‘আমি চাই না আর কেউ রাইদাহর মতো কষ্ট পেয়ে পৃথিবী ছাড়ুক’
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পরপরই রাইদাহ গালিবাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ডাব হাতে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হাসপাতালে যাওয়া মেয়েটি সেখান থেকে বের হয়েছিল লাশ হয়ে। গত বছরের ১ ডিসেম্বর রাইদাহ মারা যায়। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ— চিকিৎসকদের অবহেলা আর অব্যবস্থাপনায় শিশুটির মৃত্যু হয়েছে।
মেয়েকে হারিয়ে মা কানিজ কুলসুম বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে রাইদাহর চিকিৎসায় অবহেলা হয়েছে বলে অভিযোগ জানিয়েছেন। রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাইদাহর মৃত্যু হয়েছিল।
সম্প্রতি প্রথম আলো কার্যালয়ে বসে কানিজ কুলসুম বলেন, মাস ও বছরের হিসাবে রাইদাহর মারা যাওয়ার এক বছর হলো। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল সে। কাছের স্বজনেরা ডাকতেন ‘কুইন’ নামে। এই মা মনে করেন, হাসপাতালে যাথযথ চিকিৎসা হয়নি তাঁর মেয়ের। চিকিৎসায় কোন কোন ক্ষেত্রে অবহেলা হয়েছে, তা–ও তিনি বুঝতে পেরেছেন জানিয়ে বিএমডিসি এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে অভিযোগ আকারে দেন। এসব অভিযোগের প্রমাণ কোথায় মিলবে তা–ও তিনি অভিযোগে উল্লেখ করেছেন।
তবে গত এক বছরে বিএমডিসি এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ আলাদাভাবে তাঁকে মাত্র একবার করে শুনানিতে ডেকেছেন জানিয়ে এই মা বলেন, এর বাইরে আর কোনো অগ্রগতি নেই। তাঁকে আর কোনো তথ্যও জানানো হয়নি বলেও আক্ষেপ প্রকাশ করলেন।
কানিজ কুলসুম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার মেয়েটার ডেঙ্গু পজিটিভ আসার পর আর দেরি করিনি। বেশি সতর্কতায় মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করলাম। বারবার চিকিৎসকের হাতে–পায়ে ধরেছি মেয়েকে একটু ভালো করে দেখার জন্য।’
মেয়ের মৃত্যুর ১৩ দিন পর রাইদাহর মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন কানিজ কুলসুম। গত ৯ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে এ বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য বিভাগের অতিরিক্ত সচিবকে (উন্নয়ন অনুবিভাগ) আহ্বায়ক করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির প্রতিনিধিরা একবার কানিজ কুলসুমের বক্তব্য শুনেছেন।
ওই আবেদনের পাশাপাশি গত বছরের ২১ ডিসেম্বর বিএমডিসির রেজিস্ট্রার বরাবর চিকিৎসকের দায়িত্বে চরম অবহেলার কারণে ডেঙ্গুতে একমাত্র মেয়ের মৃত্যু হয়েছে এবং মৃত্যুর পরও চিকিৎসা বিষয়ে অসত্য তথ্য দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন কানিজ কুলসুম। চলতি বছরের ২২ জুলাই বিএমডিসির শৃঙ্খলা কমিটির সভায় তিনি তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন।
বিএমডিসির শৃঙ্খলা কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. এহতেশামুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, কেউ কোনো বিষয়ে অভিযোগ দেওয়ার পর আদালতের মতো এখানেও অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য শোনা, কমিটি গঠনসহ নানান প্রক্রিয়া বা ধাপ পার হতে হয়। শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটলে শিশুরোগবিশেষজ্ঞদের দিয়ে কমিটি গঠন করে তদন্ত করতে হয়। বিভিন্ন কমিটির কাছ থেকে প্রতিবেদন পেতে সময় লেগে যায়। সময় লাগলেও অভিযোগকারী বা ভুক্তভোগী পরিবারের হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই।
রাইদাহর মতো আর কোনো শিশুকে যাতে কষ্ট পেয়ে পৃথিবী ছাড়তে না হয়, সেই আকুতি জানান কানিজ কুলসুম। তিনি বলেন, ‘আমি আমার মেয়েকে আর ফিরে পাব না। তবে আমি চাই না আমার মতো আর কোনো মায়ের বুক খালি হোক। তাই আমি অভিযুক্ত চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
রাইদাহ ভিকারুননিসা নূন স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। সে শিশুসাহিত্যিক হিসেবে নাম করেছিল। রাইদাহর কাছে পাণ্ডুলিপি চেয়ে নিয়ে বই প্রকাশ করতেন প্রকাশকেরা। এবারের অমর একুশে বইমেলাতেও রাইদাহ গালিবার ‘ভয়ংকর গাছ’ নামের একটি রূপকথার গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। এটি ছিল তার চতুর্থ বই। তবে রাইদাহ এটি দেখে যেতে পারেনি।
আগামী বছরও বইমেলায় রাইদাহ গালিবার একটি বই প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। নাম ‘আন্ডোরে রাজ্যের কাহিনী’। মা কানিজ জানান, এই গল্প ২০২২ সালে শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘শিশু’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। রাইদাহ গালিবার প্রকাশিত বইগুলো এবং অপ্রকাশিত লেখাগুলোই এখন পরিবারের সদস্যদের কাছে শিশুদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ার লড়াইয়ের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ‘বইমেলায় নিজের বই দেখে যেতে পারল না ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া রাইদাহ’ শিরোনামে প্রথম আলো অনলাইনে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। মাত্র আট বছর বয়সে রাইদাহ গালিবার ‘বাঘ ও দৈত্য’ নামের একটি গল্প প্রকাশিত হয় বাংলা একাডেমির ‘ধানশালিকের দেশ’ পত্রিকায়। এরপর একাধিক গল্প প্রকাশিত হয় শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘শিশু’ পত্রিকায়। ২০২০ থেকে ২০২২ সালের অমর একুশে বইমেলায় রাইদাহ গালিবার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থগুলো হলো ‘পিটুর জাদু জুতা’, ‘এক যে ছিলো মুচি’, ‘ইমা ও দৈত্য’। বড় হয়ে ক্রিকেটার ও লেখক হতে চেয়েছিল রাইদাহ।