জিন্নাহকে নিয়ে কেন এই প্রতিবাদ

ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি লাগানোর পর গতকাল তা ছিঁড়ে ফেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীছবি: প্রথম আলো

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি রাখা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। আলোচনা ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে এক পক্ষ তাঁকে উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রধান নেতা হিসেবে তুলে ধরছে। অন্য পক্ষ মনে করিয়ে দিচ্ছে, এই জিন্নাহই ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেছিলেন। তাঁর সেই ঘোষণার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এর ধারাবাহিকতায় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি আদায় করেছিলেন রফিক, জব্বার, সালাম, বরকতরা।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) ও পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের গভর্নর জেনারেল হয়েছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। এই দেশভাগের পেছনে তাঁর বড় ভূমিকা ছিল।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটি দ্রুত পূর্ব বাংলার রাজনীতির অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে তমদ্দুন মজলিসের প্রকাশিত পুস্তিকায় পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষেত্রে বাংলা ও উর্দু—দুই ভাষা ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকায় তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসভায় জিন্নাহ ঘোষণা দেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। মার্কিন ইতিহাসবিদ স্ট্যানলি ওলপার্টের মতে, ভাষাসংক্রান্ত জিন্নাহর এই বক্তব্য ছিল তৎকালীন পাকিস্তান রাজনীতির সবচেয়ে উদ্বায়ী, বিতর্কিত ও বিভাজন সৃষ্টিকারী বিষয়।

ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর এই ছবি রাখা হয়েছিল, যা ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক জানিয়ে এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ
ছবি: প্রথম আলো

‘ঢাকায় জিন্নাহ’ বইয়ের ভূমিকায় মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় জিন্নাহর জনপ্রিয়তা ছিল প্রবাদপ্রতিম। তাঁকে বলা হতো ‘কায়েদে আজম’ অর্থাৎ মহান নেতা। তবে জিন্নাহর ওই ভাষণের পর বাঙালি ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী সমাজ সেটিকে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত হিসেবে গণ্য করে। এর ফলে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে চলমান আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, যা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের পটভূমি প্রস্তুত করে।

জিন্নাহর জন্ম ও বেড়ে ওঠা

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর জন্ম ১৮৭৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর পাকিস্তানের করাচিতে। করাচির নিউনহাম রোডের ‘ওয়াজির ম্যানশন’ তাঁর জন্মস্থান। করাচি তখন ব্রিটিশ ভারতের বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ছিল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ করাচি ও বোম্বে লেখাপড়া করে উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনে যান। সেখানে আইন পড়ে ব্যারিস্টার হন। পরে বোম্বে এসে আইন পেশায় প্রতিষ্ঠা পান।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাকালীন গভর্নর জেনারেল

মার্কিন ইতিহাসবিদ স্ট্যানলি ওলপার্টের লেখা ‘জিন্নাহ অব পাকিস্তান’ গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, লন্ডনে ছাত্রাবস্থাতেই রাজনীতির প্রতি জিন্নাহর আগ্রহ তৈরি হয়। লন্ডনে আইন পড়ার সময় তিনি নিয়মিত ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বিতর্ক পর্যবেক্ষণ করতেন এবং ১৮৯২ সালে দাদাভাই নওরোজির (ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব) নির্বাচনী প্রচারে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশ নেন।

নওরোজির উদারনৈতিক চিন্তাধারা তাঁকে প্রভাবিত করে। ভারতে ফিরে বোম্বে হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর জিন্নাহ ১৯০৪ সালে প্রথম কংগ্রেসের অধিবেশনে অংশ নেন। ১৯০৫ সালে কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা গোপাল কৃষ্ণ গোখলের সঙ্গে লন্ডন সফরের সুযোগ পান। গোপাল কৃষ্ণ গোখলকে রাজনৈতিক গুরু হিসেবে মানতেন জিন্নাহ। ১৯০৬ সালে কলকাতায় কংগ্রেসের অধিবেশনে সভাপতি দাদাভাই নওরোজির ব্যক্তিগত সচিবের দায়িত্ব পালন করে জিন্নাহ সর্বভারতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান জোরালো করেন।

নিউজিল্যান্ডের লেখক হেক্টর বলথো জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে ‘জিন্নাহ: ক্রিয়েটর অব পাকিস্তান’ নামে একটি বই লিখেছেন। বইটিতে জিন্নাহর রাজনীতিতে প্রবেশ থেকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের বর্ণনা পাওয়া যায়।

বইটিতে বলা হয়েছে, ১৯১০ সালে জিন্নাহ ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯১৩ সালে মুসলিম লীগে যোগ দিলেও কংগ্রেসের সঙ্গেও তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত ছিল।

১৯১৬ সালের লক্ষ্ণৌ চুক্তিতে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের ক্ষেত্রে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবে ১৯২০ সালে গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের পদ্ধতির সঙ্গে মতবিরোধের জেরে কংগ্রেস ছাড়েন তিনি। এরপর লন্ডনে কিছু সময় কাটিয়ে ১৯৩৪ সালে ভারতে ফিরে মুসলিম লীগকে পুনর্গঠনে মনোযোগ দেন। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের পর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবিতে তিনি আরও দৃঢ় অবস্থান নেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে দেশটির প্রথম গভর্নর জেনারেল হন জিন্নাহ। যক্ষ্মা ও দীর্ঘদিনের ফুসফুসের অসুস্থতায় ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর করাচিতে তাঁর মৃত্যু হয়।

দেশভাগে ভূমিকা

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতেই ভারত ভাগ হয়েছিল বলে একটি কথা প্রচলিত আছে। ভারত ভাগের পেছনে তাহলে একক ভূমিকা কি জিন্নাহরই ছিল?

ভারতীয় লেখক যশবন্ত সিং তাঁর ‘জিন্নাহ: ইন্ডিয়া–পার্টিশন–ইনডিপেনডেন্স’ বইয়ে উপমহাদেশ ভাগের জন্য জিন্নাহকে এককভাবে দায়ী করার প্রচলিত ধারণা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণে, দেশভাগ শুধু জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব বা রাজনৈতিক অবস্থানের ফল ছিল না; এর পেছনে কংগ্রেসের কিছু রাজনৈতিক ভুল, মুসলিম লীগের কৌশল এবং ব্রিটিশদের নীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

বইটিতে বলা হয়েছে, ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের পর উত্তর প্রদেশে কংগ্রেস মুসলিম লীগের সঙ্গে সরকার গঠনে রাজি না হওয়ায় জিন্নাহর রাজনৈতিক অবস্থান আরও কঠোর হয়। একইভাবে ১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা (ব্রিটিশ সরকারের একটি প্রস্তাব, যা ভারতে ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে সৃষ্ট অচলাবস্থা নিরসনের জন্য আনা হয়েছিল) নিয়ে জওহরলাল নেহরুর বক্তব্য জিন্নাহর মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করে। পরে জিন্নাহ পরিকল্পনা থেকে সরে গিয়ে ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’–এর ডাক দেন।

যশবন্ত সিংয়ের বিশ্লেষণে ব্রিটিশদের ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতি এবং শেষ পর্যায়ে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের তড়িঘড়ি করে ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্তও দেশভাগের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অর্থাৎ তাঁর দৃষ্টিতে দেশভাগ ছিল জিন্নাহ, মুসলিম লীগ, কংগ্রেস ও ব্রিটিশ শাসকদের নানা সিদ্ধান্ত ও ব্যর্থতার সম্মিলিত ফল।

বাংলাদেশের লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর ‘ঢাকায় জিন্নাহ’ বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর একক নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যদিও পাকিস্তান আন্দোলনের কারণে কোটি কোটি মানুষকে অবর্ণনীয় দুঃখ–কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রাণ গেছে হাজার হাজার নিরীহ মানুষের। এক কোটির বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। ইচ্ছার বিরুদ্ধে এত বড় বাস্তুচ্যুতির ঘটনা সাম্প্রতিক ইতিহাসে আর নেই।

জিন্নাহর ব্যক্তিগত জীবন ও ধর্মীয় পরিচয় ঘিরে বিতর্ক

ইতিহাসবিদ স্ট্যানলি ওলপার্টের গ্রন্থে জিন্নাহর ধর্মীয় পরিচয় ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা বিতর্কের উল্লেখ পাওয়া যায়। বইটিতে বলা হয়েছে, জন্মসূত্রে তিনি আগা খানপন্থী ইসমাইলি খোজা সম্প্রদায়ের ছিলেন। পরে তিনি ইশনা আশারি বা বারো ইমামি শিয়া ধারার অনুসারী হন। তাঁর পাশ্চাত্য পোশাক, ইংরেজিতে কথা বলা ও জীবনযাপন নিয়ে রক্ষণশীল মুসলিম ও ওলামাদের একাংশের সমালোচনাও ছিল। জিন্নাহর ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও ধর্মীয় বিতর্ক ছিল।

বোন ফাতিমা ও মেয়ে দিনার সঙ্গে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ
ছবি: এএফপি

জিন্নাহ নিজেও নিজেকে ধর্মীয় নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে আগ্রহী ছিলেন না বলে উল্লেখ করা হয়েছে নিউজিল্যান্ডের লেখক হেক্টর বলথোর গ্রন্থে। সেখানে বলা হয়েছে, একবার একটি শোভাযাত্রায় তাঁকে ‘মাওলানা জিন্নাহ’ বলা হলে তিনি শোভাযাত্রা থামিয়ে জানান, তিনি কোনো ধর্মীয় নেতা নন, তিনি রাজনৈতিক নেতা। তবে ভারতীয় মুসলিমদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার নিয়ে তাঁর অবস্থানকে কেউ ‘সাম্প্রদায়িক’ বললে তিনি সেই পরিচয় গ্রহণ করতেও আপত্তি করেননি।

হেক্টর বলথোর ও যশবন্ত সিংয়ের লেখায় জিন্নাহর বক্তব্য ও রাজনৈতিক চিন্তার আলোকে তাঁর কাঙ্ক্ষিত পাকিস্তানের একটি ধারণা পাওয়া যায়। সেখানে জিন্নাহকে কেবল মুসলিমদের জন্য একটি রাষ্ট্রের প্রবক্তা হিসেবে নয়; বরং গণতন্ত্র, সম–অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশী নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

আবুল আ’লা মওদুদি ১৯৪১ সালে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করেন। পাকিস্তান আন্দোলনের সময় তিনি মুসলিম লীগে যোগ দেননি এবং জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের রাজনীতির সমালোচনা করেন। মওদুদির আপত্তি ছিল, শুধু মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে একটি ভূখণ্ডভিত্তিক রাষ্ট্র তৈরি করলেই সেটি ইসলামি রাষ্ট্র হবে না। তাঁর মতে, পশ্চিমা ধাঁচের আইন, গণতন্ত্র ও জনপ্রভুত্বের ভিত্তিতে মুসলমানদের পরিচালিত রাষ্ট্রও অনৈসলামিক হতে পারে। মুসলিম লীগ ‘মুসলমানের শাসন’ চাইছিল, কিন্তু মওদুদি চাইছিলেন ‘ইসলামের শাসন’।

প্রতিবাদকারীরা যা বললেন

ডাকসু সংগ্রহশালা সংস্কারের পর গত রোববার চালু করা হয়। সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকার কোনো ঐতিহাসিক ছবি রাখা হয়নি, যুক্ত করা হয়েছে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি। এ খবর প্রকাশের পর রোববার রাত থেকেই ফেসবুকে সমালোচনা শুরু হয়।

এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী শাহরিয়ার মুসতাক ফেসবুকে লেখেন, ‘আর কত সময় হলে বাংলা ভাষা এবং বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসা জন্মাবে এই ডাকসুর? রাষ্ট্রভাষা বাংলার বিরোধিতাকারীর ছবি স্থান পায় ডাকসুর সংগ্রহশালায়!’

এরপর জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশনসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি রাখার প্রতিবাদ জানানো হয়। ভাষা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিকভাবে ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে সংগঠনগুলো।

গতকাল সোমবার দুপুরে ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে ফেলেন শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার

এর মধ্যে গতকাল দুপুরে ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে ফেলেন আবু তৈয়ব হাবিলদার নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। এ সময় তিনি বলেন, ‘এটা জিন্নাহর বাংলাদেশ নয়, এটা শেখ মুজিবের বাংলাদেশ, ভাসানীর বাংলাদেশ; এটা ভাসানীর বাংলাদেশ, জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশ। এখানে কোনো খলনায়কের ছবি থাকতে পারে না।’

আবু তৈয়ব হাবিলদার জিন্নাহর ছবি ভাঙচুর ও বক্তব্য দেওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ। জিন্নাহর ছবি রাখার পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, জিন্নাহর ছবি রাখার পাশাপাশি ছবির নিচে তাঁর বাংলা ভাষাবিরোধী অবস্থানের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর যুক্তি, ছবি না রাখলে জিন্নাহর বাংলা ভাষাবিরোধী অবস্থান ইতিহাস থেকে আড়াল করা হয়েছে—এমন প্রশ্ন উঠতে পারত।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান মনে করছেন, ডাকসু সংগ্রহশালা সংস্কারের নামে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ও স্মারকগুলোকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে এসব ছবি যুক্ত করে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন ইতিহাস তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে। এটা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেতনার সঙ্গে যায় না।

ডাকসুর প্রবেশপথ এবং ডাকসু সংগ্রহশালার মেঝেতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও গোলাম আজমের ছবি লাগিয়ে সেগুলো পদদলিত করেন একদল শিক্ষার্থী। আজ মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ডাকসু ভবনে
ছবি: প্রথম আলো

ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি টাঙানোয় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় এমন ছবি প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।