তথ্য কমিশন গঠন নিয়ে বাংলাদেশ একটি বিব্রতকর বিশ্বরেকর্ডের মুখোমুখি: ইফতেখারুজ্জামান
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও দুই বছর দুই মাস ধরে তথ্য কমিশন না থাকায় বাংলাদেশ একটি বিব্রতকর বিশ্বরেকর্ডের মুখোমুখি হয়েছে। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এত দীর্ঘ সময় তথ্য কমিশন না থাকার নজির নেই।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর ফার্মগেটে দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে আয়োজিত তথ্য অধিকার সম্মেলনে অংশ নিয়ে এ কথা বলেন ইফতেখারুজ্জামান। আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার ২০২৬ উপলক্ষে এই সম্মেলনের আয়োজন করে তথ্য অধিকার ফোরাম।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও তথ্য কমিশন গঠনের জন্য তাঁরা বারবার অনুরোধ করেছেন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও সাত মাস পার হয়ে গেছে। দুই সরকারের আমলেই বিষয়টি ঝুলে আছে। এটি আইনের লঙ্ঘন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সাধারণ মানুষ আইন ভাঙলে বিচার ও শাস্তির মুখোমুখি হয়। কিন্তু সরকার আইন লঙ্ঘন করলে তখন কী হবে।
নতুন তথ্য কমিশন দ্রুত গঠনের বিষয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তাঁরা আশা করতে চান, কমিশনটি সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হবে এবং নিজের মতো করে কাজ করতে পারবে।
তথ্য কমিশনে দলীয় বিবেচনা বা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনের বিপরীতে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তথ্য কমিশন গঠনের কথা বলেন ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, এতে মানুষের আস্থা তৈরি হবে। তথ্য অধিকার আইন সংশোধনের নামে অপতথ্য ও মিথ্যা তথ্য ঠেকানোর বিষয়টি যুক্ত করা ঠিক হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, তথ্য অধিকার ও অপতথ্য দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। অপতথ্য ঠেকানোর নামে মানুষের তথ্য জানার অধিকার সীমিত করা যাবে না।
তথ্য পাওয়ার ইতিবাচক অভিজ্ঞতা কমেছে
সম্মেলনে তথ্য অধিকার জরিপ ২০২৬–এর ফলাফল উপস্থাপন করেন জরিপের প্রধান গবেষক অনন্য রায়হান। তিনি বলেন, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে তথ্য অধিকার সম্পর্কে নাগরিকদের সচেতনতা কিছুটা বেড়েছে। এই সময়ে তথ্য চেয়ে আবেদনের হারও আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে।
তবে নাগরিকেরা তথ্য চেয়ে আবেদন করার পর কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন গ্রহণের স্বীকৃতি পাওয়ার হার ২০১৯ সালের ৭৫ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে কমে ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশে নেমেছে বলে উল্লেখ করেন অনন্য রায়হান। পাশাপাশি তথ্য পাওয়ার ইতিবাচক অভিজ্ঞতা, আইনগত সময়সীমা সম্পর্কে নাগরিকদের জ্ঞান ও ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার হার নিম্নগামী হয়েছে। তাঁর মতে, এসব ঘাটতি কাটিয়ে তথ্য অধিকার কার্যকর করতে স্বাধীন তথ্য কমিশন প্রয়োজন।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, ভয় ও প্রতিশোধের আশঙ্কায় অনেকে তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করেন না। বিশেষ করে দরিদ্র, প্রান্তিক ও ক্ষমতাহীন মানুষের জন্য ঝুঁকি বেশি। এনজিওগুলোর ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা স্বচ্ছ না হলে তথ্য প্রকাশে অনীহা তৈরি হয়। তাই প্রশিক্ষণহীন তথ্য কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। একই সঙ্গে বর্তমান তথ্য কমিশনকে দ্রুত কার্যকর করে তুলতে হবে।
সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য দেন তথ্য অধিকার ফোরামের আহ্বায়ক ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। তিনি বলেন, আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে দুই বছর দুই মাস ধরে তথ্য কমিশন নেই। বর্তমান সরকারও দায়িত্ব নেওয়ার পর সাত মাস পার করেছে। এখনো কমিশন গঠন হয়নি। তিনি দ্রুত স্বাধীন ও কার্যকর তথ্য কমিশন গঠনের ওপর গুরুত্ব দেন।
ইইউ ডেলিগেশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি কামিলা পার্তিকা বলেন, তথ্যের অধিকার স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক শাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ২০০৯ সালের তথ্য অধিকার আইনের পর ১৭ বছর পেরিয়ে গেছে। জরিপে ৭২ শতাংশের বেশি নাগরিক তথ্যের প্রয়োজনের কথা বললেও মাত্র ১০ শতাংশের কিছু বেশি আইনটি সম্পর্কে জানেন। এই ব্যবধান কমাতে তথ্যের সহজলভ্যতা, সচেতনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
মিডিয়া রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (এমআরডিআই) নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমানের সঞ্চালনায় সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ডের টিম লিডার আদি ওয়াকার, তথ্য কমিশনের সচিব মো. শাহ আলম, এনজিও–বিষয়ক ব্যুরোর পরিচালক কে এম মামুন উজ্জামান প্রমুখ।