জ্বালানি তেল কিনতে লাইন ছাড়িয়েছে এক কিলোমিটার, বন্ধ পাম্পেও অপেক্ষা

তেল নিতে দীর্ঘ লাইনে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত যানের চালকেরা। পরীবাগ এলাকাছবি: প্রথম আলো

রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে আজ সোমবারও জ্বালানি তেল কিনতে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। কিছু ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে।

যেসব স্টেশনে জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ রয়েছে, সেগুলোতেও ডিজেল, পেট্রল ও অকটেন কেনার আশায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ও বিভিন্ন যানবাহনের চালকেরা।

চালকেরা বলছেন, গাড়ি চালিয়ে অন্য আরেকটি পাম্পে যাওয়ার মতো অবস্থা নেই। কারও তেল একেবারে ফুরিয়ে গেছে, কারও কারও তেল প্রায় শেষ। তাই যেখানে লাইনে দাঁড়িয়েছেন, সেখানেই অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। পাম্প ছেড়ে যাওয়া মানে গাড়ি ঠেলে নিয়ে যাওয়া।

অন্যদিকে যেসব পাম্পে জ্বালানি তেল বিক্রি চলছে, সেসব পাম্পে এক থেকে দেড় কিলোমিটার পর্যন্ত মোটরসাইকেল ও বিভিন্ন যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। চালকদের কেউ কেউ দেড় থেকে দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

জ্বালানি তেল নিতে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত যানের দীর্ঘ লাইন। আসাদগেট এলাকা
ছবি: প্রথম আলো

আজ সকালে মিরপুর, কল্যাণপুর, মোহাম্মদপুর, বিজয়সরণি ও কালশী এলাকার ৯টি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায় ৩টিতে বিক্রি বন্ধ। একটিতে শুধু ডিজেল ও একটিতে শুধু অকটেন বিক্রি করতে দেখা গেছে। বাকি চারটিতে অকটেন ও ডিজেল বিক্রি করা হয়।

সকাল ৯টার দিকে মিরপুর-২ নম্বরের স্যাম অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড পাম্পের প্রায় ৩০০ মিটার আগে ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সামনে থেকে প্রাইভেট কার ও অন্যান্য যানবাহনের সারি দেখা যায়। আরও কিছুদূর সামনে থেকে ছিল মোটরসাইকেলের সারি। সামনে গিয়ে দেখা যায়, পাম্পটিতে বিক্রি বন্ধ আছে। একজন নিরাপত্তাকর্মী দাঁড়িয়ে থেকে সবাইকে বলছেন, পাম্পে তেল নেই। তাই বিক্রি বন্ধ। ডিপো থেকে তেলের গাড়ি না আসা পর্যন্ত বিক্রি শুরু করা যাবে না।

পাম্পের ভেতরে গিয়ে কথা হয় ক্যাশিয়ার আরাফাত স্বপ্নীলের সঙ্গে। তিনি জানান, গতকাল রোববার বিকেল চারটার দিকে এক গাড়িতে সাড়ে চার হাজার লিটার অকটেন পেয়েছিলেন। রাত সাড়ে ১০টার মধ্যেই বিক্রি শেষ হয়ে যায়। এর পর থেকেই পাম্প বন্ধ রাখা হয়েছে।

বিজয় সরণি এলাকায় ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল নিতে দীর্ঘ লাইন
ছবি: প্রথম আলো

তেলের গাড়ি নারায়ণগঞ্জ ডিপোতে গেছে, কবে আসবে ঠিক নেই। গাড়ি তেল নিয়ে এলেই বিক্রি শুরু করবেন বলেও জানালেন তিনি।

ওই পাম্পের সামনে সকাল সাড়ে সাতটা থেকে জ্বালানির জন্য অপেক্ষা করছিলেন মোটরসাইকেলচালক সেলিম মিয়া। তিনি অ্যাপে রাইড শেয়ারিং করেন।

সেলিম মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছি। তেল বিক্রি করছে না। অন্য পাম্পে যাওয়ারও উপায় নেই। বাইক ঠেলতে হবে। আর রোজা রেখে বাইক ঠেলে নেওয়ার মতো অবস্থা নাই।’

পরে কল্যাণপুরের খালেক ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, জ্বালানি তেল বিক্রির অংশটি বন্ধ। পাম্পটিতে শুধু সিএনজি গ্যাস বিক্রি করা হচ্ছিল। সাড়ে ৯টার দিকে জ্বালানি তেল বিক্রির অংশের ক্যাশ কাউন্টার ও পাশে ব্যবস্থাপকের কক্ষ, দুটিই বন্ধ দেখা গেছে।

খালেক পাম্পের ঠিক উল্টোপাশের কমফোর্ট ফিলিং অ্যান্ড সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনেও একইভাবে শুধু সিএনজি গ্যাস বিক্রি চলছিল। পাম্পটির প্রবেশপথেই ‘তেল নাই’ লেখা একটি স্ট্যান্ড দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে।

পৌনে ১০টার দিকে আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনে গিয়ে জ্বালানি তেল ডিজেল ও অকটেন বিক্রি করতে দেখা গেছে। এই পাম্পে প্রবেশের আগে জিয়া উদ্যানসংলগ্ন লেকের প্রধান সেতুর অংশ থেকে প্রাইভেট কারের সারি দেখা গেছে। পাম্প থেকে এই অংশের দূরত্ব প্রায় সোয়া এক কিলোমিটার।

সকাল ১০টার দিকে সেখানে কথা হয় ব্যাক্তিগত গাড়ির চালক মহসিন হোসেনের সঙ্গে। সকাল ৯টার কিছু আগে তিনি লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন বলে জানালেন। আর সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে তাঁর গাড়িটি ছিল ৩টি গাড়ির পেছনে।

মহসিন হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সংকট শুরুর পর আজকেই প্রথম জ্বালানি নিচ্ছেন। গতকাল নিতে চেয়েছিলেন, তবে লাইন অনেক লম্বা দেখে আর নেননি। গতকাল প্রাইভেট কারের লাইন মণিপুরীপাড়া চলে গিয়েছিল বলেও জানান তিনি।

এই পাম্পে কথা হয় ক্যাশিয়ার মোহাম্মদ আজমের সঙ্গে। সকাল ১০টার দিকে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল রাতে দুই গাড়িতে ২৭ হাজার লিটার অকটেন এসেছিল। এর মধ্যে ২০ হাজার লিটার বিক্রি হয়ে গেছে। আরও ৭ হাজারের মতো রয়েছে। এটি ফুরিয়ে গেলে আর ডিপোতে যাওয়া গাড়ি এর মধ্যে না এলে তাঁদেরও বিক্রি বন্ধ করা লাগবে।

আসাদগেট এলাকার ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল নেওয়ার লাইন চলে গেছে চন্দ্রিমা উদ্যানেও
ছবি: প্রথম আলো

সোয়া ১০টার দিকে শেওড়াপাড়া এলাকার কাছাকাছি দুটি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে মেসার্স সবুর ফিলিং স্টেশন বন্ধ দেখা যায়। আর এ এস ফিলিং স্টেশনে শুধু ডিজেল বিক্রি করা হচ্ছিল। এ এস ফিলিং স্টেশনের সামনে মূল রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে একজন নিরাপত্তাকর্মীকে সবাইকে বলছিলেন, পেট্রল-অকটেন নেই। শুধু ডিজেল বিক্রি হচ্ছে।

সবচেয়ে লম্বা সারি দেখা যায় বিজয়সরণিসংলগ্ন ট্রাস্ট পাম্পে। আজ বেলা পৌনে ১১টার দিকে ওই পাম্প থেকে জ্বালানি নিতে দেড় কিলোমিটারের চেয়ে বেশি লম্বা প্রাইভেট কারের লাইন দেখা গেছে। ব্যক্তিগত গাড়ির সারি জাহাঙ্গীরগেট ছাড়িয়ে মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আর এই পাম্পে মোটরসাইকেলের সারি ছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মূল ফটক পর্যন্ত।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কালশীর সুমাত্রা ফিলিং স্টেশনের সামনে গিয়ে দেখা যায়, এ পাম্পটির সামনেও যানবাহনের দীর্ঘ সারি। এখানে পাম্প থেকে প্রাইভেট কারের সারি ইসিবি চত্বরের কাছে গিয়ে ঠেকেছে।