে। তবে কোনো আয়োজন যেন অন্যের অনুষ্ঠান বা কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির অবনতি এড়ানোর উদ্দেশ্যে প্রক্টরের পক্ষ থেকে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। ওই অনুরোধের ফলে ভুল–বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ায় প্রশাসন দুঃখ প্রকাশ করে।

তবে প্রশাসনের এ ব্যাখ্যার পরও ঘোষিত ‘গরুভোজ’ কর্মসূচি অব্যাহত রাখে জকসু।