সীমান্ত জেলায় এইচআইভি সংক্রমণ বেশি, পার্বত্য চট্টগ্রামে কম কেন

এইচআইভি (এইডস)ছবি: রয়টার্স

দেশের ২০২৫ সালে যতজন এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে সীমান্ত জেলাগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় সংক্রমিত ব্যক্তি পাওয়া গেছে। বিভাগের হিসাবে ঢাকা বিভাগে শুধু গত বছরই নয়, কয়েক বছর ধরেই শনাক্তের সংখ্যা বেশি। এরপরই আছে চট্টগ্রাম বিভাগ।

সীমান্ত শহরগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় এইচআইভি ব্যক্তি পাওয়া গেলেও দেশের তিন পার্বত্য জেলায় এইচআইভি সংক্রমণ গত বছরের হিসাবে সবচেয়ে কম। তবে এই তিন জেলার এইচআইভি শনাক্তের সংখ্যা শুধু গত বছরই নয়, এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম বলেই জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্রগুলো। তিন জেলায় অবশ্য সীমান্ত আছে। এরপরও ভিন্ন কিছু কারণে তিন জেলায় সংক্রমণ কম বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদ এবং স্থানীয় চিকিৎসকেরাও।

দেশে এইচআইভির সংক্রমণ বেড়েছে গত ২০২৫ সালে। ওই বছর ১ হাজার ৮১৯ জন নতুন করে এইচআইভিতে আক্রান্ত হন। আগের বছর ২০২৪ সালে এইচআইভি শনাক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৩৮। শুধু এইচআইভি নয়, এসটিডির (যৌনসংক্রমিত রোগ) প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেছে। গত বছর যে পরিমাণ সংক্রমণ হয়েছে, তা গত দেড় দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস–এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পক্ষ থেকে এ তথ্য দেওয়া হয়।

নতুন শনাক্ত হওয়া রোগীদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ মূলধারার জনগোষ্ঠী, ১২ শতাংশ প্রবাসী, ১১ শতাংশ রোহিঙ্গা আর বাকি অংশ সাধারণ জনগণ। লিঙ্গ অনুযায়ী—পুরুষ ৮১ শতাংশ, নারী ১৮ শতাংশ এবং হিজড়া ১ শতাংশ।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে সংক্রমণ বেশি

২০১৬ থেকে সর্বশেষ গত বছরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে সবচেয়ে বেশি এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ঢাকায়। গত বছর মোট আক্রান্তের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৫০ জন ছিল ঢাকা বিভাগের। এরপরই আছে চট্টগ্রাম বিভাগ। এ বিভাগে আক্রান্ত হয়েছিল ৩৭৬ জন। শুধু এ বছরই নয়, এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে ঢাকা বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৪০৬ জন। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চট্টগ্রাম বিভাগে এ সংখ্যা ছিল ৩২৬ জন। ২০২৩ সালে এইচআইভি শনাক্তের সংখ্যা ঢাকা বিভাগে ছিল ৩৪২ জন। আর চট্টগ্রাম বিভাগে এ সংখ্যা ছিল ২৪৬ জন। কয়েক বছর আগে ২০১৬ সালেও ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ছিল এইচআইভিতে। সে বছর এ বিভাগে সংক্রমিত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ২১৬ জন। আর চট্টগ্রামে এ সংখ্যা ছিল ১৩৬ জন।

শুধু গত বছর নয়, এর আগেও এইচআইভি আক্রান্তদের মধ্যে সুচের মাধ্যমে মাদক নেওয়া ব্যক্তি, সমকামী, প্রবাসী কর্মী—এসব গোষ্ঠীই ছিল বেশি।

জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল মনে করেন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তির সংখ্যা বেশি হওয়ার একটি কারণ এখানে টেস্ট বেশি হয়। চিকিৎসার জন্য এই দুই বিভাগের বড় শহরে সাধারণত মানুষ আসে। আবার এখানে মাদক, সমকামীর সংখ্যা অপেক্ষাকৃত বেশি হওয়ারও সম্ভাবনা আছে। আবার এই দুই বিভাগে প্রবাসী কর্মীর সংখ্যাও অনেক বেশি। এসব কারণে ঢাকা ও চট্টগ্রামে সংক্রমণের হার বেশি।

সীমান্ত এলাকায় সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য

শুধু চলতি বছর  নয়, মোটামুটি সব সময় দেখা গেছে দেশের সীমান্ত জেলাগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তি পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালে সীমান্ত জেলা কুমিল্লা, যশোর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ, রাজশাহী আছে। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে জেলা হিসেবে সর্বোচ্চ সংক্রমণ হয়েছিল কুমিল্লায়। এ সংখ্যা ছিল ১০৮ জন। আর ঢাকায় সংক্রমিত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ৩৩৪।

২০১৬ সালে সর্বোচ্চ ঢাকা জেলায় এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তি ছিলেন ১৩৭ জন। আর চট্টগ্রাম বিভাগের সর্বোচ্চ সংক্রমণ ছিল সীমান্ত জেলা কুমিল্লায়। এ সংখ্যা ছিল ৩২। আবার যশোরেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বেড়েছিল আক্রান্তের সংখ্যা।

কুমিল্লার সিভিল সার্জন আলী নূর মোহাম্মদ বশীর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, কুমিল্লায় এইচআইভি শনাক্ত ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। এটি সীমান্ত জেলা হওয়ায় অনেকেরই যাওয়া–আসা আছে। আবার এখানে অবৈধ মাদকেরও ব্যবহার হয়। আর একটি বিষয় হলো প্রবাসী কর্মীর সংখ্যা। আমাদের এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের একটি অংশ প্রবাসী কর্মী। এটিও একটি কারণ হতে পারে।

যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মাসুদ রানা মনে করেন, অবৈধ মাদক এখানে বড় সমস্যা। আবার সীমান্ত যাতায়াতও একটি বড় কারণ বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশের সীমান্তে অবৈধ যাতায়াত একটি বাস্তবতা বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল। তিনি বলেন, এই যাতায়াতের ফলে কেউ এটি বহন করে এলে সীমান্তে তাঁদের স্ক্রিনিংয়েরও কোনো সুযোগ থাকে না। সে ক্ষেত্রে সমস্যা বেড়ে যায়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে এইচআইভি সংক্রমণ কম কেন

দেশের প্রায় এক–দশমাংশ এলাকাজুড়ে আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। এর তিনটি জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। তিনটি জেলারই সীমান্ত আছে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে। কিন্তু তিনটি জেলাতেই এইচআইভির সংক্রমণ কম। ২০২৫ সালে এই তিন জেলার মধ্যে বান্দরবানে কোনো সংক্রমণ হয়নি। আর রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে দুজন করে সংক্রমিত হয়েছেন এইচআইভিতে। ২০১৬ সালে বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে কোনো সংক্রমণ ছিল না। তবে রাঙামাটিতে একজনের সংক্রমণ ছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, পার্বত্য তিন জেলায় অনেক আগে থেকেই এইচআইভির সংক্রমণ কম। এটা আমরা দেখে আসছি। আর ওই তিন জেলায় জনসংখ্যার ঘনত্ব কম হওয়া এবং প্রবাসী কর্মীর কম সংখ্যাও একটি কারণ বলে মনে হয়।

সীমান্ত থাকার পরও ওই তিন জেলায় এইচআইভি সংক্রমণ কম। এর কারণ হিসেবে রাঙামাটির চিকিৎসক ও টংগ্যা নামের একটি বেসরকারি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পরশ খীসা বলেন, বাংলাদেশের অন্য সীমান্তগুলোতে যত লোকজনের যাতায়াত, পাহাড়ের সীমান্তে তা নেই। আবার এখানে সুচে মাদক নেওয়া বা অযাচিত যৌনাচারের সুযোগও কম।

পরশ খীসা মনে করেন, পাহাড়ের সমাজ পুরুষতান্ত্রিক হলেও নারীদের সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থান অপেক্ষাকৃত দৃঢ়। সেখানে পারিবারিক বন্ধনও অপেক্ষাকৃত দৃঢ়। সেটাও এই রোগ কম ছড়ানোর কারণ হতে পারে।

আবু জামিল ফয়সালও মনে করেন, পাহাড়ি মানুষের অপেক্ষাকৃত দৃঢ় পারিবারিক বন্ধন এবং সাংস্কৃতিক ও সামাজিক রীতিগুলোই তাঁদের এই ব্যাধি থেকে দূরে রাখতে কিছুটা সহায়তা করেছে।