বিচিত্র সব দৃশ্য ও গল্প
বইমেলায় পাঠক-দর্শনার্থীদের আগমন মানেই বিচিত্র সব দৃশ্য ও গল্পের জন্ম। ১০ কিশোর-কিশোরী। সবাই রাজধানীর একটি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে। বন্ধুরা মিলে এসেছে মেলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির ফটক দিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলায় ঢোকার মুখে হইহল্লা চলছিল তাদের। একজন বাবল ফোলাচ্ছিল। আরেকজন প্লাস্টিকের উড়োজাহাজ উড়িয়ে দিয়ে আবার ছুটে গিয়ে ধরছিল। তাদের মধ্যে শান্ত ও বর্ষার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবার দ্বিতীয়বারের মতো বইমেলায় এসেছে। তারা প্রত্যেকে অন্তত একটি বই কিনবে। তারপর একে অপরকে উপহার দেবে—এটাই পরিকল্পনা।
মেলার ফটক দিয়ে ঢুকতেই দেখা হয় সত্তরোর্ধ্ব মোস্তফা মিয়ার সঙ্গে। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী এই প্রবীণের বাড়ি সিলেটে। গত মাসে দেশে এসেছেন। মেলায় সঙ্গে এনেছেন ছেলেকে। বই কেনার প্রসঙ্গ উঠতেই আক্ষেপের সুর মোস্তফা মিয়ার কণ্ঠে, ‘এখন আর অত চোখেও দেখি না। পড়তেও পারি না। তবে নিজের জন্য না হলেও ছেলের জন্য বই তো কিনবই।’
হাঁটতে হাঁটতে তখন বিকেল। মেলায় ততক্ষণে ভিড় জমতে শুরু করেছে। তরুণদের উপস্থিতিই বেশি। প্রথমা প্রকাশনের সামনে ছোট্ট জটলা। গিয়ে দেখা গেল, কবি ও প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফের সঙ্গে দাঁড়িয়ে প্রথমা প্রকাশিত ইংরেজি বই দেখছেন ডোমিনিকান রিপাবলিকের রাষ্ট্রদূত দাভিদ পুইগ ও তাঁর বান্ধবী। এ সময় পাশে থাকা কয়েকজন পাঠকও আগ্রহী হয়ে ইংরেজি বই দেখতে থাকেন।
প্রথমার প্যাভিলিয়নের অপর পাশ থেকে একজনের উচ্চ কণ্ঠ শুনে সেখানে গিয়ে জানা গেল, তাঁর নাম ময়জুল ইসলাম। একটি সরকারি ব্যাংকের সাবেক এই কর্মকর্তার অভিযোগ, মেলায় পছন্দের স্টল খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়েছে তাঁকে। এই প্রতিবেদকের মাধ্যমে তিনি মেলা কর্তৃপক্ষের কাছে একটা বার্তাও দিয়েছেন, পরবর্তী সময়ে যেন একটা খুদে বার্তা ব্যবস্থা চালু করা হয়, যেখানে বার্তা পাঠিয়ে জেনে নেওয়া যাবে কাঙ্ক্ষিত প্রকাশনার স্টল নম্বর ও অবস্থান।
সন্ধ্যায় অনেক পাঠকের হাতেই ছিল বইয়ের ব্যাগ। মাওলা ব্রাদার্সের সামনে বই দেখছিলেন তরুণ কবি রুমান শরীফ। কী বই কিনেছেন জানতে চাইলে বলেন, আল মাহমুদের গল্পসমগ্র। একটু সামনেই প্রকাশনা সংস্থা ঐতিহ্যের প্যাভিলিয়ন। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক আমজাদ কাজলের ভাষ্য, এবার মেলার পূর্বাভাস ভালো। অনুবাদের পাশাপাশি প্রবন্ধের বই বেশি চলছে তাঁদের।
সন্ধ্যায় উদ্যানের অপর পাশে বাংলা একাডেমির ভেতরে মূল মঞ্চে চলছিল প্রয়াত কবি কাজী রোজী এবং লেখক দিলারা হাশেমের স্মরণে আলোচনা অনুষ্ঠান। তথ্যকেন্দ্রে গিয়ে জানা গেল, গতকাল সোমবার মেলায় মোট বই এসেছে ১২১টি। এর মধ্যে কবিতার বই ৩২টি ও উপন্যাস ২৪টি। এদিন পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৪২৪।
রাত বাড়ে। ঘন হয়ে আসা আড্ডাও ভাঙতে থাকে। মাইকে ঘোষণা হয় সেদিনকার মতো মেলা শেষ হওয়ার সময়। লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে তখনো কয়েকজন তরুণ কবি গোল হয়ে গল্প করছিলেন। তাঁদের প্রত্যেকের হাতে একটি ভাঁজপত্র। তাঁরা সবাই মিলে সম্পাদনা করেন এটি। জানালেন, মেলায় প্রতিদিন এটি বের হয়—যা উন্মুক্ত শুভেচ্ছামূল্যে কিনতে পারেন পাঠকেরা।
ফিরতে ফিরতে তাঁদের একজনের প্রশ্ন, ‘এত লোক যে আসেন মেলায়, সবাই কি বই কেনেন?’ এক সঙ্গীর জবাব, ‘বই দেখতে দেখতেই দর্শকের রূপান্তর ঘটে। তাঁরাও হয়ে ওঠেন পাঠক। ফলে এ ভিড় ইতিবাচক।’
রক্তাক্ত দিনগুলো
১৯৭৫-৮১ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক উত্তাল সময়। এ সময়ের মধ্যে ঘটে গেছে এমন কিছু ঘটনা, যা আমাদের রাজনৈতিক চেহারা একদম পাল্টে দিয়েছিল। সেই সব ঘটনা নিয়ে রয়েছে অনেক আলোচনা-সমালোচনা। আগস্ট হত্যাকাণ্ড, নভেম্বরের জেলহত্যা, সেনাবাহিনীর ক্ষমতা হাতে নেওয়া। এরপর ঘটে পাল্টাপাল্টি অভ্যুত্থান।
সেই ক্রান্তিকালের ঘটনাবলি নিয়ে লেখা রক্তাক্ত দিনগুলো: ১৯৭৫-৮১ অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতা। বইটি পড়লে পাঠকেরা সে সময়ের দেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাবেন। সময়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে লেখক এ বইয়ে সচেতনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন ইতিহাস।
এম সাখাওয়াত হোসেনের বইটি প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশন। দাম ৫২০ টাকা। বইমেলায় পাওয়া যাবে প্রথমার প্যাভিলিয়নে।