বর্তমান সরকারের সময় গুমের কোনো ঘটনা ঘটেনি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

রাজধানীর শাহবাগ জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ২৯ আগস্টছবি: প্রথম আলো

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে কোনো গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বাগেরহাটের মোংলায় নিখোঁজ হওয়া মিরাজ শেখ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঘটনাটি নিয়ে স্বাধীনভাবে তদন্ত করা হয়েছে। তদন্তে বনদস্যুদের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা এবং তাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়টি এসেছে।

মিরাজ শেখকে গুম করা হয়েছে—এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মিরাজ শেখের রেকর্ডও সেই রকম। তাঁর বাবা ও দাদার রেকর্ডও একই রকম। এ বিষয়ে এর বেশি বিস্তারিত আর বলতে চাই না।’

আজ শনিবার রাজধানীর শাহবাগ জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বিগত সময়ে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ‘নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনতে বা তাঁদের সন্ধান পেতে চাই আইন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকার’ শিরোনামে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শুধু কমিশন গঠন করে গুমের সমাধান হবে না। প্রতিটি ভুক্তভোগী যাতে আদালতে যেতে পারেন এবং বিচার ও প্রতিকার পান, সে লক্ষ্যেই গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৬ করা হয়েছে। আইনে গুমের সংজ্ঞা, অপরাধের ধরন, শাস্তি ও তদন্তের পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে।

আইনে থাকা বিভিন্ন ইতিবাচক দিক তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তি ফিরে না এলে তাঁর উত্তরাধিকারীরা যাতে সম্পত্তির অধিকার পান এবং পরিবার চালাতে পারেন, সে ব্যবস্থাও আইনে রাখা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণের বিধানও রয়েছে। দায়ীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব না হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে।

আইনটি নিয়ে কারও পরামর্শ বা সংশোধনের প্রস্তাব থাকলে তা দেওয়া যাবে বলে উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, আইনটি বিভিন্ন পক্ষ, জাতিসংঘের প্রতিনিধি, কূটনৈতিক মিশন ও মানবাধিকার–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করেই করা হয়েছে। জাতীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের চেষ্টা করা হয়েছে। প্রয়োজনে ভবিষ্যতে আইনটি সংশোধনের সুযোগ থাকবে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নতুন আইনটিও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে করা হয়েছে। কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংস্কারে কাজ করছে। বাহিনীগুলোর মনোবল ও পেশাদারত্ব বাড়ানো হচ্ছে। শাস্তি ও পুরস্কারের ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় বিশেষায়িত বাহিনী, গোয়েন্দা সহায়তা ও সাইবার গোয়েন্দা সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব বাহিনীতে মানবাধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন গুমসংক্রান্ত সাবেক তদন্ত কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন। তিনি বলেন, তাঁরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সেখানে তাঁরা প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য শুনেছেন। ডিজিটাল তথ্যও যাচাই করেছেন। সব মিলিয়ে তাঁরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা দেখতে পেয়েছেন। অথচ এখন পর্যন্ত কার্যকর আইনি পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বরং অভিযোগ অস্বীকার করতে বিভিন্ন বক্তব্য এবং স্থানীয় মানুষ ও সাক্ষীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

অতীতে গুমের শিকার হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে নূর খান লিটন বলেন, একজন গুমের শিকার ব্যক্তি প্রতিটি মুহূর্তে অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুভয়ের মধ্যে থাকেন। তাই রাজনৈতিক কারণে তাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করা সেই কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

নতুন আইন প্রসঙ্গে নূর খান বলেন, গুমের ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, তদন্তের দায়িত্ব কোনোভাবেই অভিযুক্ত বাহিনীর অধীন থাকা উচিত নয়। মানবাধিকার কমিশনের অধীন, পুলিশের বাইরে কোনো স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে অথবা অন্য কোনো স্বতন্ত্র ব্যবস্থায় তদন্ত করতে হবে। মিরাজ শেখের ঘটনায় পুলিশ ও কোস্টগার্ডের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্‌ঘাটনের দাবি জানান তিনি।

সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, আগে গুমের শিকার পরিবারগুলো আতঙ্কে দিন কাটালেও এখন সম্মানের সঙ্গে দিবসটি পালিত হচ্ছে। বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক মানের গুমবিরোধী ও মানবাধিকার কমিশন আইন করেছে। এতে কোনো ফাঁকফোকর রাখা হয়নি। প্রধান মাস্টারমাইন্ডরা কারাগারে রয়েছে। সঠিক বিচারের মাধ্যমে গুমের এই সংস্কৃতির চির অবসান ঘটবে।

সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান অভিযোগ করেন, নতুন গুমবিরোধী আইনের ধারা ১৪, ১৯ ও ২১ স্বাধীন তদন্তের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করছে। অবিলম্বে তিনি এই ধারাগুলো বাদ দেওয়ার দাবি জানান। গুমের বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে পর্যাপ্ত তহবিল ও জনবল নিশ্চিত করারও কথা বলেন আহমাদ বিন কাসেম। একই সঙ্গে গুমের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সম্মানজনক অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদেরও বিভিন্নভাবে হয়রানি ও বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। তাঁদের চাকরির সুযোগ দেওয়া হয়নি, শিক্ষার সুযোগ বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। এমনকি ব্যাংক হিসাবও নজরদারিতে রাখা হয়েছে। মানবাধিকার নিয়ে কথা বলতে চাইলেও তাঁদের ভয় দেখানো হয়েছে। এখন প্রস্তাবিত আইনে গুমের ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র তদন্তব্যবস্থা রাখার ওপর জোর দেন তিনি।

নিখোঁজ বাবা পারভেজ হোসেনের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মেয়ে আদিবা ইসলাম। তিনি বলেন, তাঁর বাবার শেষ পরিণতি কী হয়েছে, তা তাঁরা জানতে চান। এটি কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়। বাবা এখন কোথায়, কেমন আছেন—কিছুই তাঁরা জানেন না। দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে করতে তাঁরা ক্লান্ত। আর এভাবে অপেক্ষা ও কান্নার মধ্যে থাকতে চান না। বাবার বিষয়ে দ্রুত একটি জবাব চান তাঁরা।

অনুষ্ঠানে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলামের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের হিউম্যান রাইটস অফিসার জাহিদ হোসেন, নেত্র নিউজের নির্বাহী সম্পাদক নাজমুল আহসানসহ গুমের শিকার বিভিন্ন ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা।

আলোচনা অনুষ্ঠান আয়োজনের পাশাপাশি জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে ‘বলপূর্বক অন্তর্ধান’ নিয়ে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে মায়ের ডাক। ‘যতদিন না তারা ফিরছে’ শীর্ষক এই প্রদর্শনীর সমন্বয় করে নেত্র নিউজ।