পিকুল মিয়া তবু নাম প্রকাশ করে নিজের ভোগান্তির বিষয়ে এই প্রতিবেদকের কাছে বক্তব্য দিতে রাজি হন। উত্তরবঙ্গের ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী কথা বলতে গিয়ে ইতস্তত বোধ করলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই শিক্ষার্থী জানান, গত এপ্রিলে লালন শাহ হলের একটি কক্ষে তিনি সিট বরাদ্দ পান। যথারীতি ব্যাংকে টাকাও জমা দেন। কিন্তু হলে উঠতে পারেননি। বরাদ্দের কক্ষ আগে থেকেই ছাত্রলীগের মনোনীত শিক্ষার্থীরা দখল করে আছেন। বাধ্য হয়ে ক্যাম্পাসের পাশে শেখপাড়া এলাকায় একটি মেসে ওঠেন তিনি। সেখানে তাঁর প্রতি মাসে গড়ে ছয় হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। কিন্তু হলে থাকলে এর অর্ধেক টাকায় মাস চালাতে পারতেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লালন শাহ হলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আবেদন নিয়ে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে গত এপ্রিলে অন্তত ১৩০ জনকে আবাসিকতা দেয় হল প্রশাসন। আবাসিকতা পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩০ থেকে ৩৫ জন আগে থেকেই হলটিতে থাকতেন। এর বাইরে হাতেগোনা কয়েকজন নিজেদের কক্ষে উঠতে পেরেছেন। অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের নামিয়ে আবাসিকতাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সিটে তুলতে প্রক্টরিয়াল বডিকে নিয়ে অভিযান চালিয়েও কাজ হয়নি। ছাত্রলীগের নেতারা দফায় দফায় সময় চেয়েও শেষ পর্যন্ত বাকি ৯০ থেকে ৯৫ শিক্ষার্থীকে হলে তুলে দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

হলে উঠতে না পারার সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটে গত শনিবার গভীর রাতে। লালন শাহ হলের ৪০৩ নম্বর কক্ষের একটি সিট নিয়ে হলের ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীদের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি হলো, কক্ষটির বৈধ দুজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী বেশির ভাগ সময় ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থান করেন।

ওই সিটে ছাত্রলীগের নেতা মোস্তাফিজুর রহমান তাঁর এক পরিচিত শিক্ষার্থীকে তুলতে চান। অন্যদিকে কক্ষে অবস্থান করা ছাত্রলীগের আরেক কর্মী শাকিল ওই সিটে অতিথি হিসেবে দুজনকে রেখেছেন। তাঁদের তিনি ওই কক্ষে স্থায়ীভাবে তুলতে চান। এ নিয়ে রাতভর সেখানে উত্তেজনা চলে। ঘটনাস্থলে প্রশাসনের কর্মকর্তারা গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

লালন শাহ হলের প্রাধ্যক্ষ ওবায়দুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার একার পক্ষে পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়। উদ্যোগ নিলে নানা প্রতিবন্ধকতা আসে। সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও সচেতন হতে হবে।’

২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৭ হাজার ৬৮৯ শিক্ষার্থী আছেন। ছেলেদের ৫টি ও মেয়েদের ৩টিসহ মোট ৮টি হলে আবাসিক সিটের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৪৯১টি। ফলে সিংহভাগ শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের বাইরে কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ জেলায় মেসে থাকেন।

সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, হলে সিট পেতে হলে ছাত্রলীগ নেতাদের ডাকা মিটিং, মিছিল ও সমাবেশে যেতে হয়। সেখানে তিন থেকে চার মাস যাতায়াতের পর সিদ্ধান্ত আসে তিনি সিট পাবেন কি পাবেন না। নেতাদের কথার বাইরে গেলে কখনো সিট পাওয়ার আশা করা যায় না। আর যাঁরা সিট পেয়ে যান, তাঁরাও থাকেন বিপদে। এক কক্ষে চারজন বরাদ্দ থাকলেও সেখানে আটজন করে থাকতে হয়।

ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন ছাত্রলীগের কমিটি ছিল না। গত ৩১ জুলাই রাতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের ২৪৫ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। ওই কমিটির সভাপতি ফয়সাল সিদ্দিকী ওরফে আরাফাত প্রথম আলোকে বলেন, হলগুলোতে কিছু বিশৃঙ্খলা আছে। তবে ঢালাও অভিযোগ সত্য নয়। কমিটি না থাকায় সেভাবে কাজ করা যায়নি। তাঁরা সব সময় চান যাঁরা মেধাবী এবং যোগ্য, তাঁরাই হলে সিটে থেকে পড়াশোনা করবেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ মাহবুবুল আরফিন প্রথম আলোকে বলেন, শতভাগ বৈধ শিক্ষার্থী নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে হলগুলোতে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এবার শক্ত হাতে সবকিছু মোকাবিলা করা হবে। হলে অছাত্ররা থাকতে পারবেন না।

সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, হল প্রশাসন থাকলেও শিক্ষার্থী তোলা ও সিট ছাড়ার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করেন ছাত্রলীগের নেতারা। হলগুলোয় প্রশাসন সিট বরাদ্দ দিলেও অবৈধভাবে সিট দখল করে থাকা ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীদের বাধার মুখে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সিটে তুলে দিতে পারছে না হল প্রশাসন। শিক্ষাজীবন শেষ হওয়া ছাত্রলীগের সাবেক নেতারাও সিটের একটি অংশ দখল করে থাকছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক সেলিনা পারভীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘যা ঘটছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। শিক্ষার পরিবেশ দিতে হবে। দীর্ঘদিনের সমস্যা হয়ে এগুলো চলছে। এখন সমাধান করতে হবে।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন