রুদ্ধ গণতন্ত্রে রাজপথে বিস্ফোরণ

বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থান ও গণ-আন্দোলনের ইতিহাস থেকে আমাদের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক সমাজের শিক্ষা নেওয়া দরকার। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করলে তার ফল কী হতে পারে, তার একাধিক প্রমাণ আমাদের ইতিহাসেই মজুত আছে

বাংলাদেশ নামক এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ইতিহাসকে যদি গণ-আন্দোলনের ইতিহাস বলে কেউ চিহ্নিত করতে চান, তাহলে সেটাকে অত্যুক্তি বলা যাবে না। উপনিবেশ-উত্তর পর্বে আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোয় প্রবেশের পর থেকে বিভিন্ন মাত্রার গণ-আন্দোলনই এখানকার রাজনৈতিক পরিসর ও ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছে। অথবা বলা যেতে পারে, প্রতিটি বাঁকবদলের ওয়াক্তে রয়েছে আদতে একেকটি গণ-আন্দোলন। ফলে কেবল গণ-আন্দোলনের গভীর পাঠই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সংকট উভয়কে উন্মোচন করতে পারে।

অজস্র আন্দোলন-সংগ্রামে মুখর এই ভূখণ্ডে মুক্তিযুদ্ধ ছিল সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের কাল। মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব ও উত্তরকালে উনসত্তর ও নব্বইয়ের জনগণের সম্মিলিত বিস্ফোরণকেই ‘গণ-অভ্যুত্থান’ বলে জনপ্রিয় রাজনৈতিক সাহিত্যে উল্লেখ করা হয়। ২০২৪ সালে আরেক গণ-অভ্যুত্থানের সাক্ষী হলো এই জনপদ। বদরুদ্দীন উমর চব্বিশের জুলাই মাসেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ভাষা আন্দোলনের পর থেকে যত গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান তার মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক। তাঁর মতে বায়ান্ন, উনসত্তর, একাত্তরের মার্চ এবং নব্বইয়ের পর এটা আরেকটি গণ-অভ্যুত্থান।

তবে বিষয়বস্তু ও ধরনের কারণে ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মার্চ মাসের আন্দোলনকে পৃথকভাবে বিবেচনার দাবি রেখে উনসত্তরের আইয়ুববিরোধী এবং নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী গণ-অভ্যুত্থান/আন্দোলনের সঙ্গে মিলিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে পাঠ করা যেতে পারে। কেননা এই তুলনামূলক পাঠ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সংকট চিহ্নিত করতে সহায়তা করতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের পর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানই নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঘটনা। এখানে স্লাভোই জিজেকের অর্থেই ‘ঘটনা’ বলা হচ্ছে; অর্থাৎ এটা এমন এক আমূল রূপান্তর, যা আমাদের দেখা ও বোঝার গড়নই পাল্টে দেয়।

তিনটি আন্দোলনের অভিমুখ ছিল তিন রকম। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান মুক্তিযুদ্ধের পথ তৈরি করে বাংলাদেশ নামক এই রাষ্ট্রের উত্থান ঘটিয়েছিল। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক যাত্রার দিকে ধাবিত করে। আর চব্বিশের প্রভাব এখনো চলমান, তবে তা রাষ্ট্রের কাঠামোর আমূল সংস্কারের দাবি তুলেছিল।

উনসত্তর, নব্বই ও চব্বিশ—তিনটিই ছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন; প্রথম দুটো সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে, তৃতীয়টি বেসামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। তিনটি আন্দোলনই তৎকালীন স্বৈরাচারকে সরাতে প্রাথমিকভাবে সফল হয়েছে। প্রথম দুটোতে ক্ষমতাসীন সামরিক শাসককে একধরনের ‘নিয়মতান্ত্রিক’ভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য করা হয়েছিল; চব্বিশের গণজোয়ারের মুখে ক্ষমতাসীনেরা দেশ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

গণ-অভ্যুত্থানের প্রাথমিক সফলতার পর তিন ক্ষেত্রেই নির্বাচনপ্রক্রিয়ার দিকে রাজনীতিকে ধাবিত করা হয়েছিল। উনসত্তরের রূপান্তরকালে ক্ষমতা ছিল আরেক সামরিক শাসকের হাতে; নব্বই ও চব্বিশ—উভয় কালপর্বে ক্ষমতা ছিল বেসামরিক ও অরাজনৈতিক গোষ্ঠীর হাতে।

তবে তিনটি আন্দোলনের অভিমুখ ছিল তিন রকম। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান মুক্তিযুদ্ধের পথ তৈরি করে বাংলাদেশ নামক এই রাষ্ট্রের উত্থান ঘটিয়েছিল। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক যাত্রার দিকে ধাবিত করে। আর চব্বিশের প্রভাব এখনো চলমান, তবে তা রাষ্ট্রের কাঠামোর আমূল সংস্কারের দাবি তুলেছিল। এই তিন ধরনের অভিমুখের মধ্যেই আসলে বাংলাদেশের পুরো রাজনৈতিক যাত্রা লুকিয়ে আছে।

বদরুদ্দীন উমরের বরাতে যেমন বলা হয়েছে, এই তিন ঘটনার মধ্যে জুলাইতেই জনগণের বিস্ফোরণ ঘটেছিল সর্বাধিক। এই তিনটি ঘটনার মধ্যে কাঠামোগত পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। যেমন হেলাল মহিউদ্দীন নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে বলেছিলেন, নব্বইয়ের আন্দোলন উনসত্তরের মতো সর্বব্যাপ্ত ছিল না, বরং এটা ছিল অনেক বেশি মধ্যবিত্ত ও শহরকেন্দ্রিক। উনসত্তর যেমন ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রামগঞ্জে, নব্বইতে তা ঘটেনি। অন্যদিকে প্রথম দুই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন পেশাজীবী ও রাজনৈতিক সংগঠনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ধারণী ভূমিকা ছিল, যা জুলাইতে একেবারেই তেমন ছিল না; বরং জুলাই ছড়িয়ে পড়েছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও অনুভূমিক কায়দায়। আর এটাই ছিল তার সফলতার প্রধান কারণ। তবে তিনটি ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল অগ্রগামী।

যুগ-বৈশিষ্ট্যও এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের ওপর যে ১৯৬০–এর দশকের বৈপ্লবিক হাওয়া বয়ে গিয়েছিল, ইতিমধ্যে গবেষকেরা তা দেখিয়েছেন। কেন ‘মার্ক্সবাদী’ কায়দায় বিপ্লব ঘটেনি, তা নিয়ে এন্তার আফসোস ও বিশ্লেষণও রয়েছে। ১৯৭০ সালেই যখন প্রখ্যাত তাত্ত্বিক তারিক আলী উনসত্তরের ইতিহাস লিখতে বসেছিলেন, তখন তিনি সেটাকে ১৯৬০–এর দশকের অন্যান্য বিদ্রোহের ধারাবাহিকতায় পাঠ করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘অক্টোবরের শেষ দিকে মনে হয়েছিল বিশ্বব্যাপী তরুণদের বিদ্রোহে ভাটা পড়েছে এবং আন্দোলনের গতি স্তিমিত হয়ে পড়েছে…অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছিল, পাকিস্তানি ছাত্ররা পশ্চিম ইউরোপের আন্দোলনের হতাশা কাটাতে সময়মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।’

সহুল আহমদ

উনসত্তরের ১১ দফার সঙ্গে নব্বইয়ের ‘তিন জোটের রূপরেখা’ মিলিয়ে পাঠ করলে দুটির মধ্যে রাষ্ট্র-কল্পনার পার্থক্য ধরা পড়ে। দুই কল্পনা আদতে দুই সময়ের বৈশিষ্ট্যই ধারণ করেছিল। নব্বইয়ে যখন সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন হচ্ছে, তখন তৎকালীন বিশ্বের প্রভাবশালী ‘গণতন্ত্র’—বিষয়ক ধারণার প্রভাব এতে দেখা যায়। একইভাবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যেও এই কালের বৈশিষ্ট্য ও রাজনীতি-কল্পনাই প্রভাবশালী। গত ২০ বছরে দুনিয়াব্যাপী যত গণ-আন্দোলন হয়েছে, সেখানে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের প্রতি অনীহা যেমন সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে, এখানেও তা দেখা যায়। অথচ উনসত্তর ও নব্বইতে রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃত্ব ও ভূমিকা ছিল প্রধান। আবার হাল আমলে যেমন মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ আকারে হাজির হচ্ছে, উনসত্তরে গুরুত্বপূর্ণ ছিল স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন, সেখানে সমাজতান্ত্রিক ভাবনারও প্রকাশ দেখা যায়; আবার নব্বইতে সুশাসন ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্নটি ছিল মুখ্য। এটা ছিল সে যুগের প্রভাবশালী ভাবনা। তবে দুটো ক্ষেত্রেই সুস্পষ্টভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি পাওয়া যায়।

এই তিন ঘটনার পাঠ আসলে বাংলাদেশে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকটকেও সামনে নিয়ে আসে। উনসত্তরে গণ-অভ্যুত্থানকালে পূর্ব পাকিস্তানে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় ৬১ জন, অন্যদিকে পুরো এরশাদ আমলে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছিলেন কমপক্ষে ২৫০ জন। এবার তার তুলনা করুন ২০২৪ সালের জুলাই মাসের সঙ্গে। এই সময়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ১ হাজার মানুষ। এবার একেবারে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। যদিও উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে, কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্র যে দিন দিন কতটা প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে, অন্তত নব্বইয়ের ঘটনাবলির সঙ্গে জুলাইয়ের তুলনা করলেই তা স্পষ্ট হয়।

তিনটি ঘটনাই আদতে ক্ষমতাসীন শাসকদের ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য করেছিল। এটি আমাদের রাজনৈতিক সংকটের গোড়ায় নিয়ে যায়। এই ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠী যতবার সুযোগ পেয়েছে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি তাদের আস্থার জানান দিয়ে এসেছে। পাকিস্তান আন্দোলনের পর্ব থেকে শুরু করে আজতক তা সত্য। নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও রাজপথে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ—অর্থাৎ যতভাবে গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য হাজির করা সম্ভব, ঠিক ততভাবেই গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আস্থার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

বাংলাদেশ পর্বেও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনো বন্দোবস্ত আমাদের রাজনৈতিক সমাজ করতে পারেনি। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, যাঁরা ক্ষমতায় গিয়েছেন, তাঁদের টেনেহিঁচড়ে ক্ষমতা থেকে নামাতে হয়েছে। এ ছাড়া যেন জনগণের আর কোনো উপায় ছিল না!

কিন্তু এটা দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্য যে এই ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠী গত ৭০ বছরে টানা দুটি সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। পাকিস্তান পর্বে যে তা সম্ভব হয়নি, আমাদের জাতীয়তাবাদী ইতিহাস বারবার তা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু খোদ বাংলাদেশ পর্বেও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনো বন্দোবস্ত আমাদের রাজনৈতিক সমাজ করতে পারেনি। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, যাঁরা ক্ষমতায় গিয়েছেন, তাঁদের টেনেহিঁচড়ে ক্ষমতা থেকে নামাতে হয়েছে। এ ছাড়া যেন জনগণের আর কোনো উপায় ছিল না! এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রাণ হারিয়েছেন অসংখ্য নাগরিক। নব্বই ও চব্বিশ—উভয় ক্ষেত্রেই আমরা দেখি যে এই ন্যূনতম নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতিই গণ-অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি ও শর্ত তৈরি করেছিল। গণ-অভ্যুত্থান ছাড়া কোনোভাবেই যে আর সরকার পরিবর্তন সম্ভব নয়, এই অনুভূতি ছিল সর্বব্যাপী।

জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও বাসনার জায়গা থেকে সব গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যেই ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়, যদিও জনগণের ক্ষোভ প্রকাশের ভাষা ও মাধ্যম যুগের পরিবর্তনে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। এটা কেবল গণ-অভ্যুত্থানই নয়, বরং পাকিস্তান আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ হয়ে যত ‘ঘটনা’ রয়েছে, সব কটিতে জনগণের গণতান্ত্রিক বাসনার স্ফুরণ লক্ষ করা যায়।

কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে পত্তনের পর ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে গণতন্ত্রের ওয়াদা করা হলেও গণতান্ত্রিক কাঠামোকে বিনষ্ট করার বীজও সেখানে রোপণ করা ছিল। ১৯৭৩ সালের প্রথম নির্বাচনেই অশনিসংকেত পাওয়া যায়। তার পরের ইতিহাস সবার জানা: বাকশাল প্রতিষ্ঠা ও একের পর রক্তাক্ত পটপরিবর্তন। ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলনের পর ফিরতি গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হলেও দেখা গেল, একের পর এক রাজনৈতিক ওয়াদাভঙ্গের মাধ্যমে শিগগিরই তা মুখ থুবড়ে পড়তে লাগল।

বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থান ও গণ-আন্দোলনের ইতিহাস থেকে আমাদের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক সমাজের শিক্ষা নেওয়া দরকার। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করলে তার ফল কী হতে পারে, তার একাধিক প্রমাণ আমাদের ইতিহাসেই মজুত আছে।

বহুবিধ ঘটনাক্রমে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা গ্রহণের পর রাষ্ট্র তো পুরোদমেই কর্তৃত্ববাদী চেহারা নিল। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যতই নড়বড়ে হতে লাগল, ততই রাষ্ট্রের সহিংস রূপ প্রকাশ পেতে লাগল। জনগণের সম্মতি ব্যতিরেকে শাসন করতে হলে দিন শেষে দমন-পীড়ন ও পুলিশি–নজরদারিমূলক রাষ্ট্রই তৈরি করতে হয়। এই দানবীয় প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত নজির দেখা যায় চব্বিশের জুলাই মাসে।

প্রতিটি অভ্যুত্থানের পরপরই রাজনৈতিক সমাজকে গণতান্ত্রিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার ওয়াদা করতে দেখা যায়। কিন্তু নব্বইয়ের ব্যর্থতাসহ বিগত ৫০ বছরের রাজনৈতিক সংকটের অভিজ্ঞতার কারণে এবার আমূল পরিবর্তন—অর্থাৎ সাংবিধানিক সংস্কারের দাবি তোলা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সংস্কারপ্রক্রিয়া এবং গণভোট আদতে এই প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের সম্মতি বহন করে চলেছে।

এখন আরও মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে: ক্ষমতাসীনসহ রাজনৈতিক সমাজ কি আবারও সমঝোতা ও ওয়াদাভঙ্গের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে? যদি তারা এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখে, তাহলে ইতিহাস থেকে প্রমাণিত, জনগণও তাদের প্রতিক্রিয়া ও প্রতিরোধের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও মূল্যবোধের প্রতি জনগণের আকাঙ্ক্ষা যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রবাহিত হতে না পারে, তাহলে তা আবারও রাজপথেই গড়াবে।

বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থান ও গণ-আন্দোলনের ইতিহাস থেকে আমাদের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক সমাজের শিক্ষা নেওয়া দরকার। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করলে তার ফল কী হতে পারে, তার একাধিক প্রমাণ আমাদের ইতিহাসেই মজুত আছে। তবে না চাইলেও বারবার ইতিহাসের অমোঘ বাণীই সামনে চলে আসে: ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না।

শিক্ষা না নেওয়ার পরিণতি অতি করুণ হতে পারে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করার পর রাষ্ট্র যে দানবীয় চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হয়, সেখানে নাগরিকদের জান ও মালের ন্যূনতম নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা থাকে না। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকটের কারণে যত নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন, যে রক্তাক্ত পথ আমাদের পাড়ি দিতে হয়েছে, তার পরেও যদি গণ-অভ্যুত্থানের শিক্ষা নিয়ে টেকসই গণতান্ত্রিক বন্দোবস্ত গড়ে তোলা না যায়, তবে এই জনগোষ্ঠীর জন্য এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কিছুই হতে পারে না।

* সহুল আহমদ: লেখক ও গবেষক