জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণের দাবি
দেশে ২০২৫-২৬ সালে জাহাজভাঙা শিল্পের গ্রিন সার্টিফায়েড (পরিবেশবান্ধব) ইয়ার্ডগুলোতে প্রায় ৮৪টি দুর্ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে গ্যাস বিস্ফোরণ, ওপর থেকে পড়ে যাওয়া, কাজের সময় হাত-পায়ে আঘাত পাওয়া কিংবা পুড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এই শিল্পের শ্রমিকদের যথাযথ নিরাপত্তাসামগ্রী নিশ্চিত করা হয় না। ফলে বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা সামান্য ক্ষতিপূরণ পান। তাই ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করা জরুরি।
সোমবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এ কথাগুলো বলেন। ‘জাহাজ ভাঙার মানবিক মূল্য: বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পে জবাবদিহিতা, প্রতিকার ও পুনরাবৃত্তি রোধ’ শীর্ষক এ আলোচনা সভার আয়োজন করে সকল প্রাণের নিরাপত্তা (সপ্রান) ও ‘অল ভিক্টিমস অ্যান্ড ভেটেরান্স নেটওয়ার্ক’ (এভিএন)।
২০২৪ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের এস এন করপোরেশন নামের জাহাজভাঙা কারখানায় পুরোনো জাহাজ কাটার সময় বিস্ফোরণে সাতজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। আলোচনায় জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকের মৃত্যু, জবাবদিহির ঘাটতি এবং ক্ষতিপূরণ ও প্রতিকারের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সপ্রানের গবেষক অপসরা ইসলাম। প্রবন্ধে বলা হয়, ২০২৪ সালের ঘটনাটি আলাদা কোনো ঘটনা ছিল না। ২০১৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এস এন করপোরেশন নামের ওই জাহাজভাঙা কারখানার তিনটি ইয়ার্ডে ১০ জনের মৃত্যু এবং ৩০ জনের মতো দুর্ঘটনার শিকার হন। ক্ষতিগ্রস্ত এসব শ্রমিককে কোনো নিরাপত্তা উপকরণ দেওয়া হয়নি।
সভায় ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা তাঁদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। ২০২৪ সালে নিহত হাবিবুর রহমানের স্ত্রী সাবিনা খাতুন জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর পাওয়া অর্থ দিয়ে পরিবারের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, ‘একজন মানুষ মারা গেলে তার জীবনের মূল্য কি মাত্র ৭ লাখ টাকা?’ এ সময় ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার দাবি জানান।
জাহাজভাঙা শিল্পের কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট করা জরুরি বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘শিপব্রেকিংয়ের ক্ষেত্রে আইনের বাস্তবায়নের চেয়ে জরুরি হচ্ছে শিপব্রেকিংয়ের অনেকগুলো আইন হয়ে গেছে। বলা হতো এটা আরও সুনির্দিষ্ট হবে। কিন্তু চার–পাঁচটা কর্তৃপক্ষ এবং তাদের আলাদা আলাদা আইন। এদের মধ্যে সমন্বয় খুবই কম। যার জন্য এক কর্তৃপক্ষ আরেক কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে।’
দুর্ঘটনার পর তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া প্রসঙ্গে সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘শিপব্রেকিংয়ের ক্ষেত্রে প্রতিটি দুর্ঘটনায় একই রকম হলেও কোনো তদন্ত রিপোর্ট বের হয় না। যার জন্য মানুষ ওই একটি দুর্ঘটনা কী কী কারণে ঘটেছিল, এটা জেনে যে সতর্ক হবে, সেটা কিন্তু হয় না।’
দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি মানদণ্ড নির্ধারণের আহ্বান জানান বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) সহকারী পরিচালক মো. তৈয়্যেবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ক্ষতিপূরণের একটা মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে, কোনো অঙ্ক নয়। এক লাখ টাকা কিংবা দুই লাখ টাকা তো একজন মানুষের জীবনের মূল্য হতে পারে না।’ একজন শ্রমিক কোন বয়সে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং আরও কত বছর কাজ করতে পারতেন, সেসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি শ্রমিকের মৃত্যু বা কর্মক্ষমতা হারানোর কারণে তাঁর পরিবারের মানসিক কষ্ট বিবেচনায় নিয়ে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের আহ্বান জানান তিনি।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের আইনের শাসনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা রোমানা শোয়াইগার বলেন, ‘গত দুই বছরে লিগ্যাল এইড সেবা আরও শক্তিশালী হয়েছে। আমি মনে করি, আপনারা এই আইনি সহায়তা ব্যবস্থার সুবিধা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন। ভবিষ্যতে আইনি সহায়তা প্রদানকারীদের শুধু কোনো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর নয়, বরং তার আগেই শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজে লাগানো উচিত।’
জাহাজভাঙা শিল্পে অধিকার আদায়ের বিষয়টিকে শ্রমিকদের জন্য একটি অসম যুদ্ধ বলে মন্তব্য করেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আসলে ট্রাইপার্টি বলতে কিছু নাই। বাংলাদেশে একটা বলা হয় যে মালিকপক্ষ, শ্রমিকপক্ষ এবং রাষ্ট্র। বাংলাদেশে মালিকপক্ষ, রাষ্ট্র এক হয়ে গেছে। শ্রমিকপক্ষ হয়ে গেছে আলাদা।’
আবদুল্লাহ আল আমিন আরও বলেন, ‘আমরা মানবাধিকারের কথা বলি। কিন্তু বাংলাদেশের সংকটা হলো এখানে নাগরিকের ধারণাটাই আসলে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আমি একজন সংসদ সদস্য, আমি একধরনের নাগরিক। ওই শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে যিনি মারা গেছেন, উনি আরেক ধরনের নাগরিক।’
সভায় আরও বক্তব্য দেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) সহকারী মানবাধিকার কর্মকর্তা সায়মা করিম শ্যানন এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নীতি ও প্রচার সমন্বয়ক বারিশ হাসান চৌধুরী। সপ্রানের গবেষক জেবা সাজিদা সারাফ আলোচনা সভাটি সঞ্চালনা করেন।