কেউ লিখেছেন ‘নিরাপদ বাংলাদেশ চাই’, কেউ লিখেছেন, ‘গরুর মাংস কিনে খেতে পারি না, বাজার নিয়ন্ত্রণ চাই’

‘আমি এ দেশের মাটি ও বাতাসের মাঝে নিরাপদভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে দেখতে চাই। এ রকম একটা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে নীতিনির্ধারক তৈরি করার নির্বাচন অনুষ্ঠিত করুন’। নিরাপদ বাংলাদেশ চেয়ে চিরকুটে এ কথাগুলো লিখেছে গাজীপুরের রাফা। বয়স মাত্র ১০ বছর। ঠাকুরগাঁও থেকে একজন লিখেছেন, ‘গরিব মানুষ, দিনমজুরি করে খাই। গরুর মাংস আমরা কিনে খেতে পারি না। বাজার নিয়ন্ত্রণ চাই, সিন্ডিকেট চলতেছে বাজারে। গরিব মানুষ কিনে খাইতে পারছে না।’

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চিরকুটে এভাবে মনের কথা লিখেছেন ৪০ হাজারের বেশি মানুষ। ‘দেশের চাবি, আপনার হাতে’ গণভোট ২০২৬ ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সচেতনতামূলক প্রচারের জন্য ভোটের গাড়ির প্রচার কার্যক্রম ‘জনমত বাক্স’–এ এসব মতামত উঠে এসেছে। কেউ ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার বিচার চেয়েছেন। কেউ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন। কেউ ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে, কেউ ‘না’ ভোটের পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে টুকরা টুকরা কাগজে মন্তব্য জানিয়েছেন ৪০ হাজার ২০৬ জন। কেউ লিখেছেন ব্যক্তিগত দুঃখ, কেউ চান হয়রানিমুক্ত হোক সব সরকারি চাকরি, রাষ্ট্রযন্ত্রের সংস্কার হোক, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়েছেন অনেকে, উঠে এসেছে নারী-পুরুষের সমতা, শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবেশ, ভালো শিক্ষাব্যবস্থা, দুর্নীতিমুক্ত-আধিপত্যমুক্ত বাংলাদেশের কথা। আবার কেউ কেউ ব্যক্তি আক্রমণ-আক্রোশ লিখেছেন, সরকারের সমালোচনাও করেছেন।

ঢাকা বিভাগ থেকে এসেছে ১০ হাজার ২১৬টি মন্তব্য। চট্টগ্রাম থেকে ৬ হাজার ৬টি। সিলেট থেকে ১ হাজার ৬৫১টি। বরিশাল থেকে ২ হাজার ১২৪টি। খুলনা থেকে ৪ হাজার ৬৭৮টি। রংপুর থেকে ৩ হাজার ৬০৫টি। রাজশাহী থেকে ৫ হাজার ৭৩৮টি। ময়মনসিংহ থেকে ১ হাজার ৭৯৯টি মন্তব্য এসেছে। ভোটের গাড়ি সারা দেশের ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা সদরের পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর ২ হাজার ১৬৯টি স্পটে গিয়ে প্রচার কার্যক্রম চালিয়েছে।

সুষ্ঠু নির্বাচন চান, স্বর্ণের দাম বেশি কেন জানতে চান

চিরকুটগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কুমিল্লা থেকে দেওয়ান সালাহউদ্দিন লিখেছেন, ‘সুষ্ঠু ভোট দেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। মানুষ চায় সুষ্ঠু ভোট দিতে যেন কেন্দ্রে যেতে পারে। কেন্দ্রে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করা যাবে না। আমার ভোট আমি দিব যাকে খুশি তাকে দিব। প্রধান উপদেষ্টা ভালো ভোট আয়োজন করবেন।’

সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হোক এবং ভোট দেওয়ার সুযোগ চেয়েছেন অনেকে। পেকুয়া উপজেলা থেকে একজন লিখেছেন, তিনি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও নির্বাচন কমিশনের পরিবর্তন চান।

চট্টগ্রাম থেকে গোলাম রাব্বানি লিখেছেন, ‘আমি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করি। আমাকে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য কোম্পানির মালিককে বিশেষ অনুরোধ জানাচ্ছি।’

বরিশাল থেকে সাদিক লিখেছেন, ‘যে দেশে শিক্ষকদের মান উন্নয়ন নিয়ে কেউ ভাবে না, সে দেশে সুন্দর আদর্শ রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব না।’

পিরোজপুর থেকে একজন লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের সকল মানুষের অধিকার দিতে হবে। সব ধর্মের মানুষের অধিকার দিতে হবে। সবাইকে বাক্‌স্বাধীনতার অধিকার দিতে হবে। স্বাধীন বাংলায় সবার অধিকার থাকবে। পক্ষপাতিত্ব যেন না হয়। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান একসঙ্গে বাঁচতে চাই। সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা চাই।’

দিনাজপুর থেকে লিজা, বিপাশা, সুমি, লিনা, বৃষ্টি লিখেছেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে মনে রেখে দেশের সুন্দর এবং সুষ্ঠু সংস্কার চাই। নারী ও শিশুদের অধিকার, ১০ দিনের মধ্যে ধর্ষণের ঘটনার রায় কার্যকর হোক।’

চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলা থেকে রিদুয়ান লিখেছেন, ‘বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ চাই। যাতে থাকবে না দুর্নীতি, দুঃশাসন, সন্ত্রাস ও তথ্য সন্ত্রাস।’ একজন লিখেছেন, ‘প্রিয় প্রধান উপদেষ্টা, ইতিহাসের অন্যতম সুন্দর ও স্বচ্ছ নির্বাচন আমরা প্রত্যাশা করি। আপনি যাওয়ার আগে এটা নিশ্চিত করবেন আশা করি।’

মেহেরপুর থেকে একজন আনসার সদস্য নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালনের জন্য পূর্ণ পারিশ্রমিক দাবি করেছেন। রামু থেকে একজন লিখেছেন, ‘স্বর্ণের দাম বাড়ার কারণ কী? আমার মেয়ের বিয়ে দিতে পারছি না। ভোজ্যতেল ও পণ্যের দাম বাড়ার কারণ কী? আমি চাই, ইউনূস সরকার আরও সময় থাকুক, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমুক এটা চাই।’ পাবনা থেকে একজন লিখেছেন, ‘আমি বিয়ে করতে চাচ্ছি, কিন্তু বাসা থেকে দিতে চায় না। আমার জন্য কিছু করার আহ্বান জানাচ্ছি।’

একজন লিখেছেন, ‘যত দিন ক্ষমতার চেয়ার ভাগাভাগি চলবে এবং রাষ্ট্র সুযোগ করে দেবে, এ দেশ জুলাইয়ের স্বপ্নে গড়ে উঠবে না।’ বরিশালের নাজিরপুর থেকে পরপর দুটো চিরকুটে লেখা, ‘গণভোটের পক্ষে আমি নই, নো’ ও ‘গণভোটের পক্ষে আছি, ইয়েস’। একজন লিখেছেন, ‘বাংলাদেশে সুষ্ঠু ভোট আশা করা অসম্ভব। কারণ, এই দেশ দুর্নীতিতে ভরা। এই দেশের মানুষ খুব সরল। তাই প্রশাসন মানুষকে হেনস্তা করে।’

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, আইন বিভাগের স্বাধীনতা, নিরাপত্তার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার ও ওসমান হাদি হত্যার বিচার চেয়ে চিরকুট লিখেছেন কয়েকজন। এর মধ্যে পিরোজপুর থেকে মো. আজহারুল হক লিখেছেন, ‘নেতার নয়, নীতির পরিবর্তন চাই। শহীদ ওসমান হাদি হত্যার বিচার চাই। শাপলা গণহত্যার বিচার চাই। বিডিআর হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। সাংবাদিক সাগর–রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। খুনি হাসিনার ফাঁসি চাই।’

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, কোনো রকম অস্বস্তি-সংকোচ ছাড়াই সাবলীল, আবেগাপ্লুত মন্তব্যগুলো পড়ে উচ্ছ্বসিত প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেছেন, জনগণের এমন অকৃত্রিম ভালোবাসা অমূল্য সম্পদ। তাই কোনো ধরনের কাটাছেঁড়া ছাড়াই সকল প্রশংসা, মন্তব্য, পরামর্শ এবং সমালোচনা-নিন্দাও সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।