‘আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’ ভালো নেই

১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রদের মিছিলের ওপর পুলিশের নির্বিচার হামলাছবি: সংগৃহীত

শত শত বছর ধরেই ভারতবর্ষ ছিল বহু সংস্কৃতি ও বহু ভাষা–সাহিত্যের দেশ। ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’, এই আদর্শেই গড়ে উঠেছিল তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক। মোগল আমলের মাঝামাঝি এর সুবর্ণ যুগ, বিশেষত আকবর–জাহাঙ্গীর–শাহজাহানের রাজত্বকালে। এই সময়েই স্থিত হয়েছিল একটা ভারতীয় সংস্কৃতি। ভারতবর্ষের দক্ষিণাঞ্চল বাদ দিয়ে হিন্দুস্তানি নামক ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’র বিকাশ এই পর্বে।

এর আগেই অবশ্য ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রধান ভাষাগুলোর বিকাশ ঘটেছে, যেগুলোর একটি পরিচয় হলো নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা। বাংলা ভাষা ছিল তার মধ্যে অগ্রসরমাণ অবস্থায়। দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মাঝামাঝিতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিকাশের যে পর্যায়ে পৌঁছেছিল, ভারতবর্ষের অন্য কোনো ভাষার সাহিত্য তা পারেনি। পাল রাজত্বে পূর্ব ভারতীয় ভাষায় যে বিকাশ সূচিত হয়েছিল, সেন রাজত্ব আর তুর্কি আক্রমণ মিলে তার গতিতে বাধা পড়ে। সেনরা ধর্মশাস্ত্রকে শুদ্ধ করার জন্য বাংলার বাইরে থেকে ব্রাহ্মণ নিয়ে এসেছিল। তুর্কি শাসনের পরও বাংলা সাহিত্যে ও ভাষায় পুনঃসংস্কৃতায়নের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। ‘কৃষ্ণকীর্তন’ বা ‘মনসামঙ্গল’–এর তুলনায় ‘চণ্ডীমঙ্গল’–এর পাঠে এর চিহ্ন আছে।

যে সময় নিয়ে আমরা কথা বলছি, তখনো রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন অবান্তর। তবে রাজসভায় বিভিন্ন ভাষার চর্চা হতো। তাতে হয়তো রাজার পছন্দের প্রতিফলন থাকত। মোগল আমলের কোনো এক পর্যায়ে ভারতবর্ষে ফারসির প্রভাব বৃদ্ধি পায়। এর কারণ, জমিজমার বিবরণ, রাজস্ব আদায়সংক্রান্ত দলিলপত্র, বিচারালয় ইত্যাদিতে ফারসির প্রচলন। ইংরেজরা এ দেশের রাজদণ্ড হাতে তুলে নেওয়ার পরও দীর্ঘদিন ফারসিই ছিল রাজত্ব চালানোর ভাষা। এই ধারা শেষ হয় উনিশ শতকের তিরিশের দশকে এসে। ইংরেজ শাসনের শেষ এগারো দশক রাজকাজের ভাষা নিরঙ্কুশভাবেই ইংরেজি। শুধু তা–ই নয়, বনেদি হওয়ার জন্যও অপরিহার্য ছিল ইংরেজি ভাষা রপ্ত করাসহ পাশ্চাত্য চালচলন। ভূগোলের মানচিত্র থেকে উপনিবেশ গেলেও সে মানসিকতা থেকে আমরা এখনো বেরিয়ে আসতে পারিনি।

তাহলে শাসকসমাজ আর এলিটের সঙ্গে সাধারণের ভাষা ব্যবহারের একটা পার্থক্য বরাবরই ছিল। ভারতচন্দ্র তাই ‘যবনী–মিশাল’ ভাষায় তাঁর কাব্য রচনা করেছেন। তবে এই দুই ভাষা ব্যবহারের মধ্যে সংঘাত মনে হয় আরও আগের। নইলে সপ্তদশ শতাব্দীর কবি আবদুল হাকিম নিজ ভাষায় যাদের মন জুড়ায় না, তাদের স্বদেশ ত্যাগ করে বিদেশে চলে যেতে উপদেশ দিতেন না। প্রসঙ্গত, ওই অপর ভাষা কী? ইংরেজি তো তখনো আসেনি। তাহলে সেটা ফারসি বা সংস্কৃত? তবে তখনো প্রশ্নটা রাষ্ট্রভাষা নিয়ে নয়, সাধারণের ভাষা ব্যবহারের মানসিকতা নিয়ে।

রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন এল, যখন সামন্ত সাম্রাজ্যগুলো ভেঙে রাষ্ট্র হলো। এর বিকাশ রেনেসাঁ–সমকালীন ইউরোপে, বিশেষত পশ্চিম ইউরোপে। দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মাঝামাঝি ইউরোপের ভাষা–সংস্কৃতিভিত্তিক রাষ্ট্রগুলো মাথা তুলে দাঁড়াল। এর বেশ কিছু দেশেই প্রধান ভাষা একটি। তবে কোথাও কোথাও একাধিক ভাষাও সমভাবে প্রচলিত ছিল। কিন্তু কোনো এক ভাষার আধিপত্য অন্য ভাষার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এমন ঘটা সম্ভব ছিল না।

ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের শেষ এগারোটি দশকজুড়ে সব সরকারি কাজ একমাত্র ইংরেজিতেই হয়েছিল। ভারতবর্ষীয় এলিটরাও ইংরেজিতে পারদর্শী হয়ে গিয়েছিলেন। সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনযাপনের বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য নিয়ে ভারতবর্ষকে ইউরোপের সঙ্গে তুলনা করলে ভুল হয় না। দার্শনিক রমাঁ রোলাঁ এই কথা বেশ জোর দিয়েই বলেছিলেন। কিন্তু ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভের পরও একটা অখণ্ড রাজ্য/রাষ্ট্র থাকবে, এমন ভাবনা থেকে অন্তত বিশ শতকের প্রথম দুই দশক পর্যন্ত কেউ বেরিয়ে আসতে পারেনি। ফলে ভবিষ্যৎ স্বাধীন ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় কাজকর্মের ভাষা কী হবে, তার হিসাব–নিকাশের মধ্যে বাংলা বা এই ধরনের ভাষার স্থান হয়নি। বাঙালি পণ্ডিতেরাও তখন এমন কোনো দাবি করেননি। এ ক্ষেত্রে হিন্দুস্তানি/ হিন্দি এবং এর অপর পিঠে উর্দুর কথাই অস্পষ্ট স্বরে হলেও বলা হচ্ছিল।

কিন্তু বিশ শতকের তৃতীয় দশকের মাঝামাঝি এসে স্বাধীনতার জন্য মুসলমান–হিন্দুর যে মিলিত সংগ্রাম, তাতে ফাটল স্পষ্ট হয়ে উঠল। পরের দশকের মাঝামাঝি যেন সিদ্ধান্তই হয়ে গেল যে ভারত স্বাধীন হবে দুই ভাগ হয়ে। তখন ‘মুসলমানদের রাষ্ট্র’ পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাজকর্মের ভাষা কী হবে, তা নিয়ে আগেভাগেই বিতর্ক শুরু হলো।

যে তত্ত্বের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে পাকিস্তানের মানচিত্র কল্পনা করা হলো, তাতে আয়তনের দিক থেকে পশ্চিমাঞ্চলই ছিল বড়। সেখানে মূলত চার ভাষাভাষীর মানুষ ছিল—সিন্ধি, পাঞ্জাবি, বেলুচ ও পশতু/পাকতুন। পূর্বাঞ্চলে ছিল বাংলাভাষীরাই। তখনো বিভক্তিরেখা চূড়ান্ত না হলেও ভবিষ্যৎ পাকিস্তানে যে বাংলাভাষীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে, তা–ও স্পষ্ট হয়ে উঠল। অন্য ভাষাভাষীর সংখ্যা সম্মিলিতভাবেও বাংলার চেয়ে কম, এককভাবে কোনো ভাষাভাষীর সংখ্যা বাংলার আশপাশে নয়।

ওই সময়ে ভবিষ্যৎ ভারতবর্ষের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছিল। এর রাষ্ট্রীয় দর্শন, জাতীয় সংগীত, রাষ্ট্রীয় কাজকর্মের ভাষা ইত্যাদি বিবেচনায় রাজনৈতিক গুরুদের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আইকনদের মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছিল। এর বিপরীতে ভবিষ্যৎ পাকিস্তান রাষ্ট্রের রূপরেখা নিয়েও কথা শুরু হয়।

চল্লিশের দশকে এসেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বিতর্কের শুরু। আলিগড়ভিত্তিক পণ্ডিতেরা এই বিতর্ক প্রথম উসকে দেন। তাঁদের মতে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত উর্দু, অথচ পাকিস্তানের পাঁচটি প্রধান অঞ্চলের কোনোটির ভাষা উর্দু নয়। তবে উত্তর প্রদেশের এবং বিহারের মুসলমানদের ভাষা মূলত উর্দু। পাকিস্তান আন্দোলনে মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ছাড়া লিয়াকত আলী খানসহ নেতারা ছিলেন উত্তর প্রদেশের এবং তাঁদের ভাষা ছিল উর্দু। পূর্ব বাংলার তথাকথিত বনেদি পরিবারগুলোর মধ্যেও উর্দু বলার একটা চল ছিল। মোট কথা আবার সেই এলিটের ভাষাই সামনে এল। উত্তর প্রদেশের উর্দুভাষীরা দেশভাগের পর পাড়ি জমাল করাচি ও সিন্ধুর অন্যান্য অঞ্চলে, বিহারের মানুষও পূর্ব বাংলায়। উর্দুর পক্ষে যুক্তি দেখানো হলো যে ওটা মুসলমানদের ভাষা। এর কারণটা অবশ্য একটি বাহ্যিক—বিকাশের একপর্যায়ে উর্দু ভাষা আরবি হরফে লেখা শুরু হয়। কিন্তু উর্দু ভাষাও যে বাংলার মতো ইন্দো–ইউরোপীয় ভাষাগত এবং সংস্কৃত–প্রাকৃতের সঙ্গে উর্দুর সম্পর্ক বাংলার মতোই, সে কথা তাঁরা বেমালুম চেপে গেলেন।

তবে ১৯৫৬ সালে যখন পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র প্রণীত হলো, তার আগেই পূর্ব বাংলায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের জোয়ার এবং মুসলিম লীগ শাসনের পতন ঘটে গেছে। ফলে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্রে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। তবে বাংলাকে সরকারি কাজকর্মে ব্যবহারের জন্য ২০ বছর সময় চাওয়া হয়েছিল। সেই ২০ বছর পার হওয়ার আগেই আমরা স্বাধীন হলাম।

স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে আর ২০ বছর বা কোনো বছরের অপেক্ষার অবকাশ নেই। বলা হলো, প্রজাতন্ত্রের ভাষা বাংলা। সব সরকারি কাজে বাংলার ব্যবহার শুধু বাধ্যতামূলক নয়, এর অন্যথার জন্য নিন্দা/ শাস্তিরও ব্যবস্থা আছে। সংবিধান গ্রহণের পর অর্ধশতকের মুখোমুখি আমরা। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলা ভাষা ব্যবহারে আমরা কতটা এগিয়েছি?

সরকারি বা জনপ্রশাসনের কাছে বাংলার ব্যবহার নিয়ে খুব ঘাটতি নেই। ইংরেজি পারদর্শী জনপ্রশাসকেরা বেশ আগেই অবসরে গেছেন। এখন সরকারি টোকা, নির্দেশ, বিজ্ঞপ্তি—সবই বাংলায় হয়। সরকারের শীর্ষস্থানীয়দের বাংলাপ্রীতি প্রশংসাযোগ্য।

আদালতের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি মিশ্র। নিম্ন আদালতে বাংলারই চল। সাক্ষ্য-সাবুদ-জেরা বাংলাতেই চলে। উকিলরা আইনের বই থেকে ইংরেজি বাক্য বা বাক্যাংশ ব্যবহার করেন। তবে তাতে ব্যাকরণ বা উচ্চারণের শুদ্ধতা নেই। উচ্চ আদালতে এখনো ইংরেজির প্রভাব প্রবল বলেই দেখছি। জেরা, সাক্ষ্য এবং কিছু কথোপকথন বাংলা হলেও আইনজীবীরা ইংরেজিতেই কি অধিকাংশ কথা বলেন না? তার চেয়ে বেশি ইংরেজির ব্যবহার হয় রায় লেখার ক্ষেত্রে। উচ্চ আদালতের বিচারকেরা ইংরেজিতে রায় লেখার ক্ষেত্রে নানা উপকরণগত সুবিধা এবং বাংলায় না লেখার ক্ষেত্রে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে পড়েন। এর মধ্যে রয়েছে আইনের বইয়ের ভাষা; পূর্ববর্তী মামলার রায়—বিশেষত বিদেশি আদালতে রায়গুলোকে উদাহরণ হিসেবে প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি। এসব প্রতিবন্ধকতা বাস্তবতা। তবে এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কোনো কোনো বিচারপতি বাংলায় রায় লিখেছিলেন। তাই প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে বাংলায় রায় লেখার পথে অগ্রসর হওয়ার কাজ এখনই শুরু করা দরকার।

বাংলা ভাষার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি পিছিয়েছে শিক্ষার ক্ষেত্রে। আর এর প্রকোপ প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে সবচেয়ে বেশি। গত শতকের ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় কয়েকটি মাত্র ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে আশির দশক থেকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল দ্রুত বাড়তে থাকে। এর মধ্যে কিছু স্কুল মানসম্মত। তবে কিন্ডারগার্টেন নামের অধিকাংশ স্কুলেই শিক্ষার মান অতিনিম্ন। কারণ, মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগসহ এর ব্যয় বহনের সামর্থ্য তাদের নেই। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শোচনীয় অবস্থার কথা গণমাধ্যমে অহরহ চোখে পড়ে। এ সুযোগে গ্রামেও ইংরেজি মাধ্যম স্কুল প্রতিষ্ঠা বাড়ছে এবং অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানদের সেখানে ভর্তি করছেন। শহরাঞ্চলে এই চাপ সামলাতে প্রতিষ্ঠিত বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলো নিজেদের ক্যাম্পাসে ‘ইংরেজি ভার্সন’ চালু করেছে। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক আরবি মাধ্যম শিক্ষালয়ে বাংলা শিক্ষা অত্যন্ত দুর্বল অথবা অনুপস্থিত। তাই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়েই বাংলা ভাষা সবচেয়ে বেশি প্রতিকূল অবস্থায় রয়েছে। সৃষ্টি হচ্ছে ইংরেজি ভাষানির্ভর এলিট ছাত্র, যারা নিজেদের মধ্যেও ইংরেজিতে কথা বলে।

উচ্চমাধ্যমিকে ইংরেজির প্রকোপ কম। ও লেভেল পর্যায়ে শিক্ষাদান করে, এমন স্কুল ছাড়া ইংরেজি মাধ্যম কলেজ বেশি নেই। তবে বিশেষ ব্যবস্থায় পরিচালিত বিশেষ কিছু স্কুল-কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েও ইংরেজির চর্চাকে খানদানি মনে করা হয়।

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলার অবস্থান আরও করুণ। কলা অনুষদের কয়েকটি বিষয় ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলায় শিক্ষাদান প্রায় অনুপস্থিত। এর প্রধান কারণ হিসেবে বাংলা পাঠ্যবইয়ের অভাবকে সামনে আনা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক ইংরেজি পাঠ্যবইনির্ভর। ওই অজুহাত ষাটের দশকেও তোলা হয়েছিল। কুদরত-এ-খুদার মতো বিজ্ঞানী রসায়নের পাঠ্যবই লিখে তার উত্তর দিয়েছিলেন। সত্তরের দশকেও এই উদ্যোগ বেগবান ছিল। কিন্তু সামরিক শাসনামলে ইংরেজির প্রতি ঝোঁক বাড়ে। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক যে খুব ভালো ইংরেজি জানেন, তা নয়। কিন্তু ইংরেজি শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ তাঁদের জন্য সহজ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জীববিজ্ঞান, বিজ্ঞান, চিকিৎসা বা প্রকৌশলে তাই বাংলায় পাঠদান প্রায় অনুপস্থিত। অথচ পাঠ্যবই তৈরি করে এর সমাধানে আমাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত ছিল এবং জাপানিরা এই কাজ অনেক আগেই সম্পন্ন করেছে।

মানসিকতার ক্ষেত্রেও বাংলা ব্যবহারে আমরা পিছিয়েছি। শহরে, এমনকি গ্রামেও বাংলা সাইনবোর্ডের স্থান দখল করে নিয়েছে ইংরেজি। যিনি ইংরেজি লিখতেও পারেন না, তিনিও সন্তানের বিয়ের কার্ড ছাপাচ্ছেন ইংরেজিতে। প্রাত্যহিক ব্যবহারে ইংরেজি শব্দ বাড়ছে। তার চেয়েও উৎকট বাংলা বাক্যের মধ্যে ইংরেজি শব্দ ঢুকিয়ে দেওয়া—বাট, সো ইত্যাদি।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্রমে ইংরেজির ব্যবহার নিরঙ্কুশ হচ্ছে। ব্যাংক বা বিমার সব হিসাব-নিকাশ ইংরেজিতেই। তাদের খুদে বার্তা বা গ্রাহককে প্রদত্ত হিসাবও দেওয়া হয় ইংরেজিতেই। বহুজাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি দেশীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজও এখন ইংরেজিতেই হচ্ছে। এ জন্য অনেক সময় কম্পিউটারে বাংলা ব্যবহারের সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করা হয়। চীনা বা জাপানিরা অনেক আগেই এর সমাধান করেছে।

সব মিলিয়ে ‘আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’ ভালো নেই! এর জন্য দায়ী আমাদের উদ্যোগ ও পরিকল্পনার অভাব, বাস্তব ব্যবস্থা গ্রহণে ধীরগতি এবং হীনম্মন্যতা। কিন্তু একটি স্বাধীন দেশ ও জাতির জন্য এ অবস্থা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমাদের অবশ্যই এর থেকে বেরিয়ে এসে সর্বস্তরে বাংলা চালু করতে হবে।

● সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ: রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।