স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

গত ২৭ এপ্রিল লামা উপজেলার লাংকমপাড়া, জয় চন্দ্র কার্বারিপাড়া ও রেংয়েন কার্বারিপাড়ার অধিবাসীদের জুমের বাগান পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এই আগুনে প্রায় ১০০ একর জুমের ধান, বাঁশ, আম, কলা, আনারসসহ বিভিন্ন ফলদ ও বনজ গাছ পুড়ে যায় বলে স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেন। ক্ষতিগ্রস্ত পাড়াগুলোর অধিবাসীদের অভিযোগ, জমি দখলের জন্য লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামের একটি কোম্পানির লোকজন তাঁদের ফসলে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়েছে। তবে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ কর্তৃপক্ষ এ অভিযোগ অস্বীকার করে।

গত ৯ মে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য মো. মোজাম্মেল হক বাহাদুরের নেতৃত্বে একটি তদন্ত দল এলাকা পরিদর্শন করে। সে কমিটি লিজ বাতিলসহ ছয় দফা সুপারিশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পাঁচ বছরের মধ্যে রাবার বাগান সৃজন করার শর্তে লিজকৃত জমি ১৯৯৬ সালে দেওয়া হয়। কিন্তু ২৫ বছর অতিবাহিত হলেও লিজকৃত জায়গার ওপর কোনো ধরনের রাবার রোপণ করা হয়নি।

আইনগতভাবে লিজকৃত জায়গার ওপর লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কোনো ধরনের বৈধ অধিকার নেই। আইন অনুযায়ী এটি বাতিলযোগ্য এবং অতিসত্বর তা বাতিল করার সুপারিশ করা হলো।’


বান্দরবান জেলা পরিষদের সদস্য মোজাম্মেল হক বাহাদুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সুপারিশ করেছি, ৪০০ একর জমি পাহাড়িদের দিয়ে দেওয়া হোক। সেখানে তাদের ওপর অন্যায় করেছে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ।’

লামার জমির এ বিরোধ নিয়ে বান্দরবানের স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক মো. লুৎফুর রহমানের নেতৃত্বে তদন্ত করে জেলা প্রশাসন। গত আগস্ট মাসে এ কমিটি প্রতিবেদন দেয়।  জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনে বলা হয়, পাহাড়িরা পুরো ৪০০ একর জমি নিজেদের বলে দাবি করে। আবার রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ জানায় এটা তাদেরই জায়গা।

মো. লুৎফর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘৪০০ একর জায়গা লামার রাবার ইন্ডাস্ট্রিরই। সেখানকার কিছু অংশে ম্রো ও ত্রিপুরা কিছু পরিবার বসবাস করছিল। বাগান কর্তৃপক্ষ নানা কারণে সেখানে বাগান করতে পারেনি। দুই পক্ষের বিবাদের ফলে আমাদের সুপারিশ ছিল, জায়গাটির মাপজোখ করা হোক। তাতে মন্ত্রণালয়ের লোকজনসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত থাকুক। রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ যদি প্রাপ্য জায়গায় বেশি জমি নিয়ে থাকে, তবে তা সরকারি খাসজমিতে পরিণত হবে। পরে পাহাড়িরা সে জায়গার জন্য আবেদন করলে, তা তাদের দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

জট খোলেইনি বরং বেড়েছে

জেলা পরিষদ এবং প্রশাসনের দুই রকম তদন্ত প্রতিবেদনে ৪০০ একর জমি নিয়ে যে জট, তা তো খোলেইনি, বরং বেড়েছে। এপ্রিলে জুমের জমি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার পর ৬ সেপ্টেম্বর রেংয়েন ম্রো পাড়ার বাসিন্দাদের একমাত্র পানির উৎসে বিষ প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। ২৪ সেপ্টেম্বর এক ম্রো অধিবাসীর ৩০০ কলাগাছ কেটে ফেলে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় উদ্বেগ জানায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। তারা তিন পাহাড়ি গ্রামের ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীকে কোনো রকম হয়রানি না করতে আদেশ দেয়।

এসব পাড়ার বাসিন্দা রেংয়েন কারবারি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা এক অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। এ জমিতে আমরা ফসল ফলাতে পারছি না। এখানে থাকতে পারব কি না, তাই এখন প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।’

আমি বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখনো এর সুরাহা হয়নি। একেক জন একেকরকম ভাবেন, সে অনুযায়ী কাজ করেন।
মন্ত্রী বীর বাহাদুর

লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রি কর্তৃপক্ষ বলছে, মোট ৬৪ ব্যক্তি ২৫ একর করে মোট ১ হাজার ৬০০ একর জমি বরাদ্দ পান। যে ৪০০ একর জমির কথা বলা হচ্ছে, তা তাদেরই।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘যেসব ব্যক্তি এখন এ জমি নিজেদের বলে দাবি করছেন, সেখানে তাঁদের থাকতে দেওয়া হয়েছিল। এখন এই জমি নিজেদের বলে দাবি করছেন তাঁরা। এর পেছনে একটি চক্রের ইন্ধন আছে। আমরা এখানে দীর্ঘদিন ধরে রাবার বাগান করে আসছি। পাহাড়ের পরিস্থিতির জন্য পুরো জায়গায় চাষ করা সম্ভব হয়নি। এখন যখন তা করতে যাচ্ছি, তখনই বিপত্তি শুরু হয়েছে।’

জেলা প্রশাসন লিজ বরাদ্দ বাতিলের যে সুপারিশ করেছে, সে সম্পর্কে জহিরুল ইসলাম বলেন, তারা তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী এটা করেছেন। জেলা প্রশাসন এমন কোনো সুপারিশ করেনি।

মধ্যস্থতার চেষ্টা সফল হয়নি

জমির বিরোধ নিয়ে এর মধ্যে জেলা প্রশাসন মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছে। একাধিক বৈঠকে পাহাড়িদের জন্য ২০০ একরের মতো জমি ছাড় দেওয়ারও প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু তারা তা মানেনি।  মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়কমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং। কিন্তু সুরাহা হয়নি।  মন্ত্রী বীর বাহাদুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখনো এর সুরাহা হয়নি। একেক জন একেকরকম ভাবেন, সে অনুযায়ী কাজ করেন।’

প্রায় সাত মাস ধরে আগুন দেওয়াসহ একাধিক নাশকতামূলক তৎপরতা, স্থানীয় মানুষদের শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা থাকলেও লামার পাহাড়ের জমির দ্বন্দ্ব মেটেনি। এ নিয়ে দুই পক্ষেরই উষ্মা আছে। এর মধ্যে জেলা পরিষদ এবং জেলা প্রশাসনের দুই রকমের অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলেই মনে করেন তাঁরা। তবে বীর বাহাদুর বলেন, ‘জেলা পরিষদ তাদের প্রতিবেদনে মানবিক দিক দেখেছে। আর জেলা প্রশাসন আইনের দিক দেখেছে। তারা তাদের অবস্থানে ঠিক আছে।’

দুটো বিপরীতধর্মী প্রতিবেদনের এমন ব্যাখ্যা মন্ত্রী দিলেও সমস্যার সমাধান হয়নি, তা কিন্তু মন্ত্রীর কথাতেই স্পষ্ট। আর লামার ভূমি বিরোধের বর্তমান অবস্থাকে পাহাড়ের ভূমি সমস্যার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ বলে মনে করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান। তিনি বলেন, ‘পাহাড়ের সমস্যার মূলে ভূমি সমস্যা। এ বাস্তবতাকে এখনো মেনে নেওয়া হয়নি। তাই ভূমি সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। সমস্যার সমাধানে কোনো উদ্যোগ একেবারেই নেই।’